‘এই গ্রাম এবং এই বন ছেড়ে আমরা কোথাও যাবো না। আমরা বনের সন্তান, বন ছাড়া আমরা বাঁচতে পারবো না’- নেতা পরেশ চন্দ্র মৃ ইকোপার্ক-বিরোধী-আন্দোলন
যদি বলি প্রয়াত গারো নেতা পরেশ চন্দ্র মৃ ঠিক বলেছেন। কিন্ত দেশের সরকার, বন বিভাগ মিলে ঠিক এর উল্টো সুর তুলে। যদি তাই হয়, তাহলে যত দু:খ সাগরের মোহনা ওখানেই বুঝি! তাহলে কার কথা ঠিক! এবার ইকোপার্ক প্রকল্পের তলানীতে গিয়ে আরেকটু খুঁটিয়ে দেখা যাক কার কথা ঠিক, যৌক্তিক না অযৌক্তিক।দুধের স্বাদ ঘোলে মেটা অসম্ভব। যুক্তি তর্ক যাই হোক, মূল বিষয়টি আসলে অধিকারের। এহেন জড়িয়ে আছে একটি জাতিগোষ্ঠির বাঁচা-মরার লড়াই। এবার ধরুন আগ থেকে বলা কওয়া নেই হুট করে গিয়ে আপনার বাড়ীর চৌহদ্দির ওপর, এবং জোর করে একদল লোক হাজির হয়ে আপনার বাড়ির উঠোনে গিয়ে ইকোপার্ক-বিরোধী-আন্দোলনগাছ লাগিয়ে বললো, এটা আমাদের ইচ্ছে এবং স্বাধীনতা। এরপর আরও যদি বলা হয় এখন থেকে গাছটি দেখে শুনে পা ফেলবেন এটা বড় ঠাকুরের হুকুম।
মধুপুরে ইকোপার্ক বানানোর পরিকল্পনাটি হয় ২০০০ সালে। পরিকল্পনা এবং কলকাঠি নাড়ে করে বন বিভাগ। বিশ্বব্যাংক আর এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংক থেকে গ্রীন সীগন্যাল পাওয়ার পরই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বন বিভাগের ভাবসাবে বুঝা যায় টাঙ্গাইলের মধুপুরে যে শালবন আছে সেখানে এই ইকোপার্ক বানানোর পৃথিবীর একমাত্র উপযুক্ত, এবং সর্বশ্রেষ্ট জায়গা। সেখানে করা হবে মোট জমপেশ ১০টা পিকনিক স্পট, ৬টা ব্যারাক বানানো হবে। বুঝতেইতো পাচ্ছেন ব্যাপক কর্মযজ্ঞ, প্রচুর টাকাপয়সার খেলা হবে। ফলে অতি উৎসাহী লোকজনের অভাব নেই। ৪৭৮ বর্গকিলোমিটার ব্যাপী শালবন পুরোটা ঘিরে ফেলে এই ‘ইকো’পার্ক গড়া হবে। আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় কংক্রিটের ‘ইকো’ খাঁচা তৈরি করবেন। কিন্তু যারা কয়েকশ বছর ধরে সেখানে বসবাস করছেন মান্দি (গারো), কোচ, বর্মন এবং অন্যান্য আদিবাসীদের কথা কেউ একবারও ভাবল না। এরা ভাবলেন না গজারি, আগাছি, বহেরা গাছের সঙ্গে সিনা টান করে বেড়ে ওঠা হাজারও জনপদের কথা। একবারের জন্যও আলোচনায় বসার চিন্তাও কেউ করেনি। এদের পাশ কাটিয়ে এবং সঙ্গোপনে প্রকল্প বাস্তবায়নে হাত দেয় মধুপুর বনবিভাগ। স্বাধীনতা যুদ্ধের মতোন সেখানকার আদিবাসীরা যার যা আছে তা নিয়ে ইকোপার্ক বিরোধী আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পরবেন বনবিভাগ তা ভাবতেই পারেনি। আদিবাসীরা তাদের গৃহহারা হওয়ার শঙ্কায় দুর্বার আন্দোলন ছাড়া বিকল্প কোন পথ ছিল না। শহীদ পীরেন স্নাল সেই আন্দোলনের মহান নেতা। আন্দোলন তীব্রতর হতে থাকে, কোনোমতেই শেকড় ছিঁড়তে রাজি না, কোনভাবেই শেকড় উপরে ফেলতে দিতে চায় না তারা, ছেড়ে দেয়া উচিত নয় ভালোভাবে বুঝতে পেরেছিল তারা।
