জন্মের পর জীবন চলার পথে বহু বন্ধু স্বজন দেখা মিলবে। অর্থকরি, যশ-খ্যাতি থাকলে সুসময়ের বন্ধু অনেকেই হয়। কিন্ত ব্যক্তি জীবন গঠন, ক্যারিয়ার এ সব কিছুই আপনাকে একা করতে হয়। সকল জীবন সংগ্রাম একা একাই লড়াকু লড়াই করতে হয়। এছাড়াও আপনার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো একা একাই নিতে হয়। বাস্তবতা হলো, জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহুর্তগুলোতে কাউকে পাশে পাওয়া যায় না। আপনার কঠিন মুহুর্তে কাউকে পাশে পাবেন না। আপনার ফ্যামিলি হোক, ফ্রেন্ড হোক সবাই কোন অজুহাত খাড়া করে, অথবা নিজ স্বার্থ খুঁজে নিয়ে দ্রুত সটকে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে নিজেকে ছাড়া নিজের জন্য আর কাউকে খুঁজে পাওয়া যায় না। তখন নিজের সঠিক অবলম্বন নিজেকেই ঠিক করতে হয়। কেউ অবহেলা, পেছন ফেলে গেলেই কারোর জীবন কী থেমে থাকে? জীবন ও জীবিকার পা ফেলা, ক্যারিয়ার গঠন, নাওয়া-খাওয়া কী বন্ধ হয়ে যায়?
নিজের লব্ধ জ্ঞান, মেধাকে বিশ্বাস করুন। যারা নিজের ইন্টুইশন (intuition) স্বজ্ঞানকে ফলো করে, এবং তারাই সত্যিকার অর্থে নিজের সুপ্ত প্রতিভা, মেধাকে নিজেই আবিস্কার করতে পারে। নিজের মেধা, মনন, চিন্তা-চেতনাকে সঠিকভাবে আত্ম মূল্যায়ন করতে জানে। আর বাদ বাকিরা ফলো করে হুবাহু অন্যদের। অন্যরা যা করেছে, করবে এবং ওরা নিজেরাও তাই করে। অথচ আপনি দেখুন, আমরা সবাই বাহ্যিকভাবে একই রক্তে মাংসে গড়া মানুষ হলেও কিন্ত ভেতর গুণ, প্রতিভা ঢের আলাদা। শুধু চেহারায় নয়, মানুষের আঙ্গুলের ছাপ পর্যন্ত বেশ আলাদা হয়ে থাকে। তাহলে আপনার মস্তিষ্ক, চিন্তা করার স্বক্ষমতা এক হবে কি করে?
জগতের বেশিরভাগ মানুষ এই অন্যকে হুবাহু ফলো করতে গিয়ে, অন্যদের মতোন কিছু করতে গিয়েই নিজের সত্যিকারের প্রতিভাকে কাজে লাগাতে পারে না, জ্ঞানকে ব্যবহার করতে জানে না। নিজের আসল রুপে অন্যকে বসিয়ে সে নিজেই নিজের অজান্তে অন্যের রুপ ধারণ করে বসে থাকে। নিজের আসল চেহেরাটা বুঝতে পারে না। ঠিক এমন অনুকরণ বোধ থেকে সবাই বেড়িয়ে আসতে পারে না। কিছু মানুষ অনুকরণ বোধ থেকে বেড়িয়ে নিজের স্বজ্ঞানকে ফলো করতে গিয়ে সে নিজে নিজেই বন্ধু বান্ধব, পরিবার এবং সমাজ থেকে একা হয়ে যায়। সমাজে ভালো কাজ করতে গিয়ে সে একা পড়ে যায়। কাউকে পাশে পাবে না। আপনার দুর্দিনে কাউকে পাশে পাবেন না; এটাই বাস্তবের বাস্তবতা।
