(প্রবন্ধটি কোন যাজক অভিষেক অনুষ্ঠান স্মরণিকাতে প্রকাশ ২০২২, তথাপিও কিছু পাঠক, সাহিত্যপ্রেমিদের কথা চিন্তা করে অনলাইন পোর্টালে পুন:প্রকাশ করা হলো)

সমস্ত ভ্রান্ত ধারণার জীর্ণ শেকল ভেঙ্গে ছিড়ে আত্ম-বিশ্বাসী হওয়াটাই হচ্ছে ব্যক্তির আসল স্বাধীনতা। হৃদয়ের গভীরের মানুষের আত্ম বিশ্বাস হচ্ছে সকল সাফল্যের চাবিকাঠি, সকল অর্জনের প্রধান এবং মূল ভিত্তি। এই উন্মুক্ত চিন্তা চেতনা এবং বিশ্বাস থেকেই শুরু হয় আমাদের মানবিকতা বিকাশের উত্থান পর্ব। সেখানেই ব্যক্তি বুঝতে পারে, সে সৃষ্টির অনন্য সেরা জীব। জীবনের এক কঠিন বাস্তবতার মধ্যে ধীরে ধীরে আবিস্কার করতে শিখে তার নিজের অসীম শক্তি ও অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে। আর তখনই ব্যক্তিটি মাতোয়ারা হয়ে উঠে আপন ভূবন সৃষ্টি সুখের উল্লাসে।

গারোদের ইতিহাস খুব প্রাচীন। দ্বী-মতের সুযোগ নেই। ইতিহাস প্রাচীন হলেও জ্ঞান-বিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি ভিত্তিক জ্ঞান, বুদ্ধিবৃত্তি চর্চা, অভিবাসন ইত্যাদি এখনো আত্মস্থ করতে পারিনি। এমতাবস্থায় গারোদের কাছে ‘অভিবাসন’ শব্দটি একেবারে নতুন। এটিকে অপ্রিয় একটি শব্দ বললেও একেবারে অত্যুক্তি হবে না। গারোরা একটা সময় ঝুমচাষ নির্ভর ছিল। সেকারনে প্রতিনিয়ত স্থান, অঞ্চল বদল করতো। দীর্ঘদিন এক অঞ্চলে বসবাস করতো না। এক অঞ্চলে ভালো ফসল না হলে, প্রাকৃতিক সুবিধা না থাকলে অঞ্চল পরিবর্তন করতো। অঞ্চলগুলো দুর্গম, বিপদ সংকুল, নাকি জনশূন্য সেটি মূখ্য বিষয় নয়; ফলে তারা এমন কিছু অঞ্চলকে তারা বেছে নিতো যেখানে শস্য ভালো ফলে, এবং প্রাকৃতিকভাবে আহার্য সম্পদে ভরপুর।

এছাড়াও ব্রিটিশ, পাকিস্তান পিরিড থেকেই গারোরা নানাভাবে শোষণ বঞ্চনার শিকার। সুবিধাবঞ্চিত জাতিগোষ্ঠী হিসেবে কোনরকম টিকে আছে। অর্থাৎ গারোরা দীর্ঘ সময় অবহেলিত ছিল। এখনো তারা বিভিন্নভাবে অবহেলিত-ই রয়েছে। স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও শিক্ষা ব্যবস্থা গারোঞ্চলগুলোতে দ্রুত পৌছায়নি। কোন গোষ্ঠী বা মহল সে সুবিধাগুলো পৌছাতে দেয়নি। মিশনারীরা গারোদের যতটা খ্রীষ্টানিটি দীক্ষা নিতে মনযোগি ছিলেন, পাশাপাশি যদি তাদের উচ্চ শিক্ষাসহ বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিতেন; দেশের সরকার বাহাদুর যদি গারোসহ অন্যান্য আদিবাসী জাতিগোষ্ঠির সমউন্নয়নের কথা ভাবতেন তাহলে বর্তমান বাংলাদেশে গারোদের অবস্থান আরও অন্যরকম হতে পারতো! প্রবন্ধটি লিখার মূল উদ্দেশ্যই হলো; গারোদের অভিবাসন, বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জসমূহ কি!