আন্দোলনকারীর ওপর ২০০৪ সালের ৩ জানুয়ারিতে বনরক্ষীরা অর্তকিত গুলি ছুড়ে। ঘটনাস্থলে মারা যায় পীরেন স্নাল। নিজের ন্যায্য অধিকার আদায়ে তাজা প্রাণ দেয় পীরেন স্নাল। বুকের তাজা রক্তে বলসালব্রিংয়ের মাটি লাল করে শহীদ হন জয়নাগাছা গ্রামের যুবক পীরেন। সেই দুর্বার আন্দোলনে আহত হন উৎপল নকরেক এর মতো আরও অনেকেই। শান্তিপূর্ণ মিছিলে এই অতর্কিত গুলি করে পীরেন স্নালের হত্যার বিচার আজও হয়নি। পীরেন স্নালের রক্তের বিনিময়ে তখন সরকার বাতিল করে ইকোপার্ক কার্যক্রম। কিন্তু ওই আন্দোলনের মামলায় জড়ানো হয় কয়েক হাজার আদিবাসীকে। সেই মামলা চলে দিনের পর দিন।
গত ৩১ ডিসেম্বর ২০২০, ‘কালের কন্ঠ’ অন লাইন পত্রিকায় টিআইবি’র গবেষণা রিপোর্ট ‘বন খেয়ে ফেলছে প্রভাবশালীরা’ শিরোনামে প্রকাশিত তথ্যটি আমাকে হতবাক করেছে। সেখানে সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, বন সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমে আধুনিক প্রযুক্তির সম্প্রসারণ না হওয়ার পাশাপাশি এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে। বন অধিদপ্তরের সব স্তরের কার্যালয়ের কর্মকাণ্ডে তদারকি, ইকোপার্ক-বিরোধী-আন্দোলন পরিবীক্ষণ, জবাবদিহি ও ‘ফরেস্ট্রি পারফরম্যান্স অডিট’- এর অনুপস্থিতিতে বন অধিদপ্তরে দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ হয়েছে।
সংস্থাটি আরো বলেছে, ৯৩ বছরের পুরনো বন আইনের কার্যকর প্রয়োগে প্রয়োজনীয় বিধিমালা ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন এবং আমূল সংস্কারে উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে। বননির্ভর জনগোষ্ঠীর প্রথাগত ভূমি অধিকার হরণ, বন আইন লঙ্ঘন করে এবং একতরফাভাবে সংরক্ষিত বন, বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য, জাতীয় উদ্যান ঘোষণাসহ জবরদখল উচ্ছেদের নামে অধিদপ্তরের বৈষম্যমূলক ক্ষমতাচর্চার উদাহরণ রয়েছে। সংরক্ষিত বন ও এর আশপাশে বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ, ত্রুটিপূর্ণ সামাজিক ও পরিবেশ সমীক্ষা সম্পাদন ইকোপার্ক-বিরোধী-আন্দোলনএবং এসবের উদ্দেশ্যমূলকভাবে অনুমোদনের ঘটনায় অধিদপ্তরের ওপর অর্পিত ক্ষমতা প্রয়োগে ব্যর্থতাও প্রত্যক্ষ করা যায় ইকোপার্ক-বিরোধী-আন্দোলন।
টিআইবি’র গবেষণায় বলা হয়েছে, এ পর্যন্ত বনভূমির প্রায় এক লাখ ৬০ হাজার ২৪০ একর জমি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বরাদ্দ করে নিয়ে গেছে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট দুই লাখ ৮৭ হাজার ৪৫৩ একর বনভূমি জবরদখল করা হলেও অধিদপ্তর কর্তৃক সর্বশেষ পাঁচ বছরে মাত্র আট হাজার ৭৯২ একর (৩ শতাংশ) জবরদখল করা বনভূমি উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। গাজীপুর, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, কক্সবাজার প্রভৃতি জেলায় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জবরদখলে থাকা বনভূমির জমি অবৈধ দখলমুক্তকরণ ও স্থাপনা উচ্ছেদে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইকোপার্ক-বিরোধী-আন্দোলনঊর্ধ্বতন বন কর্মকর্তাদের একাংশ প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ না করতে অধস্তন বনকর্মীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
এছাড়াও টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী বন অধিদপ্তরের যে চিত্রটি আমরা দেখলাম, তা হতাশাব্যঞ্জক। সরকারি বনভূমির সুরক্ষা ও বনে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর প্রথাগত জমির যে অধিকার, তা নিশ্চিত করতে বন অধিদপ্তরের ওপর অর্পিত যে ক্ষমতা ও সক্ষমতা রয়েছে, দুটিরই তারা কার্যকর ও ন্যায়সংগত ব্যবহার করতে পারছে না। সেখানে অনেক বিচ্যুতি ইকোপার্ক-বিরোধী-আন্দোলন আমরা লক্ষ করেছি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জবরদখল এবং আত্মসাতের সঙ্গে যোগসাজশের দৃষ্টান্তও রয়েছে।’
আদিবাসীদের মনে প্রশ্ন জাগে- সরকারী প্রকল্প, বন উন্নয়নের নামে মধুপুর অঞ্চলে আরও কি মহা প্রকল্প বাস্তবায়নের মহাপরিকল্পনা করছে বন বিভাগ তা ঈশ্বরই জানেন। এমনিতেই মধুপুর অঞ্চলের আদিবাসীরা নিজের ভিটেমাটির অধিকার নেবে কী, মিথ্যে বন মামলা সামলায়েই উঠতে পারছে না। বন রক্ষার নামে বনরক্ষী আর প্রভাবশালীরা বন ধ্বংস করে চলেছে; অথচ বসতভিটে হারাচ্ছে, জমিতে ফলানো ফসল হারাচ্ছে, হাজার হাজার মিথ্যে বন মামলায় কাঁধে নিয়ে বেঁচে আছেন সেখানকার আদিবাসীরা। গ্রাম বাংলার খাঁটি প্রবাদটির মতোই যে, ‘খাইয়া গেল দাড়িওয়ালা, বাইজা গেছে মুছওয়ালা’ অথবা কথায় আছে- লোহায় লোহা মিলে গেছে, মাঝখানে কামারের যত সমস্যা। ঐ মধুপুর গড়াঞ্চলের ইকোপার্ক-বিরোধী-আন্দোলন আদিবাসীরাও আসলে তাই; অপরাধ না করেও অপরাধী তারা।
একটি গণতান্ত্রিক দেশে এমনটি ভাবা যায়; নাকি সরকারী এবং বন বিভাগের এমন প্রহসন মানা যায়! সরকারী উন্নয়নের নামে বিমান ফাইরিং রেঞ্জ, ইকোপার্ক তৈরি করতে সেখানকার জনপদের সিদ্ধান্ত কোন মূল্যই দিলেন না তারা। অথচ সেখানে আদিবাসীদের ঘর, জায়গা জমিও তাদের। তাদের পরিকল্পনানুযায়ী সোজা আপনার বাড়িতে হাজির, আর আপনারকে আঙ্গুল উচিয়ে বলা হলো এ বাড়ি ছাড়তে হবে, গ্রাম ছাড়তে হবে এখানে সরকারী উন্নয়ন প্রকল্প হবে, আপনাদের কোন অজর আপত্তি চলবে না। ইকোপার্ক-বিরোধী-আন্দোলন এবার আপনারাই বিচার করুন এটা একটি গণতান্ত্রিক দেশের উন্নয়ন; নাকি এগুলো আদিবাসী উচ্ছেদ প্রকল্প! ঠিক এমন একই পরিস্থিতি যদি আপনার সামনে এসে দাঁড়াতো তাহলে আপনিইবা কি করতেন?