আহা, নিজ ভাষা সংস্কৃতির প্রতি কি ভালোবাসা আমার! না কি- আমি নিজেই আমার গারো মাতৃভাষাকে অবজ্ঞা করে চলেছি…?
বাংলাদেশ বেতার ঢাকা কেন্দ্র থেকে গারোদের জন্য গারো ভাষায় “সালগিত্তাল” নামে একটি অনুষ্ঠানে “নাআদে গ্রংজাজক, আঙাদে রেআংনাজক, আংখো অক্কামথাইওবা আঙাদে সকবাজানাজক…” গানটি এক সময় খুব জনপ্রিয় গান হিসাবে বেশ জনপ্রিয় ছিলো, তেমনই গানটি আমারও গারো ভাষার জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে একটি। এ গানটির বাংলায় তর্জমা করলে অর্থটা এমন হবে- “তুমিতো দেখা করলে না, আমি যে চলে যাবো, পুনরায় ডাকলেও আমার আর ফেরা হবে না…”। শিল্পীর নাম সম্ভবত রবেতা ম্রং, তবে আমি নিশ্চিত নই, গীতিকারের নামও আমার জানা নেই (আসলে সে সময় উক্ত অনুষ্ঠানে গীতিকারের নাম বলতে শোনা যেতো না, শুধু শিল্পীর নাম ঘোষণা করা হতো); এমন কি এতো সুন্দর গানের কথাগুলোও ভুলে গেছি।
বাংলাদেশ বেতার ঢাকা কেন্দ্র থেকে প্রতি রবিবার বিকাল ০৫.০৫ টায় গারোদের জন্য গারো ভাষায় “সালগিত্তাল” নামে একটি অনুষ্ঠান হতো। হয়তো, এ অনুষ্ঠানটি এখনও প্রচার হয়, কিন্তু দেশ থেকে রেডিওর ব্যবহার প্রায় শেষ হয়ে গেছে/যাচ্ছে এবং আমি নিজেও রেডিও ব্যবহার করি না বলে গারো ভাষার অনুষ্ঠানটি আর শোনা হয় না। এই সালগিত্তাল অনুষ্ঠানটি শুনি না বলে গারোদের খবর শুনি না, চমৎকার হৃদয়কারা গানগুলো শুনি না। এক সময়ের অত্যন্ত জনপ্রিয় তারা নকরেক-এর গাওয়া “ও পান্থে মেথ্রারাং চুয়া সিম্মাকবো, মিকগিল নিছাবো নাসং খ্রেংথকরিমবো (অনুবাদঃ হে যুবক যুবতীরা জাগো, চোখ মেলো, সচেতন হও)” গানটি কতদিন ধরে শুনি না, গাই না। বলা যায়, জাতিকে চেতনাদায়ী এমন সব আমি/আমরা ভুলেই যাচ্ছি। আহা, নিজ ভাষা সংস্কৃতির প্রতি কি ভালোবাসা আমার!
১৯৫২, ২১শে ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলনে শহীদ আব্দুস সালাম, শহীদ রফিক উদ্দিন আহমদ, শহীদ আবুল বরকত, শহীদ আব্দুল জব্বার, শহীদ শফিউর রহমান, শহীদ অহিউল্লাহর প্রাণের বিনিময়ে বাংলা ভাষা এই দেশের রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাই, ফেব্রুয়ারি মাসটা হয়ে গেলো বাংলা ভাষার মাস। বিশেষ করে বাংলাদেশের মানুষ সারা বছর, সারা জীবন বাংলায় কথা বললেও এই ফেব্রুয়ারি মাস জুড়েই বাংলা ভাষার মাস হিসাবে সবার মুখে মুখে আলোচিত হয়, রেডিও টেলিভিশনে টক শো হয়, গান নাটক প্রচারিত হয়। মোদ্দা কথা, এই বাংলাকে এবং বাংলা ভাষাকে ভালোবেসে অত্যন্ত শ্রদ্ধাভরে ২১শে ফেব্রুয়ারির দিবসটি পালিত হয়। দিবসটির গুরুত্ব, তাৎপর্য আরো সহস্র গুণে বেড়েছে ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর প্যারিস অধিবেশনে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করার পর। সুতরাং ২১শে ফেব্রুয়ারির মাতৃভাষা দিবসটি এখন আর শুধু বাংলাদেশ বা বাংলাভাষীর নয়; বরং সারা বিশ্বের সকল দেশের সকল জাতির, সকল ভাষাভাষির। বিশেষ করে জাতিসংঘের সদস্যদেশসমূহের সকল ভাষাভাষির জনগণ নিজ নিজ মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধাভরে দিবসটি পালন করে এসেছে, এভাবে প্রতিবছরই পালন করবে, এবং করতেই থাকবে।
