ওয়েলসন নকরেক, টাঙ্গাইল প্রতিনিধি: টাঙ্গাইলের মধুপুরসহ বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার গারো অধ্যূসিত এলাকা অর্থাৎ ব্রহ্মপুত্র নদের এপারে দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চলকে গারোরা ‘আ.বিমা’ বলে। গারো ভাষায় ‘আ.’/’হা.আ’ শব্দের অর্থ মাটি এবং ‘বিমা’ শব্দের অর্থ দাঁড়ায় মা বা স্ত্রী লিঙ্গ বুঝায়। গারো ভাষায় ‘আ.+বিমা’ আ.বিমা এ দুটো শব্দের পুরো অর্থ দাঁড়ায় ‘মাটির মা’। অর্থাৎ এ অঞ্চলের মাটিতে সকল ধরণের ফসল ফলে। প্রচলিত কথাটিও একেবারে বোধয় মিথ্যে নয়।

মৃক্তিকা গবেষকদের মতে, মধুপুরে মূলত তিন ধরনের মৃত্তিকা রয়েছে- যেমন গাঢ়-লাল বাদামি রঙের সোপান-মৃত্তিকা, অম্লীয় অববাহিকা এঁটেল মাটি ও অগভীর লাল-বাদামি সোপান-মৃত্তিকা। যার ফলে মধুপুরের মাটিতে প্রায় সব ধরণের ফসলই ফলে। কৃষি ফলনও ভালো হয়। আর সেকারনে এলাকায় একটি প্রচলিত কথা লোক মুখে শুনাও যায় যে, মধুপুরের মাটি সোনার চেয়েও খাঁটি। মধু মিশ্রিত মাটিতে মূলত আনারস, আম, কলা আর কাঁঠালের জন্য সমাদৃত হলেও অন্যান্য কৃষিজাত পণ্য কম ফলে তা কিন্ত নয়।

এমন খাঁটি সোনার মোহর দেখেই কাবুলিওয়ার মতোন বাঙালি ব্যবসায়ীদের চোখ পড়ে থাকতো মধুপুরের গারো আদিবাসী অঞ্চলে। গারো আদিবাসীদের আবাদি জমি নামমাত্র মূল্যে কিংবা প্রলোভন দেখিয়ে লিজ বা বর্গা চাষ করে কত বাঙালি লাখপতি হয়েছে তার কোন ইয়ত্তা নেই। ভাগ্যদোষে কেউবা নিজের জমিতেই বাঙালি মহাজনের চাষাবাদে খোদ গারোরাই আবার দিন কামলা বনে যেতেন। কিন্ত এ যুগের শিক্ষা আর সময়ের পালা বদল হাওয়া গারো পল্লীগুলিতেও লাগতে শুরু করেছে। গারো যুবকদের মধ্যে শিক্ষিত, কিংবা চাকরির পাশাপাশি বাপ-দাদার প্রান্তিক সম্পত্তি সুরক্ষা আর অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় উদ্যোগী হয়ে বিভিন্ন ব্যবসায় উদ্যেক্তা এবং স্বপ্রণোদিত হয়ে বাণিজ্যিকভাবে কৃষিজ পণ্য চাষাবাদে হাত দিয়েছেন ইতোমধ্যে।

ফলে মধুপুরে অর্ধ শিক্ষিতদের পাশাপাশি শিক্ষিত গারো যুবকরাও দিনকে দিন চাষাবাদে উৎসাহী হচ্ছে। টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার বেদুরিয়া, জয়নাগাছা, গায়রা, সাইনামারি, পীরগাছা, বাগাডোবা, পনামারিসহ বিভিন্ন গ্রামের যুবকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, উপজেলার অনেক গারো যুবকই চাকরির পেছনে না ছুটে কৃষিতেই দ্বিগুণ আয়ের স্বপ্ন দেখছেন। কেউ কেউ আবার চাকরির পাশাপাশি কৃষিতে বিনিয়োগ করছেন। ইতিমধ্যে অনেকেই নিজস্ব জমিতে অথবা অন্যের জমি লিজ/বর্গা নিয়ে চাষাবাদ করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন।

এলাকায় সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বেদুরিয়া গ্রামেই অন্তত ১০ জন যুবক চাষাবাদের সাথে সম্পৃক্ত আছেন। এভাবে এই মধুপুর অঞ্চলের প্রত্যেক গ্রামেই ৪-৫ জন করে চাষাবাদ করছেন।

