এসব হচ্ছে কার ইশারায় ? কাদের ইন্ধনে এসব চলে ? আজকে সারাদেশে একের পর এক আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে যা যা ঘটছে তা কি আর বিচ্ছিন্ন বলা যায়? অসাম্প্রদায়িক দেশরত্ন, দেশনেত্রী কি নিশ্চুপ-নিষ্ক্রিয়ই থেকে যাবেন আদিবাসী প্রশ্নে ?

সম্প্রতি সারাদেশে আদিবাসী নির্যাতন বিশেষভাবে আদিবাসী ভূমির ওপর হামলা, জবরদখল বা জোরপূর্বক দখলের অপচেষ্টা চলছে-ই। বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে অপকর্মগুলি সংঘটিত হলেও মূলত এগুলোকে বিচ্ছিন্ন ভাবার অবকাশ নেই।

পার্বত্য চট্টগ্রামে দৃষ্টি দিলে দেখা যায়, নির্দিষ্ট ছোট একটি এলাকা মূলত যেকোন কূটকৌশলে দখলের চেষ্টা করা হয়। সেই অপচেষ্টা সফল হোক বা না হোক এভাবে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন ছোট বা বড় এলাকা দখলদারদের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে পরিনত হতে থাকে।

একই বিষয় লক্ষণীয় বৃহত্তর সিলেটের বিভিন্ন গারো ও খাসিয়া পানজুম ও পুঞ্জিগুলোতে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখা দখলদারদের ছলা-কলায়। ইছাছরা, নুনছরা, সাহেবটিলার পর এখন আরও বিস্তীর্ণ অঞ্চল তাদের লক্ষ্যবস্তু। শোনা যায়, বনবিভাগ ক্রমাগত সেইসব এলাকাকে হুমকি দিয়ে আসছে এবং দেশীয় অস্ত্রধারী, হায়েনারুপি বস্তিবাসী, বাঙালী স্যাটেলার হল তাদের মূল হাতিয়ার।

একই কায়দায় দখলদারেরা এগিয়ে যাচ্ছে উত্তরবঙ্গে তাদের ধিকৃত অভিযান নিয়ে। সেখানেও তারা হুমড়ি খেয়ে পড়ছে আদিবাসী ভূমি ও সে অঞ্চলের ওপর।

এখন আসি মধুপুর প্রশ্নে। কেমন আছে মধুপুর? এইতো সেদিন মধুপুর গড়ের আদিবাসীরা ছিল উত্তাল। কিন্তু কিসের প্রতিবাদে? তা-তো দেশবাসীর অজানা নয়!!!

আবারও মধুপুর অশান্ত হয়ে উঠার অশনি সংকেত এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে যখন মধুপুরে বসবাসরত আদিবাসী গারো ও কোচদের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে আন্দোলন থামিয়ে এখন প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে ইকো-ট্যুরিজম স্থাপনের মিষ্টিমুখ চলছে। এদের নেকনজর থেকে এমনকি বাদ যাচ্ছে না গির্জা কি কবরস্থানও।

সারাদেশের আদিবাসী এলাকায় চোখ বুলালে দেখতে পাবো ধীরক্রমে আদিবাসী ছোট ছোট গ্রাম বা পুঞ্জি, তাদের ভূমি-ভিটে-বাড়ি, জীবিকা নির্বাহের একমাত্র অবলম্বন জুম বা চাষ জমি কেড়ে নেওয়ার ঘটনা হরহামেশাই ঘটছে অথচ অসাম্প্রদায়িক আদিবাসীবান্ধব সরকার নিশ্চুপ; প্রতিদিন গণমাধ্যমে আদিবাসী নির্যাতনের সংবাদ আসলেও অসাম্প্রদায়িক সরকারের ক্ষমতাশালী মন্ত্রী-এমপিগণ এইসব সংবাদে কোন পাত্তা দেন না। জোরজবরদস্তি আদিবাসী-ভূমি দখল, আদিবাসী-নির্যাতন বন্ধে সরকারের কার্যত কোন মাথাব্যাথা নেই। তাঁরা শুনেও শুনেন না, দেখেও দেখেন না।