অভিবাসন অর্থ কী- সাধারণ অর্থে ‘অভিবাসন’ কথাটির মানে দাঁড়ায়- কোন স্থান, বা অঞ্চল বদল, অর্থাৎ এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় অবস্থান করা বুঝায়। যেমন গ্রাম ছেড়ে শহরে অবস্থান অথবা তার বিপরীত সেটিও অভিবাসন পর্যায় পড়ে। আবার আন্তর্জাতিক ভৌগোলিক সীমানা অতিক্রমও হতে পারে। বিষয়টি আরো খোলাসা করে বললে, আন্তর্জাতিক অভিবাসন হলো যখন মানুষ নিজ রাষ্ট্রের সীমানা অতিক্রম করে এবং গন্তব্য দেশে ন্যূনতম সময়ের জন্য অবস্থান করাকে বুঝানো হয়। অভিবাসন অনেক কারণেই ঘটে। অন্য দেশে উচ্চ শিক্ষা, অর্থনৈতিক সুযোগের সন্ধানের জন্য অনেকে নিজের দেশে ছেড়ে চলে যায়। আবার তাদের দেশে রাজনৈতিক অবস্থার কারণেও অভিবাসন হয়ে থাকে।

এহেন প্রসঙ্গক্রমে একটি জনপ্রিয় কাব্যিক বাক্য দিয়ে প্রবন্ধের আরও গভীরে যাওয়া যাক, ‘কেউ জীবনকে জ্ঞানে গরিমায়, শৌর্য়ে-বীর্য়ে, ঐশ্বর্য়ে ঢেলে পরিপূর্ণভাবে সাজিয়ে গড়ে তোলে উন্নত শিখরে, আমরা তাকে বলি আহ্ কি অপরূপ মহিমা বেষ্টিত অর্থপূর্ণ জীবন!’ সেই প্রথিতযশা জীবনের সপ্তসুরে বন্দনা গীতিতে আমরা সকলেই পঞ্চমুখ। আবার মানুষের অসীম শক্তি, সম্ভাবনা ও প্রতিভাকে সব সময় শৃঙ্খলিত ও পঙ্গু করে রাখে সংস্কার ও ভ্রান্ত অন্ধ বিশ্বাস। এই সংস্কার ও ভ্রান্ত বিশ্বাস একটি সমাজকে, একটি জাতিকে নি:শেষ এবং নির্মুল করে দিতে পারে, ঠেলে দিতে পারে অর্থনৈতিক ধ্বংসের দিকে। হঠাৎ নেমে আসতে পারে অমাবস্যা অন্ধকারের মতো পারিবারিক জীবনে অর্থনৈতিক কঠিন বিপর্জয়।