বেদুরিয়া গ্রামের লিওবার্ট নকরেক। এ বছর ৩ বিঘা জমিতে বেগুন, আরও ৩ বিঘা জামিতে লাউ আবাদ করেছেন । সব খরচ বাদ দিয়ে দুই সব্জি চাষে কিছু লাভ থেকেছে বলে তিনি জানিয়েছেন।

মধুপুরের গারো কৃষক১

লিওবার্ট নকরেকের বেগুন ক্ষেত, ছবি: ওয়েলসন নকরেক

এদিকে বেদুরিয়ার আরেক উদ্যমী  যুবক শীতল স্নাল। তিনি রীতিমতো চ্যালেঞ্জ নিয়েই মাঠে নেমেছেন। এক বিঘা ধানী জমি পুকুর খনন করে মাছ চাষ শুরু করেছেন। এই বছর সে ২৫ হাজার টাকার মাছের নতুন পোনা পুকুরে ছেড়েছেন।

মধুপুরের গারো কৃষক২

মাছ চাষি শীতল স্নাল- মাছের খামার , ছবি: ওয়েলসন নকরেক।

সাইনামারি গ্রামের লিজুস রেমা সব্জি চাষ করছেন ১০ বছর ধরে। ৩ বিঘা জমি লিজ নিয়ে আর নিজের দুই বিঘাসহ ৫ বিঘা জমিতে সব্জি আবাদ  করেন। বছরে দুইটি মৌসুমে সব্জি চাষ করেন। বর্ষা মৌসুমে চিচিঙ্গা এবং করলা আর শীত মৌসুমে শিম আবাদ করেন। এখন তিনি প্রতি মৌসুমে চার লাখ টাকার সব্জি বিক্রি করেন। সব খরচ বাদ দিয়ে প্রতি মৌসুমে লাভ থাকে ২২৫,০০০ টাকা। তার বাগানে এখন দৈনিক ৪-৬ জন লোক রেগুলার কাজ করেন।

মধুপুরের গারো কৃষক৩

 

 

 

চাষাবাদ করতে কেমন বোধ করেন জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘আমার কথা হলো, আমি পরের অধীনে কামলা কাটবোনা। ছোট-খাটো যাই করি, নিজে কিছু করছি এইটাই আমার আনন্দ।‘ কথা বলার সময় তার চোখে-মুখের দীপ্তিই বলে দিচ্ছিলো এই সেক্টরে তিনি কত সন্তোষ্ট। লিজুস সব্জি বিক্রি করেন উপজেলার বড় বাজার মধুপুর এবং ধনবাড়ি কাঁচা বাজার আড়তে। বাড়িতেও পাইকাররা সব্জি কিনতে আসে, তবে আড়তে গিয়ে বিক্রি করলে সঠিক মূল্য পান বলে জানান। সব্জিগুলো জমি থেকে উঠানোর পর ভ্যান আর সাইকেলে করে বাজারে নিয়ে যান। আড়াই মনের নিচে হলে সাইকেলে করে নিয়ে যান, এতে করে যাতায়াত খরচও কম লাগে।

বাগাডোবা গ্রামের উল্লাস নকরেক। তিনি ৪ বছর ধরে বিভিন্ন ফলের চাষাবাদ করেন। তার উৎপাদিত ড্রাগন ফল, আনারস তিনি অনলাইনে বিক্রি করেন। এই বছর তিনি ১৭ বিঘা জমিতে আনারসের চারা লাগিয়েছেন। আনারসের সাথে সাথী ফসল হিসেবে পেঁপে লাগিয়েছেন। এক বছরে শুধু পেঁপেই ৫ লক্ষ টাকার মতো বিক্রি করতে পারবেন বলে আশা করছেন গারো যুবক উল্লাস নকরেক।

মধুপুরের গারো কৃষক৪

 

আশার কথা হলো, কোন ধরণের সরকারি পৃষ্টপোকষতা বা কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ ছাড়াই আ.বিমার বিভিন্ন এলাকায় আম, কলা এবং বিভিন্ন ভেষজ কৃষিজপণ্য চাষাবাদ করে  লাভবান হচ্ছেন এমন তথ্য আমাদের কাছে আসছে। সেগুলো ধারাবাহিকভাবে এবং পর্যায়ক্রমে প্রকাশ করা হবে।