একটি স্বাধীন, গণতান্ত্রিক দেশে এসব ভাবা যায়? দেশের আদিবাসীরা কি দেশের নাগরিক নয়? অথচ মজার ব্যাপার হলো স্থানীয় সরকার বা ইউপি নির্বাচন থেকে শুরু করে জাতীয় নির্বাচনে ইউপি সদস্য কি চেয়ারম্যান কি এমপি পর্যন্ত ভোট ভিক্ষা চাইতে ঠিকই এই আদিবাসীদের দ্বারে দ্বারে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। তখন জ্ঞান একদম টনটনে থাকে প্রার্থীদের যে এরা দেশের নাগরিক বরং এই নির্বাচন  প্রার্থীদের কাছে আদিবাসীরা আরও বেশি করে নাগরিক, বিশুদ্ধ নাগরিক, সাচ্চা দেশপ্রেমিক। কিন্তু বিধিবাম! নির্বাচন সম্পন্ন হয়ে গেলে এই নির্বাচিত ইউপি সদস্য, চেয়ারম্যান, এমপিরাই হয়ে উঠে ভয়ানক হিংস্র, আদিবাসী শত্রু। আদিবাসীদের জমিজমা, বাস্তুভিটা দখল করে দেশান্তরী করতে বাধ্য করে চলেছে দিনের পর দিন।

বনের রক্ষক বনবিভাগ ? গিয়ে পর্যবেক্ষণ করে দেখুন যেসব বনপাহাড় থেকে আদিবাসীদের তাড়ানো হয়েছে সেসব বনপাহাড়ের কী অবস্থা? বন বিরান হয়ে বনের চিহ্নটুকুও নেই, পাহাড় সমান ভূমিতে পরিণত হয়ে এখন সেইসব এলাকা সমতল এলাকা নামে চিহ্নিত। বিলুপ্ত হয়ে গেছে অনেক জীব বৈচিত্র। প্রকৃতির সন্তানেরা নেই। সেই সাথে নেই আদিবাসীদের আগলে রাখা বনপাহাড়, প্রাণবৈচিত্র, পরিবেশ, এবং প্রকৃতি ও পরিবেশে ভারসাম্য। আর আদিবাসী শূন্য সেইসব এলাকায় কী রেখেছে বনবিভাগ ? সোনার বাংলার সোনার সন্তান বনবিভাগ রেখেছে বনখেকো, পাহাড়খেকো বেহুঁশ দখলদারদের বস্তির পর বস্তি। মরুভূমির মত খাঁ খাঁ করা আদিবাসী ভূমি যেন তার সন্তানদের হারিয়ে হাহাকার করছে। সৌন্দর্য হারানো সুশোভিত বনভূমির মাথার ওপর এখন কড়া রোদের শাসানি। পাহাড় অস্তিত্বহীন; যাওবা আছে সেইসব ছায়াশীতল পাহাড়ও পুরোপুরি ন্যাংটা, নয়তো সামাজিক বনায়নের নামে বিষাক্ত বিদেশি গাছেদের আগ্রাসন। খোদ পাহাড়ের সন্তান, আদিবাসী মৃত্তিকার সন্তান প্রকৃতি ও পরিবেশ উপযোগী বৃক্ষাদি, গুল্মরাজি, বাঁশবন, তৃণলতা সব খেয়ে বসে আছে তৃণমূল পর্যায়ের রাঘব বোয়ালরা।

কিন্তু এসব হচ্ছে কার ইশারায়? কাদের ইন্ধনে এসব চলে? আজকে সারাদেশে একের পর এক আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে যা যা ঘটছে তা কি আর বিচ্ছিন্ন বলা যায়? অসাম্প্রদায়িক দেশরত্ন, দেশনেত্রী কি নিশ্চুপ-নিষ্ক্রিয়ই থেকে যাবেন আদিবাসী প্রশ্নে?

ধারাবাহিকভাবে যা ঘটছে এগুলো কি দেশকে আদিবাসী শূন্য করে তোলার একটি অশুভ পরিকল্পনারই অংশ নয়? দেশ থেকে নাগরিকদের একটি বৈচিত্রময় অংশ আদিবাসী উচ্ছেদ করার গভীর ষড়যন্ত্রে নেত্রীর নীরবতা বড়ই অস্বস্তির। এইসব চক্রান্ত বন্ধে আপনার মুখে কোন বক্তব্য নেই, আপনার কোন নড়চড় নেই দেখে সন্দেহ জাগে।