মানুষ সমাজবদ্ধ জীব। তাই জীবনে একা একা চলাও কঠিন, দুরহ মনে হয় এবং মনে হতে পারে। আপনার জীবনে সত্যিকারের উদ্দেশ্য, লক্ষ্য না থাকলে জীবনে একা একা চলা যায়? অবশ্যই না। বারংবার আপনার চিরচেনা পথও হারিয়ে যায়। এই জন্যই যারা জীবনে একা চলে, একা পা ফেলে তাদের নির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকে এবং থাকতে হয়। একা, দলছূত মানুষরাই একমাত্র বুঝে যায় তাদের কি করতে হবে। বাকিরা দলবেঁধে স্রোত গড়িয়ে যে দিকে যায়, সে দিকেই চলে যায়। স্রোতে নিজের গা ভাসিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্তে থাকে। আর এভাবে আপনি আপনার জীবনের সবচেয়ে এক্সাইটিং, দুর্দান্ত বিষয় থেকে বঞ্চিত হন। নিজে ভালো কিছু করার চ্যালেঞ্জ নিতে পারেন না। জীবনে ভালো কিছু করার গ্রেট এক্সপেরিয়েন্স বা অভিজ্ঞতাও অর্জন করতে পারেন না।
আপনি দেখবেন, সমাজে সন্মানহীন মানুষেরাই অন্যের কাছে নিজের সন্মান খোঁজে। অন্যরা কি ভাববে এসব বিষয়তেই বেশি ফোকাস করে। একা পথ চলতে শিখে গেলে অন্যরা কি ভাববে, এসবে আর নিজের এনার্জি, মেধা নষ্ট করতে হয় না। সত্যিকারে কোনটা ভালো-মন্দ, কোনটা আপনার সত্যিকার প্রতিভা তা সহজেই ফোকাস দেওয়া যায়।
আরও একটি বিষয় দেখুন- বাস্তবতায় আমরা যা দেখি, আমাদের অনেকের অধিকাংশ সময় নষ্ট করে ফেলি শুধুমাত্র অন্যের বাড়তি মনোযোগ আকর্ষণ করতে গিয়ে। আপনি যাদের মনোযোগ আকর্ষণ করার চেষ্টা করেন, সে হয়তো আমাদের দৈনন্দিন জীবনে একটুও প্রভাব ফেলতে পারবে না। সে আপনার নিজের কোন কাজেই আসবে না, উল্টো নিজের কিছু সময়, মেধা, শ্রম বেহুদা নষ্ট হবে। এহেন আমাদের মনোযোগ দেওয়া উচিত ঐ সব বিষয়তে বা ঐ সকল মানুষের প্রতি, যাদের সাথে আমাদের জীবন ও জীবিকা জড়িত। আপনার ভূমিকায় তৃতীয় কোন ব্যক্তি আপনাকে নিয়ে কি ভাবল না ভাবল, তাতে সত্যিকার অর্থে কিছুই যায় আসে না। আর এই একা পা ফেলতে শেখা মানুষগুলো এটা সবার আগেই বুঝে যায়। এবং পরে একা পথ চলার সিদ্ধান্ত নেয়, একা পা ফেলার পথগুলো সহজ করে নেয়। তাই বলে এঁরা ব্যাসিক হিউম্যান কার্টেসি, সহানুভূতিগুলো কোনদিন ভুলে যায় না। যার সাহায্য দরকার, তার দিকে সবার আগেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। শুধু অপ্রয়োজনীয় জায়গায় নিজের সময়, অর্থ এবং শ্রম ব্যয়, সময় নষ্ট করে না। এঁরা তা ব্যক্তিগতভাবে পছন্দও করেন না।
সমাজে আরও দেখবেন, সমাজের দুর্বলরাই অন্যের হেল্প গ্রহণ করে। যোগসাজসে এগিয়ে যেতে চায়। যোগ্যতা না থাকলেও দলবেঁধে স্রোতে ভেসে যাওয়াকেই সাফল্যর একমাত্র পথ মনে করে। বিকল্প পথ তাদের জানা নেই। যারা একা চলতে পারে, তাদের স্বজ্ঞান, মনোবল ওসব মানুষদের তুলনায় অনেক বেশি। আপনি একা পথ চলতে গেলে হয়তো অন্য কারো সাহয্য সহযোগিতা পাবেন না, তারপরও আপনাকে একাই সামনে এগিয়ে যেতে হবে। আপনার ভিন্ন মতার্দশে, ভালো কর্মে একা চলতে গেলে প্রথমে হয়তো কাউকেই পাওয়া যাবে না। দূর থেকে মজা নিবে, অবহেলা করবে এবং বিভিন্নভাবে শারিরিক, মানসিক, প্রযুক্তিগত ও বৈশ্বিকভাবেও আপনাকে ক্ষতি করার চেষ্টা করবে।
