গন্ধভাদুলি মূলত উৎকট গন্ধযুক্ত লতা গুল্ম উদ্ভিদ। এটির দৃষ্টিকটু নামও রয়েছে বটে। যাকে আমরা বলি কোন প্রাণীর পাঁদের ন্যায় গন্ধ। অনুমান করা হয় এমন উদ্ভট গন্ধের কারণেই একে গন্ধভাদুলি নামে অভিহিত করে। এর নাম কমবেশি অনেকেই শুনে থাকতে পারে। তার কারন এটি যেকোন জায়গায়, বাড়ির আনাচে কানাচে কিংবা বনেবাদারে প্রচুর জন্মে। বিশেষ কোন যত্নের প্রয়োজন হয় না। যে কোন কারনে এর নাম শুনে থাকলেও, এর গুণাগুন সম্পর্কে আমরা অনেকেই অবগত নই। মূলত এই লতাটি নিজ গুন বৈশিষ্ট্যের কারণেই সবার কাছে দুর্দান্ত কৌতূহলী ও কৃপাদৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। এটাই তার ব্যাপক পরিচিতির অন্যতম কারণও মনে করা হয়।
গ্রামাঞ্চলে এবং অঞ্চলভেদে এটাকে বহু নামে চিনে থাকে। এর সংস্কৃত নাম প্রসারণী, ভদ্রা। এটি আমাদের দেশে ভাদালে, গন্ধভাদাল, গন্ধভাদুলী, গন্ধভাদুলিয়া, গাঁদাল বা গন্ধাভাদালি নামেও সুপরিচিত। কোন কোন গ্রামে গন্ধভাদাইল, গন্ধপাতা ইত্যাদি নামেও চিনে। এর ইংরেজি নাম Skunkvine; Stinkvine, Chinese Fever Vine। যার বৈজ্ঞানিক নাম হলো Paederia foetida Linn।
ছবি: গন্ধভাদুলি গাছ
এ লতাটির পাতা ছিঁড়ে থেঁৎলে কিংবা লতাটিকে সমূলে উৎপাটন করা হলে; মানুষের উদরস্থ বায়ুর মত বিকট দুর্গন্ধ ছড়ায়। উদরস্থ বায়ুর গন্ধের মতোন বলে স্থানীয় ভাষায় তাকে পাঁদ তথা পাঁদেরা বা গন্ধপাতা হিসেবে অভিহিত করা হয়। এই লতা থেকে যে প্রকারের দুর্গন্ধ বের হয়, তাকে এক বাক্যে পরিচিত করাতে গেলে, স্থানীয় ‘পাঁদ’শব্দের চেয়ে সুন্দর কোন বিকল্প কিছু নেই! এই লতা জাতীয় গাছ বাংলাদেশ, ভারতের পূর্বাঞ্চল, আন্দামান নিকোবর দ্বীপ, দক্ষিণ ভুটান, কম্বোডিয়া, মায়ানমার, চীন তাইওয়ানে প্রচুর জন্মে। সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে এর ফুল ধরে এবং নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে ফল হয়। শীতকালে ফল পাকে। বীজ থেকে বা এর কাণ্ড বা লতা লাগানো যায়।
গন্ধভাদুলিকে গারো ভাষায় ‘ফাসিম (Fasim)’ বলে। গারোসহ অধিকাংশ আদিবাসীরা এ লতা জাতীয় উদ্ভিদের সঙ্গে প্রাচীন কাল থেকে পরিচিত। সুস্বাদু খাবার হিসেবে তাদের খাদ্য তালিকার অন্যতম একটি। শুধু খাদ্য তালিকাতেই নয়, এটিকে ভেষজ ঔষধি হিসেবে ব্যবহার করে নানা রোগ নিরাময়ে। এছাড়াও গ্রামাঞ্চলের কবিরাজ গন্ধভাদুলি পাতাকে চিকিৎসা পথ্য হিসেবে ব্যবহার করে থাকে, যেমন- আমাশয়, শুক্রতারল্য, কোষ্ঠকাঠিন্য নিরাময়ে এই গাছ বিশেষ উপকারী। আয়ুর্বেদ মতে এর পাতার রস উদরাময় ভালো করে। এর ডাল ও পাতা পানিতে সিদ্ধ করে ক্বাথ তৈরি করে এর সাথে লবণ মিশিয়ে পান করলে, মুখের রুচি ফিরে আসে। এবং নিয়মিত এই ক্বাথ সেবন করলে গেঁটে বাত উপশম হয়।
বলতে গেলে প্রাচীন কাল থেকেই এই লতাটি ঔষধি গাছ হিসেবে ব্যবহার হয়ে এসেছে। ইউনানি ও আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে পেটের যাবতীয় রোগে গন্ধভাদুলির ব্যবহার তুঙ্গে। হাকিম, কবিরাজেরা এটাকে রান্না করে খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। বদহজম ও উদরস্থ বায়ুর সকল প্রকার প্রকোপ কমাতে এর কার্যকারিতার জুরি নেই। বর্তমানে এটা শাক হিসেবেই বেশী সমাদৃত। শহরে ও মফস্বলে এর কদর অনেক বেশী। আদিবাসী ছাড়াও বাঙালীদের কাছে এর শাক খুবই উপাদেয় ও সুস্বাদু খাবার।
বৈজ্ঞানিকভাবে দেখা যায়, এই লতা বহু ধরনের খনিজ উপাদানে ভরা। যা অন্য শাক সবজিতে নেই। বাংলাদেশেও এই লতাটি আনাচে কানাচে প্রচুর পরিমাণে জন্মে। কোন ধরণের যত্নের প্রয়োজন হয় না। তাই এটাকে বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা গেলে ইউনানি ও আয়ুর্বেদ উপায়ে দেশের নাগরিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ব্যবহার করা যেতে পারে।
লুই সাংমা, প্যারিস, ফ্রান্স
ওয়েভ ডেভেলপার, ব্লগার, আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সার এবং সাংস্কৃতিক কর্মী।