আমরা অনন্ত সম্ভাবনা নিয়ে জন্মগ্রহণ করা সত্ত্বেও পরিবারিক, সামাজিক, ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় পরিমন্ডলে প্রচলিত ধারণার শৃঙ্খলে মানুষ ক্রমান্বয়ে বন্দি হয়ে পড়ি। পারিপার্শিক পরিবেশ ব্যাক্তিকে যা ভাবতে শেখায়; সে তাই ভাবে, যা করতে বলে- তাই সে করে। তাই ভ্রান্ত ধারণায় বন্দী হয়ে পরিণত হচ্ছে অনেকেই কর্মবিমুখ, হতাশ, ব্যর্থ কাপুরুষে। এমন দুর্দশাগ্রস্ত ও গ্লানিকর জীবনকে আমরা আমাদের নিয়তি বা কপালে লিখন ভাগ্যরূপে মেনে নিচ্ছি। এ কারণে নিজেকে প্রশ্ন করা উচিত, কেন অভ্যস্ত ব্যক্তির মধ্যে বিরাজমান সত্ত্বাকে নিয়ে মনোজাগতিক শিকল ছিড়ে বেড়িয়ে আসতে পারছি না? কেন সকল বাঁধা-বিঘ্ন জয় করতে পারি না? কেন ইচ্ছে করে না রঙিন বিশ্বের আকাশ ছুঁতে? কেন ইচ্ছে করে না রুগ্ন অর্থনীতির চাকা নিজ হাতে ঘুরাতে? এর সহজ উত্তরে হয়তো অনেকেই ‘শিক্ষা’, ‘অর্থনৈতিক’ অবস্থাকে দায়ী করবেন। হয়তো কেউ কেউ বলবেন ‘সঠিক নির্দেশনা বা গাইডের অভাব, মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা, অথবা কেউ কেউ বলবেন, কর্মে আত্ম সম্মানবোধই জীবনের বড় বিষয়’ ইত্যাদি। এদত বিষয়ে আমি মনে করি, এই সমস্ত ভ্রান্ত ধারণার জীর্ণ শেকল ভেঙ্গে ছিড়ে আত্ম-বিশ্বাসী হওয়াটাই হচ্ছে ব্যক্তির আসল স্বাধীনতা। হৃদয়ের গভীরের মানুষের আত্ম বিশ্বাস হচ্ছে সকল সাফল্যের চাবিকাঠি, সকল অর্জনের প্রধান এবং মূল ভিত্তি। এই উন্মুক্ত চিন্তা চেতনা এবং বিশ্বাস থেকেই শুরু হয় আমাদের মানবিকতা বিকাশের উত্থান পর্ব। সেখানেই ব্যক্তি বুঝতে পারে, সে সৃষ্টির অনন্য সেরা জীব। জীবনের এক কঠিন বাস্তবতার মধ্যে ধীরে ধীরে আবিস্কার করতে শিখে তার নিজের অসীম শক্তি ও অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে। আর তখনই ব্যক্তিটি মাতোয়ারা হয়ে উঠে আপন ভূবন সৃষ্টি সুখের উল্লাসে।

দেশের বর্তমান মাথাপিছু আয় ২৫০০ ডলার ছাড়িয়েছে- অর্থবছর ২০২০-২০২১ সালে মাথাপিছু আয় ছিল ২ হাজার ২২৭ ডলার। নতুন হিসাবে মাথাপিছু আয় বেড়েছে আরও ৩২৭ ডলার। আমাদের মাথাপিছু আয় আড়াই হাজার ডলার ছাড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হিসাবে দেশের মাথাপিছু আয় এখন ২ হাজার ৫৫৪ ডলার (সূত্র: প্রথম আলো)।

মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) হিসাব করার জন্য সম্প্রতি নতুন ভিত্তিবছর চূড়ান্ত করেছে। ২০১৫-২০১৬ ভিত্তিবছর ধরে এখন থেকে জিডিপি, প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ, মাথাপিছু আয় গণনা করা শুরু হয়েছে। এতদিন ২০০৫-২০০৬ ভিত্তিবছর ধরে এসব গণনা করা হতো। বিবিএস সূত্রে জানা গেছে, নতুন ভিত্তিবছরের হিসাবে ২০২০-২০২১ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় ২ হাজার ২২৭ ডলার থেকে বেড়ে ২ হাজার ৫৫৪ ডলারে উন্নীত হয়েছে। মাথাপিছু আয় বেড়েছে ৩২৭ ডলার। ডলারের বর্তমান বাজার অনুযায়ী, মাথাপিছু আয় বেড়ে গেছে ২৯ হাজার ৪৩০ টাকা। মনে রাখতে হবে, মাথাপিছু আয় কোনো ব্যক্তির একক আয় নয়। দেশের অভ্যন্তরের পাশাপাশি রেমিট্যান্সসহ যত আয় হয়, তা দেশের মোট জাতীয় আয়। সেই জাতীয় আয়কে মাথাপিছু ভাগ করে দেওয়া হয়।

২০১৫-২০১৬ ভিত্তিবছর ধরে হিসাব করায় আগের কয়েক বছরের মাথাপিছু আয়ও বেড়ে গেছে। যেমন, ২০১৫-২০১৬ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় ছিল ১ হাজার ৪৬৫ ডলার। নতুন হিসাবে হয়েছে ১ হাজার ৭৩৭ ডলার। এর পরের প্রতি বছরই মাথাপিছু আয় বেড়েছে। আগের হিসাবে ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় ছিল ২ হাজার ২৪ ডলার। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৩৩৫ ডলারে।

