ওয়েলসন নকরেক, মধুপুর, টাঙ্গাইল: আগামী ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালিত হবে যাচ্ছে। এ উপলক্ষে বিভিন্ন সভা, সেমিনার ও টেলিভিশনের টক-শোতে ‘আদিবাসী’ শব্দ ব্যবহার না করার জন্য সুশীল সমাজ, বুদ্ধিজীবি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রতি আহবান জানিয়েছে দেশের তথ্য মন্ত্রণালয়। গত ১৯ জুলাই তথ্য মন্ত্রণালয়ের টিভি-২ শাখার উপসচিব শেখ শামছুর রহমান স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এই অনুরোধ করা হয়।
তথ্য মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে বলা হয়, বাংলাদেশের সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে বাংলাদেশে বসবাসরত বিভিন্ন ছোট ছোট সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীকে উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা বা নৃগোষ্ঠী বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
এমতাবস্থায় আগামী ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত টক শোতে অংশগ্রহণকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বিশেষজ্ঞ এবং সংবাদপত্রের সম্পাদকসহ সুশীল সমাজের ব্যক্তিবর্গকে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ‘আদিবাসী’শব্দটি ব্যবহার না করার বিষয়ে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে প্রচারের জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।
এ দিকে উক্ত চিঠিকে কেন্দ্র করে আদিবাসী ও মানবাধিকার কর্মীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে-
ফারহা তানজিম তিতিল (সহকারী অধ্যাপক, ইবি) ‘আদিবাসী কে’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধতে তিনি লিখেছেন, ‘বাঙালির জাতিতাত্ত্বিক ইতিহাসের সঙ্গে আর্য-অনার্যের লড়াই জড়িয়ে আছে। আর্যদের আদিবাস ছিল উত্তর ইরানে, কাস্পিয়ান সাগরের তীরে। আর্যরা এসে দ্রাবিড়দের অধিকার করে নিল। দ্রাবিড় কারা? আর্য আগমনের অনেক আগে থেকে বাংলায় যে আদি মানুষের অস্তিত্ব ছিল তাদের দ্রাবিড় বলা হয়, নৃবিজ্ঞানের ভাষায় এরাই অস্ট্রিক বা অস্ট্রোলয়েড গোত্রের মানুষ, আরো সহজ করে বললে বলা যায় কোল, ভীল, মুন্ডা, সাঁওতাল প্রভৃতি জাতি।’
এদিকে গারো ছাত্র নেতা জন জেত্রা তিনি লিখেছেন তার নিজস্ব ফেবু ওয়ালে, ‘কার কাছে প্রতিবাদ জানাবো? অভিভাবকহীন রাষ্ট্রে দুর্যোধন দুঃশাসন অতি মাত্রার বাড়াবাড়ি যেন পাকিস্তানী ইয়াহিয়া ভুট্টো সাহেবদের প্রতিচ্ছবি। আদিবাসীদের পরিচয় উপজাতি, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, ক্ষুদ্র জাতি হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার পিছনে এই সরকারের বড় ষড়যন্ত্র অব্যাহত আছে। এই সরকার চায় না আদিবাসীরা আদিবাসী হিসেবে আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকুক। আগামী দিনে এমন প্রজ্ঞাপনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ না জানিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।‘
BONG দা নামের এক ব্লগার তিনি তার ভিডিও বার্তায় বলেছেন এবং লিখেছেন – আদিবাসীরা যদি “আদি” বাসী হয়ে থাকে, তাহলে বাঙ্গালীরা কি…???
সংবাদ এবং সাংস্কৃতিক কর্মী বাপন নেংমিঞ্জা ‘দেশে আদিবাসী নেই’ এই কৌতুক কতদিনের, নিজস্ব মতামতে তিনি লিখেছেন, ‘চিড়িয়াখানায় জলহস্তির সংখ্যা বাংলাদেশে বর্তমান রয়েল বেংগল বাঘের থেকে সংখ্যায় বেশি। তাহলেই কি জলহস্তিকে আপনি জাতীয় পশু বলা শুরু করবেন?’
এ ছাড়াও বিভিন্ন ব্যক্তিগত ফেবু ওয়ালে দেখতে পাওয়া যায়, ‘আমি কি নামে বড় হবো, আমাকে কি নামে ডাকবে, কি পরিচয়ে পরিচিত হবো এটি ঠিক করে দেবার রাষ্ট্র কে।‘
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ সরকার সাংবিধানিক, এবং সরকারিভাবে আদিবাসীদের ‘উপজাতি/ক্ষুদ্র জাতিসত্তা/নৃগোষ্ঠী’ বলার প্রচলন শুরু হয় ২০১০ সালে প্রণীত একটি আইন দিয়ে, যা পরের বছর সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয় পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে।