নতুন ধরনের করোনা ভাইরাস বাতাসেও ছড়ায়। করোনা প্রতিরোধক ব্যবস্থা না থাকলে অক্রান্ত মানুষের সংস্পর্শ ছাড়াও অন্যের শরীরে তা সংক্রমন হতে পারে সেটিই ইঙ্গিত করে। এ ভাইরাসের তথ্যগুলো কতটা ভয়ঙ্কর তাই না?

প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস বাংলাদেশেও লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। করোনায় মৃত্যু প্রতিদিন শতাধিক টপকে যাচ্ছে। এরই মধ্যে দেশটির সরকার লকডাউন জারি করেছে। লকডাউনের সময় জরুরি প্রয়োজন ব্যতিত বাইরে যাওয়া নিষেধ শুধু তাই নয়, করোনায় নিজ অবস্থানে আমরা কতটুকু সচেতন, সচেতনতায় কিভাবে দিনাতিপাত করছি সেটা বুঝে পালন করার বিষয়টি সামনে চলে আসে।

এছাড়াও নতুন ধরনের করোনা ভাইরাসে সংক্রমন হলে ব্যক্তি দ্রুত অসুস্থ্য হয়ে পড়েন। এ বিষয় সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ বলছে, করোনা সংক্রমিত রোগিকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনাও কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে দিনকে দিন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, ১১ এপ্রিল থেকে পূর্ববর্তী সাত দিনে আগের সপ্তাহের তুলনায় বৈশ্বিক সংক্রমণের সংখ্যা ১১ শতাংশ বেড়েছে। এই সংক্রমণ বৃদ্ধির পেছনে একটি কারণ হিসেবে করোনার নতুন ধরনকে দায়ী করা হচ্ছে। সংক্রমণ বাড়ার অন্য কারণগুলোর মধ্যে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়ে মানুষের মধ্যে অনীহার বিষয়টি উল্লেখযোগ্য।

বাপ্পু সিদ্দিকী ফেবু স্ট্যাটাসে লিখেছেন তার করোনা রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে; কিন্ত দেখা যাচ্ছে তিনি এখনো বিছানায়। তিনি করোনার সংক্রমনে যে কঠিন এবং ভয়াবহ সময়গুলো পার হয়ে এসেছেন সেটিই লিখেছেন। নেগেটিভ আসার পরও শরীরে বিভিন্ন উপস্বর্গ দেখা দেয়, যা করোনা সংক্রমের ফলে মানুষের শরীরে পরবর্তীতে আরও শারীরিক সমস্যা তৈরি করে, মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারে। ফেবুতে তেমনি একজন কোভিড সংক্রমিত হওয়ার পর নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতা জনস্বার্থে শেয়ার করেছেন। যিনি উল্লেখ করেছেন, ‘করোনা নেগেটিভ হওয়া মানেই আপনি বিপদমুক্ত নন’। বাপ্পু সিদ্দিকী একজন লেখক, সমাজ সেবক। লেখালেখিকে তিনি অভ্যাসে পরিনত করেছেন। জনসচেতনতামূলক পোস্ট হিসেবে তিনি ফেবুতে অবলীলায় যেভাবে লিখেছেন-

‘হাতের ক্যানুলা খুলে দিয়ে ডাক্তার জিলানী আরো কিছু পরিক্ষা-নিরীক্ষা করে গতকাল থেকে ৬ সপ্তাহের জন্য আবার বেশ কিছু ক্যাপসুল ও ট্যাবলেট সংযোজন ও বিয়োজন করেছেন। আমার সামান্য গাফিলতির জন্য চরম খেশারত দিয়ে যাচ্ছি। আমি সাধারণত আমার অসুস্থতা নিয়ে কোন পোস্ট দিতে পছন্দ করি না। যেহেতু ইতোমধ্যে আমার মেয়ের পোস্ট দেখে আপনারা জেনে গিয়েছেন আমি কভিড ১৯ পজেটিভ থেকে গত ৭ এপ্রিল নেগেটিভ হয়ে এখনো কঠিন সংগ্রাম করে চলেছি এবং আপনাদের দোয়া আশির্বাদে মনে হচ্ছে এ যাত্রায় টিকে যাচ্ছি! তাই মনে হলো আমার এ করোনা অভিজ্ঞতা জানলে হয়তো আপনারাও কিছুটা উপকৃত হতে পারেন।

আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে শুধু এটুকু বলতে চাই, এই করোনা কতটা ভয়াবহ তা আপনাদের কল্পনার বাইরে। যারা বয়স্ক তারা দ্রুত ফুসফুসে আক্রান্ত হচ্ছেন, হার্ট অ্যাটাক সহ মস্তিষ্কে রক্ত ক্ষরণ জনিত সমস্যা সহ অক্সিজেনের লেবেল দ্রুত নেমে যাচ্ছে। এ অবস্থায় কোন ডাক্তার আপনাকে বাঁচানোর গ্যারান্টি দিতে পারবে না। প্রতিটি হাসপাতালে রয়েছে অক্সিজেনের সল্পতা। আই সি ইউ পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। তবে আপনার দৃঢ় মনোবল ও লড়াই চালিয়ে যাবার ক্ষমতা ও সৃষ্টিকর্তার উপর বিশ্বাস আপনাকে বেঁচে থাকার প্রেরণা দিবে।এই কয়েকটি দিন আমাকে Inj. Roxadex 1.5, Inj Ceftizone 2mg, ও নাভিতে Inj Clexane 60 mg. নিতে হয়েছে। এখন প্রতিবেলায় ৭/৮ প্রকার ঔষধ খেতে হচ্ছে। এখনো প্রেসার, হার্ট বিট, সমস্যা করছে, তবে রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা সহ অন্যান্য উপসর্গ গুলো প্রায় ঠিক হয়ে এসেছে।