এ বছরের জিডিপি হিসেবানুসারে দেশের মাথাপিছু আয় নিশ্চয় পজিটিভ বার্তা দেয় আমাদের। তবে দেশের অভ্যন্তরের চেয়ে অভিবাসীদের রেমিট্যান্স কত পরিমাণ অবদান রাখে তা উল্লেখ না থাকলেও মোটা দাগে অবদান রাখে তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না।

‘রেমিট্যান্স’ প্রশ্নে গারোদের অভিবাসন সংখ্যা আদতে কত বিষয়টি মাথায় এসে যায়! বাস্তবতা বলে দেশের আভ্যন্তরীন অভিবাসন সংখ্যা বেড়েছে। অর্থাৎ গারোদের শহরমূখী হওয়ার প্রবণতা বা সংখ্যা দিনকে দিন বাড়ছে। কিন্ত সে হারে বাড়ছে না গারোদের আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংখ্যা। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের গারোদের অভিবাসন সংখ্যার পরিসংখ্যান সঠিক জানা না গেলেও সহজেই অনুমেয় যে এর সংখ্যা শ’পাঁচেক ছাড়াবে না; বরং এর কমও হতে পারে এটা নিশ্চিত।

গারোদের বর্তমান জীবিকায় অভিবাসন চ্যালেঞ্জ- উন্নয়নের দোলাচলে মানুষ জীবন ও জীবিকার কথা ভেবে ধীরে ধীরে সভ্যতা গড়ে তোলে। গারোরাও বিভিন্ন পারিপার্শ্বিকতায় ধীরে ধীরে সভ্য ওঠে। নিজেদের মানিয়ে, খাপ খাইয়ে নিতে নিরন্তর তৎপর চালাচ্ছে। বর্তমান সময়ে প্রাকৃতিক বন, বনজ সম্পদ উজাড় হওয়াসহ নানা রাজনৈতিক, ভৌগোলিক ইস্যূতে গারোরা দিশেহারা, বিভ্রান্ত, পথভ্রস্ত। অন্য আটদশজনের মতোন গারোরা আধুনিক জীবিকার তাগিদ অনুভব করে; এবং শহরমূখী হতে থাকে। এরপর ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক, ভৌগোলিক সীমানা অতিক্রম করতে বাধ্য করে। শুরু হয় অন্যরকম জীবন যুদ্ধ, যে যুদ্ধ তারা কখনো দেখেনি।

দিনকে দিন পৃথিবী ছোট হয়ে আসছে। অপরদিকে উপছে পড়ছে মানুষ। একদিকে যেমন আমাদের বাসযোগ্য জমি কমে আসছে, তেমনি বাড়ছে সামাজিক ও অর্থনৈতিকসহ নানাবিধ সমস্যা। নানা সমস্যার মধ্যে এবং দেরিতে হলেও নানা ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক কারনে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এমন কি বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশে গারোরা অভিবাসনের পথ বেঁছে নিয়েছে। তবে সেটি জনসংখ্যার তুলনায় নেহাত কম। তরপরও মানুষের সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্ন, ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা, কর্মচাঞ্চল্য থেমে নেই; থেমে নেই পৃথিবীর ভোগবিলাসী, উৎকর্ষতা।

মোদ্দা কথা, আমাদের পুরানো ধ্যান ধারণা ভুলে গিয়ে সমাজের প্রকৃত অবস্থা মূল্যায়ণ করে দূরদর্শী মনোভাব নিজের মধ্যে গড়ে তুলতে হবে। মাতৃভূমি ছেড়ে বিদেশে যেমন নিজের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানো সম্ভব তেমনি অর্থনৈতিক স্বাবলম্বীর পাশাপাশি জ্ঞান আরোহন করা যায়। অর্থনৈতিক চাকা ঘুরলে পৃথিবীও ঘুরবে আপন গতিতে। আজকাল কৃষি নির্ভর সমাজে অর্থনৈতিক চাকা শক্তিশালী করা সহজ নয়, তাই প্রয়োজন দেশে, বিদেশে যেখানেই হোক চাকুরী বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠা পাওয়া। বিদেশে চাকুরী কিংবা পড়াশুনা করতে হলে তাদের বিভিন্ন ভাষা জানা প্রয়োজন; বিশেষ করে ইংরেজীতে ভালো দখল এবং যেকোন কাজে পেশাদারী বা অভিজ্ঞতা থাকলে ব্যক্তিকে আর তেমন কোন সমস্যায় পরতে হয় না। পাশাপাশি তৃতীয় কোন আন্তর্জাতিক ভাষা ফ্রেঞ্চ, ইতালী, স্পেনীস, ডয়েচ, কোরিয়ান ভাষা ইত্যাদি জানা থাকলে আরও উত্তম।