দেশে-বিদেশে অসাম্প্রদায়িক বিশ্ব গঠন, পরিবেশ রক্ষায় আপনার বক্তব্য, বিশ্বনেতাদের আহ্বান প্রভৃতি মহামূল্যবান কথার সঙ্গে বাস্তবিক আপনার কর্মের মধ্যে কোন মিল দৃশ্যত পরিলক্ষিত হয় না। ছোটবেলায় বুড়োবুড়িদের মুখে গল্প শুনতাম, একসময় মা গঙ্গার পানি এবং দেবতনয় ব্রহ্মপুত্রের পানি নাকি কখনোই একে অপরের সঙ্গে মিশ্রিত হত না। এই দুই দেবজল একসঙ্গে এক বোতলে মিশ্রণ করে রাখলে না কি ফেটে যেত। এর সত্যতা আমি কখনো যাচাই করি নি তাই এই মিথের সত্যতা সম্পর্কে কিছু বলতে পারছি না। তবে বিশ্বমঞ্চে আপনার বাণী এবং দেশের বুকে ঠিক তার উল্টোচিত্র একদম গল্পের সেই দেবীগঙ্গা বনাম ভগবান ব্রহ্মার পুত্রের বৈরিতার মতোই, হে বঙ্গমাতঃ।

কথা ও কর্মে আপনার এই তেলেজলে অবস্থায় আমাদের আদিবাসীদের প্রাণ যখন ওষ্ঠাগত তখন শুধু প্রশ্ন জাগে– অসাম্প্রদায়িক দলের নেতৃত্বাধীন সরকার দ্বারা পরিচালিত একটি গণতান্ত্রিক দেশে একজন নাগরিক কীভাবে নির্বাসিত হওয়ার হুমকির মধ্যে থাকে? কীভাবে প্রকাশ্য দিবালোকে কিছু দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রধারী সন্ত্রাসী একজন নাগরিকের বাস্তুভিটা, জুম-জমি দখল করে নিতে পারে? একজন নাগরিকের অধিকার কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা এদেরকে কে বা কারা দেয়? এই স্পর্ধাই বা ওরা পায় কোথা থেকে?

আরও বড় প্রশ্ন হলো, মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচার করা হলেও, সংবাদপত্রে বড় বড় কালো অক্ষরে দিনের পর দিন প্রচার হলেও মূখ্যত আপনার কোন ভূমিকা কেন নেই? দেশনেত্রী কার্যত কেন নীরব? তিনি অন্ধ! তিনি অসাম্প্রদায়িক? নাকি তিনি মূলত ঘৃণা করেন ভিন্ন জাতিসত্তা, ভিন্ন সম্প্রদায়, ভিন্ন ধর্ম?

একজন সেক্যুলার নেতা কোন একক জাতি কিংবা কোন একক ধর্মের প্রতিই শুধু মনোযোগ দিতে পারেন না কিংবা নীরবে অপরাপর সবাইকে হটিয়ে শুধু এককেই ধারণ করতে কিংবা তার স্বার্থ পূরণ করতে পারেন না। তিনি সবার; তাঁর ধর্মবিশ্বাস একান্তই তাঁর ব্যক্তিগত। তাঁর জাতিত্বও একটি বিশেষ জায়গায় কিন্তু সর্বজনীন মঞ্চে তিনি জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব বৈষম্য ভুলে আর সকলের।

দেখুন এতোদিন যাদের দিকে মনোযোগ দিয়েছেন, যাদের প্রাধান্য দিয়েছেন, যাদের মাথায় তুলে নেচেছেন যাদের জন্যই আপনি আমাদের আদিবাসী স্বীকার না করে নাম দিয়েছেন ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী। কোথাও কোথাও আড়ালে-আবডালে এখনো উপজাতি টার্ম রেখে দিয়েছেন। আদিবাসীদের ওপর যাদের অত্যাচার-অবিচার দেখেও আপনি নীরব তারাই এখন আপনার নিয়ন্ত্রণের বাইরে, সেইসব নেতাকর্মীরাই আপনাকে দিনকে দিন করে তুলেছে একা, বড্ড একা। আপনি মহতী নেত্রী বড়ই একা। সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নিন, সবার প্রতিই ভালোবাসা ধারণ করুন। সবার অধিকারকে সম্মান দিন। প্রথাগত ভূমি অধিকারকে রক্ষা করুন, আদিবাসী অধিকার ফিরিয়ে দিন, কুক্ষিগত করবেন না। অভ্যন্তরকে ঢেলে সাজান, আপনার অবকাঠামোগত উন্নয়ন থেকেও যা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। সময়ে শোধন না হলে

নতুবা প্রকৃতির নীরব প্রতিশোধ অবধারিত যা কয়ে-বলে, সময়ের জানান দিয়ে আসবে না।