আপনাদের কাছে আমার মিনতি নিজেকে করোনামুক্ত রাখতে যা যা করা দরকার সব করুন। সন্দেহ হলে আর দেরি নয়, সাথে সাথে কভিড টেস্ট করে নিন। কারণ এক দিনেই এই কভিড আপনার ফুসফুসের ৪০% ক্ষতি করে দিতে পারে, আপনার মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ ঘটাতে পারে, এমন কি আপনার পায়ের পেশি অকার্যকর করে আপনাকে পঙ্গু করে দিতে পারে। মনে রাখবেন হাসপাতালে একটা সিটের জন্য বা এক সিলিন্ডার অক্সিজেনের জন্য এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছোটাছুটির চেয়ে লকডাউনে থাকা অনেক ভাল। হাসপাতালে নার্স বা ডাক্তারদের লিমিটেড সেবার চেয়ে পরিবারের সদস্যদের অবারিত সেবা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ এ সময়। তাই নিজে সুস্থ থেকে পরিবারকে সুস্থ রাখার চেষ্টা করুন। করোনা ১৪ দিন পর এমনি নেগেটিভ হয়ে যাবে, কিন্তু আপনার বিপদ থেকেই যাবে। তাই করোনা নেগেটিভ হওয়া মানেই আপনি বিপদমুক্ত নন!’

ছবি সংগৃহীত- বিছানায় এখনো ঔষধ পথ্য নিচ্ছেন বাপ্পু সিদ্দিকী

ওয়েবসাইট ওয়ার্ল্ডোমিটারসে বিশ্বের করোনার পরিস্থিতির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বে গতকাল পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত ছিল ১৪ কোটি ১৫ লাখ ৩৬ হাজার ৮৫৭ জন। মৃত্যু ৩০ লাখ ২৬ হাজার ৯৩৮ জন। তবে ইতিমধ্যেই সুস্থ হয়ে উঠেছে ১২ কোটি ১ লাখ ৪৫ হাজার ৪৩৯ জন। করোনা সংক্রমণে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। দেশটিতে গতকাল পর্যন্ত ৫ লাখ ৮০ হাজার ৭৯৩ জনের প্রাণ নিয়েছে এই মহামারি। এ ছাড়া করোনা শনাক্ত হয়েছে ৩ কোটি ২৩ লাখ ৬৪ হাজার ৫০৯ জনের।

বাংলাদেশের প্রতিবেশি দেশ ভারতেও করোনার প্রকোপ ভয়ঙ্কর মাত্রায় বাড়ছে। ভারত ছাড়াও লাতিন আমেরিকার দেশ ব্রাজিল, ইউরোপের দেশ ফ্রান্স, জার্মানী, পোল্যান্ড, তুরস্ক ও অন্যান্য কিছু দেশে সংক্রমণ বাড়ছে। সংক্রমণে ভারতের পরেই রয়েছে ব্রাজিল। দেশটিতে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩ লাখ ৭২ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। মোট আক্রান্ত হয়েছে ১ কোটি ৩৯ লাখের বেশি। সুস্থ হয়ে উঠেছে ১ কোটি ২২ লাখ ৯৯ হাজারের বেশি। দেশটিতে রোগী চাপে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতালগুলো। গুরুতর রোগীরা যাতে জরুরি ভিত্তিতে নিবিড় চিকিৎসাসেবা পান, তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। করোনা সংকট এতটাই প্রকট যে ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস এই পরিস্থিতিকে ‘মানবিক বিপর্যয়’ বলে ঘোষণা দিয়েছে। তুরস্ক ও পোল্যান্ডের মতো দেশগুলোতে আগে ততটা সংক্রমণ শনাক্ত হয় নি। এখন দেশগুলোতে বাড়ছে সংক্রমণ। ইরানেও নতুন করে সংক্রমণ বাড়ছে।

বিশ্বে করোনা ভয়াবহতার বর্ণনা, পরিসংখ্যান এমন অনেক আছে। বর্তমান সময়টি এমন যে শুধু জানার বিষয় নয়, স্বাস্থ্যসেবার নির্দেশনা নিজে শতভাগ পালন করে, নিজে নিরাপদ থেকে অন্যকেও নিরাপদে রাখার দায়িত্বটিও আপনার আমার। অতএব করোনা রোধকল্পে লকডাউন বিষয়টি সরকারি একটি প্রক্রিয়া মাত্র, নিজের সুরক্ষা এবং অন্যকেও রক্ষা দায়িত্ব আপনার। করোনার ভয়বহতা অনুধাবন করে সবসময় সবাই নিরাপদে থাকুন।