পরিবর্তনের নতুন জোয়ার ঘরের আঙিনায় এসে দোলা দিচ্ছে। অথচ আজকের দিশেহারা যুবক সমাজ জীবন যৌবনের জোয়ারে কোন কুল কিনারা না পেয়ে জীবন তরী কোথায় এসে ভিরছে তা বুঝে উঠতে পারছে না। কেউ ঝাঁপিয়ে পড়ছে সেই নতুন জোয়ারের জলে, কেউ কেউ সেই জলে পড়ে হাবুডুবু খাচ্ছে; আবার কেউ কেউ সাঁতার না জেনে জলে ডুবেই মরছে। ঘরে বসে বসে আঙ্গুল গুনার দিন শেষ। বরং উত্তম ও সহজ পথ খুঁজে সেই পথে বেরুনোর মনোভাব যতদিন আমাদের অভ্যাসে পরিণত না হবে; ততদিন আমি যে গহণ তিমিরে জন্মেছি, সেই তিমিরে রয়ে যাবো। আমার আপনার সর্বদাই একটি কথা মনে রাখতে হবে যে, কোন অন্ধকার ঘরে কালো বিড়াল খোঁজা যায় না। পথই পথের মিলন করিয়ে দেয়; কিন্তু আমাকে আপনাকে পরস্পরের হাতে হাত রেখে এগিয়ে চলতে হবে। জীবনের পরিপূর্ণতার, সাফল্যের পথ পেতে হলে অনেক চড়াই উৎরাই পাড়ি দিতে হয়, তবেই না সেই পথের দেখা মেলে। জীবনে সফল হতে হলে স্বদেশ কিংবা বিদেশে অভিবাসনের চ্যালেঞ্জ আপনাকে নিতে হবে।

দেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান- বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি প্রবাসী আয়। এই প্রবাসী আয়ের ওপর ভর করেই ২০২০ সালের শেষ নাগাদ বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৩.১৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে, যা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। তবে যে প্রবাসীরা এতো কষ্ট করে টাকা পাঠাচ্ছেন তারাও রয়েছেন দেশে এবং প্রবাসে বহুমাত্রিক সংকটে। এক প্রতিবেদনে বলছে একে তো স্বাভাবিক বৈদেশিক কর্মসংস্থান বন্ধ, অন্যদিকে করোনাসহ নানা কারণে চার লাখ প্রবাসীকে ইতোমধ্যেই দেশে ফেরত আসতে হয়েছে। বিদেশ ফেরত এসব অভিবাসীকর্মীকে সামাজিক এবং অর্থনৈতিকভাবে পুনরেকত্রীকরণ এবং ফের শ্রমবাজার স্বাভাবিক করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। প্রবাসীদের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কাজ করতে হচ্ছে সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন এনজিওকে।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, এক কোটিরও বেশি বাংলাদেশি এখন দেশের বাইরে থাকেন। প্রবাসে থাকা এই বাংলাদেশিরা দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখলেও প্রবাসীদের পদে পদে ভোগান্তি ও হয়রানি পোহাতে হয়। পাসপোর্ট তৈরি থেকেই এর শুরু। এরপর রিক্রুটিং এজেন্সির দালাল ও প্রতারক এজেন্সির চাকরির বিষয়ে অসত্য তথ্য, উচ্চমূল্যে ভিসা কেনা-বেচা, স্বাস্থ্যপরীক্ষা, সরকারি ছাড়পত্র সবক্ষেত্রে সীমাহীন যন্ত্রণা। দেশের আকাশ পার হলে শুরু হয় বিরূপ প্রকৃতি, অমানুষিক পরিশ্রম, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে জীবনযাপন, মালিকদের প্রতারণা, নির্যাতনসহ আরও কত কি! বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসে গেলে কাঙ্খিত সেবা মেলে না, দেশে ফিরলেও ভোগান্তি।