আমার দেশ বাংলাদেশ হলেও আমি জাতিতে গারো, আমারও একটা নিজস্ব ভাষা আছে; আমি আমার জন্মের পরথেকে মায়ের কাছথেকে যে ভাষা শিখেছি, বলে এসেছি এবং আমরা জাতিগতভাবে, সামাজিকভাবে, পারিবারিকভাবে আমি/আমরা আমাদের নিজস্ব ভাষা গারো ভাষা”-তেই কথা বলি। খুব মনে আছে, ছোটবেলায় ২১শে ফেব্রুয়ারির দিনে মা মাসীদের কোলে চড়ে শহীদমিনারে ফুল দিতে যেতাম। স্কুল কলেজথেকে শুরু করে বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের সাথে ভাষা দিবস পালন করেছি, অনেক সুন্দর সুন্দর অনুষ্ঠান করেছি। আজ ভাষার এই মাসে আমার মনে বারবার একটি কথাই উদয় হচ্ছে, আমি আমার জীবনে অনেক অনুষ্ঠান দেখেছি, নিজেও অনেক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছি এবং এরকম বেশ কিছু বড় বড় অনুষ্ঠানের দায়িত্বও আমি পালন করতে হয়েছে। কিন্তু আমি একজন গারো হিসাবে গারো ভাষার জন্যে কি কখনও অনুষ্ঠান করেছি? তা না হলে আমি যে গারো, আমার গারো মাতৃভাষাকে যে আমি শ্রদ্ধা করি, ভালোবাসি, লালন করি- এরইবা প্রমাণ কি? আমি দ্বিধাহীন স্বীকার করি- আমি কোনদিনই আমার গারো মাতৃভাষার প্রতি এমন শ্রদ্ধা, ভালোবাসা দেখাই নি বা দেখাতে পারি নি; হয়তো সেরকম সুযোগ পরিবেশ আমি পাই নি অথবা সুযোগ গ্রহণ করি নি। আহা, নিজ ভাষার প্রতি কি শ্রদ্ধা আমার!
আমি বারবার বলি, অত্যন্ত গর্ব করে বলি- আমি (বা আমরা) নাগরিক হিসাবে বাংলাদেশী হলেও আমার/আমাদের আলাদা পরিচয় আছে- আমি জাতিতে গারো, আমার মা গারো, আমার মাতৃভাষা গারো। আমি জন্মের পর আমার মায়ের মুখে গারো ভাষা শুনেছি, আমার মুখথেকে প্রথম যখন কথা ফুটেছে, আমি গারো ভাষায় মাকে “আমা”, বাবাকে “আপফা” বলে ডাক দিয়ে শুরু করেছি। শুধু তাই, গারো ভাষায় কাছথেকে বাঙ্গালীর যেমন ইতিহাস ঐতিহ্য রয়েছে, তেমনই আমার জাতি এবং ভাষারও রয়েছে আলাদা ইতিহাস ও ঐতিহ্য। “বাংআ জাবুচ্চুম দুখনি সাগাল বালজ্রোয়ে, সকবাজক চিঙা দাআল, রামা গিত্তালোনা (অনুবাদ- হাজার পাহাড় দুঃখ নদী পেরিয়ে, এসে গেছি আজ আমরা নতুন এক সীমানায়)”- গানের কথার রেশ ধরে আমরা কি আমাদের আদি ইতিহাস ঐতিহ্যকে স্মরণ করতে, ভালোবাসতে, শ্রদ্ধা করতে পারি না? এই ফেব্রুয়ারি মাসে বা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে একটিবার এক ঘন্টার জন্যে গারো ভাষাকে স্মরণ করতে, শ্রদ্ধা প্রদর্শণ করতে পারি না? তবে, অবশ্যই বাংলা ভাষাকে পাশ কাটিয়ে নয়। কারণ এই বাংলা ভাষার জন্যেই আমরা এবং বিশ্ববাসী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসটি পেয়েছে। প্রতি বছরই সারা বিশ্বের বিভিন্ন জাতি এবং ভাষাভাষির জনগণ সকলেই নিজ নিজ মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধাভরে দিবসটি পালন করছে, আমি কেন আমার গারো মাতৃভাষার জন্য দিবসটি পালন করি না? আমার মতে, বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষে বা সম্মিলিতভাবে নিজ নিজ এলাকায় যার যার সুবিধা অনুসারে সকলেই (অন্যান্য ভাষাভাষির লোকেরাও) নিজ নিজ মাতৃভাষাকে কেন্দ্র করে আলোচনা বা কোন অনুষ্ঠান করতে কেউ আমাদের বাঁধা দেবে না। আমার বিশ্বাস, আমরা নিশ্চয়ই নতুন চেতনা নিয়ে সমস্বরে গাইতে পারি- “জাতথাংনা খা.সাওদে, থাঙে রাখনা আমোদে, খু,সান অংবো আনো আদানে, আপসান অংবো আনো আদানে (যদি নিজের জাতকে ভালোবাসো, জীবনে যদি প্রতিষ্ঠিত হতে চাও, তবে সমবেত হও, একমত হও”। না কি- আমি নিজেই আমার গারো মাতৃভাষাকে অবজ্ঞা করে চলেছি…?