ভালো মতোন খেয়াল করলে আরও দেখবেন, আপনার চারপাশে অনেক ফেইক, মুখোশ পড়া, বুদ্ধিবেশ্যার বহু মানুষ রয়েছেন। আপনি দেখবেন এসব ফেইক, মুখোশ পড়া, বুদ্ধিবেশ্যার মানুষেরা সহজেই সবার সন্মান বা ভালোবাসা পায়। মঞ্চে, রাজ পথে তাদের বিজয়ের মালা গলে পড়ায়। এসব দেখে মনোবল না ভেঙ্গে, লক্ষ্যভ্রষ্ট না হয়ে; সোজা নিজের লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। কারণ ফেইক জিনিস আপনাকে সাময়িক সুবিধা দিবে, কিন্ত সেটা বেশিদিন টিকে না। ফেইক কোন জিনিস টেকসই নয় সেটা আপনাকে ভালো করে বুঝতে হবে। সত্যিকারের মানুষেরাই এক সময় এবং দেরিতে হলেও সত্য ও বিজয়ের হাসি হাসে। এঁরাই নিজ মেধা ও শ্রমের প্রকৃত ফল ভোগ করে।
পৃথিবীতে বেশির ভাগ মানুষই অন্যকে ফলো করতে পছন্দ করে। ইউনিক কিছু ফলো করতে পছন্দ করে। কিন্তু সে নিজে ইউনিক হতে চেষ্টা করে না। ইউনিক হতে গেলে হয়তো একা হয়ে যেতে হতে পারে, মানুষের সম্মান পাবে না সে ভয়ে। আপনি যদি ভালো কিছু করতে চান তাহলে আপনাকে নিজের মধ্যে ইউনিক কিছু খুঁজে বের করতেই হবে। সেখানে আপনাকে সময়, মেধা প্রয়োগ করতে হবে। আপনি যখন ইউনিক্যালি সাফল্যের দৌড় গোড়ায় পৌছে যাবেন তখনই দেখবেন ঐসব মানুষগুলোই আপনাকে ফলো করা শুরু করবে, অথচ যে মানুষগুলোকে আপনি আপনার দুর্দিনে পাশে পান নি।
স্রোতের বিপরীতে এবং ভালো কিছু করতে হলে আগাছা উপড়ে ফেলে ইউনিক হয়ে কাজ করতে হয়। সময় দিতে হয়, এবং সে কাজে দেরিতে হলেও সাফল্য আসে। পৃথিবীতে একা পা ফেলতে শেখা, পথ চলতে শেখা মানুষগুলোই অন্যকে বেশি সন্মান করে, সম্মান দিতে জানে এবং অন্যকে বেশি ভালবাসতে জানে। অন্যদের দোষগুলো না খুঁজে বরং তাঁর গুণগুলোর প্রশংসা করে, তাঁর প্রাপ্যগুলো দিতে জানে।
মানুষের জীবন ও জীবিকা থেমে থাকে না। মোদ্দা কথা, জীবনের ধাপগুলো চেঞ্জ হয়। অবিশ্বাস্যভাবে গল্প হয়ে একদিন রুপান্তর হতে থাকবে। প্রতিটা ধাপগুলো সেই আপনাকে একা এবং একাই পেরুতে হয়। একাই সকল পথ পেরুতে হবে ভবিষ্যতেও এবং মৃত্যু পর্যন্ত। আপনি যদি একা পা ফেলতে শেখা, পথ চলতে শেখা মানুষগুলোর একজন হয়ে থাকেন, তাহলে এ বিশ্বাসটি হারাবেন না। একদিন যে বা যারা আপনাকে অবিশ্বাস করতো, তারাই একদিন বিশ্বাস করবে। যারা আপনাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল, তারাই আবার আপনার কাছে ফিরে ফিরে আসবে। আর তখনই আপনি ইউনিক জ্ঞানের সফলতা খুঁজে পাবেন এবং তখনিই আপনি দেখা পাবেন সত্যিকার বিজয়ের আনন্দ।