বৈদেশিক কর্মসংস্থানের কথা বললে বলতে হয়, গত এক যুগ ধরে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর গড়ে ছয় থেকে সাত লাখ মানুষ বিদেশে কাজ করতে যাচ্ছিলেন। সেই হিসেবে প্রতি মাসে যান ৫০ থেকে ৬০ হাজার কর্মী। কিন্তু, করোনার কারণে গত বছর সেই সংখ্যা নেমে এসেছে দুই লাখের ঘরে। অথচ স্বাভাবিক সময়ে গড়ে অন্তত সাত লাখ কর্মী বিদেশ যায়।

একদিকে বিদেশে নতুন কর্মসংস্থান বন্ধ, অন্যদিকে প্রতিদিনই চাকরি হারিয়ে বিদেশ থেকে ফিরছে কর্মীরা। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের তথ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক ফ্লাইট চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এপ্রিল থেকে ৩১ ডিসেম্বর এই সময়ে চার লাখ ৮ হাজার ৪০৮ জন কর্মী বিদেশ থেকে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ৫০ হাজারই আবার নারী কর্মী।

বিদেশে কেন, কোথায় এবং কীভাবে আসবেন- গোটা বিশ্ব এখন তথ্য প্রযুক্তির চাদরে মোড়ানো। আপনি যদি একটু চোখ কান খোলা রাখেন তাহলে দেশের যেকোন প্রান্তে বসে ইন্টারনেটের মাধ্যমে যেকোন সঠিক তথ্য  পেতে পারেন। উচ্চ শিক্ষা, অর্থোপার্জন কিংবা স্থায়ী আবাস গড়তেও বিদেশ পাড়ি দিতে পারেন। কিন্ত বিদেশ পাড়ি দেবার সঠিক পথ সবার ভালো জানা নেই। গারোদের ভঙ্গুর অর্থনীতির ধরুণ অনেকের ইচ্ছে কিংবা পথ জানা থাকলেও তাদের স্বপ্নগুলো অধরাই রয়ে গেছে। এতোকিছু বাঁধা বিপত্তির পরও কিছু উদ্যমী, শিক্ষিত গারো ইতোমধ্যে এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা, অষ্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে আবাস গড়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, কীভাবে!

প্রবন্ধের প্রারম্ভেই বলেছি, শুধুমাত্র ইচ্ছে পোষণ করলেই হবে না, সঠিক সিদ্ধান্তের পাশাপাশি প্রাণান্তকর চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। বিভিন্ন দেশে অর্থাৎ দেশের বাইরে বর্তমানে স্কলারশীপ প্রোগ্রাম, স্কিল্ড আপগ্রেডিং ট্রেনিং, স্কিল্ড ইমিগ্রেন্ট, ওয়ার্ক পার্মিট এবং রাজনৈতিক আশ্রয় ইত্যাদির মাধ্যমে আপনি অভিবাসন বিষয়টি সুনিশ্চিত করতে পারেন। এ তথ্যগুলো পেতে হলে যেকোন দেশের এম্বেসীগুলোর ওয়েবসাইট অথবা সরকার অনুমোদিত বেসরকারী সংস্থা অথবা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পেজগুলো অনুসরণ করুন। দালালদের প্রতারণা এড়াতে এম্বেসীর মাধ্যমে নিজে সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। মনে রাখুন বর্তমানে স্কিল্ড মাইগ্রেসানের যথেষ্ট সুযোগ এবং চাহিদা রয়েছে বিভিন্ন দেশে। এছাড়াও বিকল্প পথ হিসেবে যেকোন উপায়ে রিয়েল ভিসা ম্যানেজ করে উন্নত দেশে প্রবেশ করতে পারলে রাজনৈতিক আশ্রয়ের সুযোগগুলো প্রায় প্রত্যেক দেশেই রয়েছে। যেমন এশিয়ার কিছু দেশ জাপান, কানাডা, আমেরিকাসহ ইউরোপ ইউনিয়নভূক্ত অনেক দেশেই সুবিধাটি পেতে পারেন। এ সুবিধা প্রাপ্তিতে গারোদের তুলনায় বাঙালী কিংবা বিধর্মীরাই সব থেকে এগিয়ে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বেকারত্ব বাড়লেও সবার চোখ এখন ইউরোপে।

