আ.বিমা টাইমস, টাঙ্গাইল প্রতিনিধি: ৯ই আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসকে সামনে রেখে ‘বাংলাদেশ আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’র উদ্যোগে আদিবাসী ছাত্র ও যুবদের অংশগ্রহণে এক অনলাইন আলোচনাসভায় বক্তারা এ কথা বলেন। ৬ আগস্ট শুক্রবার সকাল ১১.০০টায় বাংলাদেশ আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি সুলভ চাকমার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনাসভাটি আইপি নিউজ এর ফেসবুক পেইজে লাইভ প্রচারিত হয়।
এ বছরের আদিবাসী দিবসের প্রতিপাদ্য : ‘Leaving No One Behind: Indigenous peoples and the call for a new social contract.’ বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম যার বাংলা রুপ করেছে ‘কাউকে পেছনে ফেলে নয়: আদিবাসী অধিকার প্রতিষ্ঠায় নতুন সামাজিক অঙ্গীকারের আহবান’ ।
আলোচনায় বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের ছাত্র ও যুব বিষয়ক সম্পাদক রিপন চন্দ্র বানাই বলেন, “আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এবারের আদিবাসী দিবসের প্রতিপাদ্যটি বাংলাদেশের আদিবাসীদের প্রেক্ষাপটে খুবই অর্থবহ এবং প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশের আদিবাসীদের এখনো সাংবিধানিক স্বীকৃতি নেই। সে কারণে তারা রাজনৈতিক অধিকার, সামাজিক অধিকার, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার প্রভৃতি ক্ষেত্রেই বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার। সেজন্য আদিবাসীদের অধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রে কেবল সামাজিক নয় রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার প্রয়োজন।”
বাংলদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের সাংগঠনিক সম্পাদক টনি ম্যাথিউ চিরান বলেন, “৭২ এর সংবিধান এর যে চেতনা সংবিধানের ৪টি মুলস্তম্ভ_ গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা। সে অনুযায়ী একটি বৈষম্যহীন ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের প্রত্যাশা আমরা করি। সেভাবেই রাষ্ট্র এদেশের আদিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসবে এই প্রত্যাশা আমরা করি।” জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ আইএলও কনভেনশন ১০৭ অণুসমর্থন করলেও আইএলও কনভেনশন ১৬৯ এখনো পর্যন্ত অণুস্বাক্ষর করেনি বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “আমরা আশা করি আইএলও কনভেনশন ১৬৯ কে সমর্থন প্রদানের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র এদেশের আদিবাসীদের অধিকার সুরক্ষায় এগিয়ে আসবে।”
পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের সভাপতি সুমন মারমা বলেন, “আদিবাসী অধিকার প্রতিষ্ঠাকল্পে আদিবাসী ছাত্র ও যুবদের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নিরন্তর লড়াই-সংগ্রাম পরিচালনা করার অন্য কোন বিকল্প নেই।” নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সচেতন ভূমিকা নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই-সংগ্রামে সামিল হওয়ার জন্য তিনি সকলকে আহবান জানান।
বাংলাদেশ গারো ছাত্র সংগঠন (বাগাছাস) এর কেন্দ্রীয় সভাপতি জন জেত্রা বলেন, “আদিবাসীদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে ভূমি সমস্যা, এ সমস্যা সমাধানের একমাত্র পথ হচ্ছে সমতল আদিবাসীদের জন্য পৃথক স্বাধীন ভূমি কমিশন গঠন করা।” বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার ২০০৮ সালে তাদের নির্বাচনী ইস্তেহারে এ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন উল্লেখ করে অবিলম্বে এ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দাবি জানান এ ছাত্রনেতা।
কোচ-রাজবংশী-বর্মণ সংগঠনের বকুল চন্দ্র বর্মণ বলেন, “২০০৯ সালে প্রণীত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন এ একদিকে বলা হয়েছে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী অন্যদিকে আবার আদিবাসীও বলা হয়েছে। আমরা উন্নয়নের স্বপ্ন দেখছি অথচ আজকে স্বাধীনতার ৫০ বছর পরেও আদিবাসীদের অধিকারের জন্য লড়াই করতে হচ্ছে। আজকে পর্যটনের নামে আদিবাসীদের জমি বেদখল করা হচ্ছে।” সমাজের কোন অংশকে পেছনে ফেলে রেখে কোনভাবেই সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয় উল্লেখ করে সমতল অঞ্চলের আদিবাসীদের জন্য পৃথকভাবে একটি ভূমি কমিশন গঠন করার দাবী জানান তিনি।
সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি সুলভ চাকমা বলেন, “দেশে প্রায় ৩০ লাখ আদিবাসীর বসবাস রয়েছে। আদিবাসীদের ভূমি, ভাষা, সংস্কৃতি প্রভৃতি অধিকার বিষয়ে সংবিধানে সুনির্দিষ্ট বিধিব্যবস্থা থাকা দরকার। সংবিধানের বিদ্যমান ধারাগুলোর আলোকেও কিন্তু আদিবাসী অধিকার বিষয়ক বিভিন্ন আইন প্রণীত হতে পারে। আদিবাসী মন্ত্রণালয় বা আদিবাসী কমিশন গঠন হতে পারে।”
আলোচনা সভায় আদিবাসী ছাত্র-যুব নেতৃবৃন্দ সরকারের কাছে ৬ টি দাবি উত্থাপন করেন:
১. আদিবাসী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে হবে।
২. সমতল আদিবাসীদের জন্য পৃথক স্বাধীন ভূমি কমিশন গঠন করতে হবে।
৩. পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি যথাযথ বাস্তবায়ন করতে হবে।
৪. সরকারি চাকুরীতে আদিবাসীদের জন্য ৫% কোটা পুনঃ বহাল করতে হবে।
৫. আদিবাসী সকল জাতিগোষ্ঠীর স্ব স্ব মাতৃভাষায় শিক্ষা নিশ্চিত সহ আদিবাসী শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে।
৬.করোনাকালে পিছিয়ে পড়া আদিবাসীদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ দিতে হবে।
বাংলাদেশ আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’র সাধারণ সম্পাদক অলিক মৃ’র সঞ্চালনায় সভায় আরো বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী টিং টিং উ রাখাইন, জেমি তঞ্চঙ্গ্যা, খাসিয়া স্টুডেন্ট ইউনিয়নের সদস্য ফ্লোরা ধর, বাংলাদেশ ত্রিপুরা স্টুডেন্ট ফোরামের সভাপতি প্রেম ত্রিপুরা, বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক প্রভাস মাহাতো প্রমুখ।