নিজেকে আত্মমূল্যায়ন করা এখন-ই প্রয়োজন- অনেক গারো ছেলে-মেয়ে কলেজ ইউনিভার্সিটির পড়াশুনা শেষ করে দেশেই দিব্যি যোগ্যতা বলে সরকারী, বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে ভালো চাকুরী করছে। কেউবা চাকুরীর নামে বিদেশে পাড়ি দেবার চেষ্টা করে প্রতারিত হয়ে ভাগ্যের দোহায় দিয়ে মাথা ঠুকিয়ে জীবন অতিবাহিত করছেন। আবার কেউবা চাকরী না পেয়ে ভীষণ হতাশায় জর্জরীত। কেউবা প্রতিকুল অবস্থা জয় করে কাঙ্খিত আলোর মুখ দেখছে। আমাদের দেশে পরিপার্শ্বিক মানুষিকতা এমনি যে, উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে ক্ষেত খামারে, নিজস্ব জমিতে পর্যন্ত শ্রমিক হয়ে কাজ করতে আগ্রহবোধ করে না। এর সঠিক উত্তর নিশ্চয়ই সবার অজানা নয়! কিন্ত বিদেশে যেকোন কাজ অবমূল্যায়ন করার কোন সুযোগ নেই। বরং তারা উৎসাহিতবোধ করে এবং অন্যকে সেই কাজটি করার অনুপ্রেরণা দেয়। ফলে তারা নিজের দারিদ্রতা দূর করে জাতীয় প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধি করতে নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে। আমাদের দেশের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন এবং নেতিবাচক মনোভাব অবনমিত করা এখনোই জরুরী প্রয়োজন। আমার জানা মতে, সারা পৃথিবীতে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠের বিচারে বিধর্মীরাই অভিবাসন সুবিধাগুলো চ্যালেঞ্জের মাধ্যমে জয় করছে। সে তুলনায় গারো আদিবাসী তিলতুল্য মাত্র। কর্মের তাগিদ অনুভব করে বিধর্মীরা কোন দেশে নেই তা খুঁজে পাওয়া মুশকিল হবে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জল, স্থল এবং আকাশ পথে পাড়ি জমাচ্ছে এক চিলতে সুখ শান্তির আশায়। আমার দৃষ্টিতে বাঙালীদের সাফল্যও চোখে পড়ার মতো। এহেন আরও একটি প্রশ্ন জাগে, আমরা গারোরা অভিবাসন সংখ্যায়, অথনৈতিক ‍সূচকে কোথায় এবং কোন অবস্থানে রয়েছি!

মানুষের দুর্বল ইচ্ছাশক্তি দেহ-মনকে, চিন্তা-চেতনাকে করে স্থুল; ধর্মীয় ভক্তি-বিশ্বাসকে করে অবনমিত। বর্তমান আধুনিক যুগের হাওয়ায় যে উচ্চাভিলাষী মাতম লেগেছে তা হতে পারে কোন ব্যক্তির জ্ঞান আহরণের অথবা অর্থনৈতিক দৈন্যতা থেকে উত্তরণে মহা-অগ্নি পরীক্ষা। কবি হেলাল হাফিজ এর ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ কাব্যে বলেছেন- ‘এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’ এবং ছোটবেলায় স্কুলে আরো একটি ভাবসম্প্রসারণ পড়েছিলাম ‘পরিশ্রমই সৌভাগ্যের প্রসূতী।‘ কেউ যদি এই চরম সত্য কথাটি উপলব্ধি করে এবং একনিষ্ঠ অধ্যাবসায় অব্যাহত রাখে; তাহলে তার জীবনে কাঙ্খিত সাফল্য অনিবার্য। কথাটি শতভাগ সত্য এবং সবার জন্যে প্রযোজ্য। এভাবে সে নিজেই হতে পারে তার নিজের ভাগ্য বিধাতা। নিজের ভাগ্য পরীক্ষার স্থান হতে পারে দেশের মাটিতে অথবা প্রবাসে। কঠোর পরিশ্রম ও অর্থ উপার্জনের মাধ্যমে নিজেকে তথা সমাজকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে পারে। অন্যদিকে কেউবা হতে পারে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের এক অনন্য উদাহরণ।

মন স্থির করে লক্ষ্য স্থির করুন এবং নিজেকে তৈরি করুন- যেকোন কাজে হাত দেওয়ার জন্য চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবার আগে নিজেকে শতভাগ মন স্থির করুন; আপনি আসলে কি করতে চান, পড়াশুনা- না চাকুরী? উত্তর যদি চাকুরী হয় তাহলে কিছু কিছু বিষয় আপনাকে অবশ্যই লক্ষ্য রাখতে হবে আর পড়াশুনা হলে সেটি আবার ভিন্ন কথা। যাদের ঘরে ইন্টারনেট সুবিধা আছে অযথা সময় নষ্ট না করে প্রয়োজনীয় এবং শিক্ষণীয় তথ্য পেতে পারেন বিভিন্ন ওয়েবসাইটে ভিজিট করে। চোখ কান খোলা থাকলে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি তথ্য পেতে পারেন। এই আধুনিক তথ্য প্রযুক্তি ও ইন্টারনেটের যুগে যেকোন তথ্য সহায়তা পেতে পারেন একটু ইচ্ছে করলেই।

গারো নতুন প্রজন্মদের জন্য আমার বিশেষ বার্তা এই, আপনি বিদেশে কেন আসবেন না! শিক্ষা কিংবা অর্থ উপার্জনের যে কারনেই হোক, আমাদের সমাজের আদিম ধ্যান ধারণা ভুলে গিয়ে অবশ্যই দেশ-বিদেশে পাড়ি জমানো উচিত। তবে মনে রাখবেন- কেউ অবৈধ্য পথে, দালালের খপ্পরে পড়ে বিদেশে গমন করবেন না; যেখানে আপনার অথনৈতিক ক্ষতি এবং জীবনের ঝুঁকি থাকে।

উন্নত জীবন গড়ার স্বপ্ন এবং অধিকার আমাদেরও আছে। আপনি হয়তো ভাবছেন অর্থ নেই। কথায় আছে, শুভ কাজ অর্থের জন্য আটকে থাকে না। সঠিক পথ এবং ভিসা নিশ্চিত করতে পারলে সমাজে অনেক ব্যক্তি আছেন যারা আপনাকে অর্থ দিযে সাহায্য করতে পারে। শুধু নিজের প্রয়োজন সততা এবং সঠিক পথ খুঁজে বের করা। আবার কিছু কিছু বিষয়ও বিস্মিত ও হতাশ হতে পারেন; তবে যেকোন এবং সঠিক উপায়ে বিদেশে আসতে পারলে এখানে অনেক পথ খুলে যায়, যা আমারা দেশে থাকতে আমরা ভাবতেও পারি না। জীবনে ভালো কিছু অর্জন করতে হলে কিছু ত্যাগ স্বীকার করতেই হবে। নয়তো নিজের ইচ্ছাগুলো, সম্ভাবনাময় স্বপ্নগুলো উদ্যোগের অভাবে মাঝপথে মৃত্যু ঘটবে। সবার সুন্দর স্বপ্ন, ইচ্ছাগুলো বেঁচে থাকুক অনন্তকাল।

লুই সাংমা, প্যারিস, ফ্রান্স
ওয়েভপেজ ডেভেলপার, আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সার, ব্লগার এবং
সাহিত্য কর্মী  lchiran76@gmail.com