শিল্পী সত্তায় ইচ্ছে ডানা কখনো মরে না। আর্থিক দৈনতায় সকলের ইচ্ছে ডানাগুলো অবসাদ অথবা বাধাঁগ্রস্থ হতে বাধ্য, তবে তার ঐকান্তিক ইচ্ছা এবং প্রচেষ্টা মানুষকে সফলতার দৌড় গোড়ায় পৌচ্ছে দেয়। ক্ষেত্রটিতে প্রয়োজন শিল্পীদের নিজস্ব প্রচেষ্টা এবং সামর্থহীনদের জন্য আপনার আমার আর্থিক সংশ্লিষ্টতা,প্রয়োজনুসারে সহায়তা প্রদান।
গারো তরুণ শিল্পী মার্কুস চিসিম একটি নাম। শিল্পী জীবনে চাওয়া একটাই, গানকে ভালোবেসে গান গেয়ে যাওয়া এবং আজ অথবা কাল শিল্পী সত্তাকে প্রতিষ্ঠিত করা।
শিল্পীর অক্লান্ত শ্রমে ও গভীর নিবিড় ভালোবাসায় একজন শিল্পী দিনের পর দিন, বছরের পর বছর সংগীত সাধনা করে থাকে। এছাড়াও সংগীতের জন্য দরকার বিধাতাপ্রদত্ত সুরেলা কণ্ঠ। কণ্ঠে বিধাতাপ্রদত্ত সুরের সাম্রাজ্য নিয়ে জন্মগ্রহণ করে থাকে শিল্পীরা। সংগীত হচ্ছে শুদ্ধ সুরেলা উচ্চারণের আর্ট।
সংগীতশিল্পীর অন্যতম অপরিহার্য যোগ্যতা হচ্ছে বিশুদ্ধ উচ্চারণক্ষমতা। উচ্চারণ শুদ্ধ না হলে তার পক্ষে গুণী সংগীতশিল্পী হওয়া সম্ভব নয়। পুরোনো বা আধুনিক গান, ক্লাসিক গান, রাগপ্রধান গান, লোকসংগীত, ইসলামী গান, শ্যামাসংগীত, প্রেমসংগীত, রণসংগীত, মার্চের গান, দেশপ্রেমের উদ্দীপনামূলক গান, সাঁওতালী গান, ঝুমুর গান, বেদেদের গান, ভাটিয়ালী গান, হামদ-নাত, আরবি-ইরানি-তুর্কি-কিউবান-ইংরেজি সুরের গান, আ.চিক ভাষায় গান—কত বিচিত্র ধরনের ও আঙ্গিকের গান পৃথিবীতে দেখে মেলে তার ইয়ত্তা নেই। গান যথাযথভাবে গাওয়ার ক্ষেত্রে শিল্পীকে এই অতুলনীয় সক্ষমতা অর্জন করেত হয়। শিল্পী গান গাওয়ার সময় গানের বাণী তার নিজস্ব চরিত্রে শুদ্ধভাবে, সাংকেতিক ও সাংগীতিক অর্থ-ব্যঞ্জনার অনুকূলে উচ্চারণ করে থাকে।
অতুলনীয় কণ্ঠশিল্পী হয়ে ওঠার অন্যতম কারণ হচ্ছে শব্দের ভিতরের শক্তি সম্পর্কে তার পরিষ্কার ধারণা এবং গান গাইবার সময় শব্দের সেই শক্তিকে প্রস্ফুটিত করে তোলা। বস্তুর ভিতরে গতি ও মহাকর্ষ থাকার মতো শব্দের ভিতরে গতি আছে, ছন্দ আছে, ধ্বনি আছে, ভাব আছে, বেদনা আছে, উচ্ছলতা আছে, ক্রীড়া আছে, মহাকর্ষ আছে, মাধুর্য আছে, ঘ্রাণ আছে, স্বাদ আছে, মেলোডি আছে, ব্যঞ্জনা আছে। শব্দের এই শক্তি ও সম্পদ এবং সে অনুসারে শব্দের সঙ্গে শব্দের পার্থক্য ও মিল বিষয়ে যে-আবৃত্তিশিল্পী এবং যে-কণ্ঠশিল্পী যত বেশি সজাগ ও সক্রিয় থাকেন, তার আবৃত্তি ও গায়কী তত বেশি সফল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ফলে এহেন আমার ব্যক্তিগত অভিমত, গায়কী ষোলআনা সফল এবং সম্ভাবনাময়ী আরেক নাম গারো তরুণ শিল্পী মার্কুস চিসিম।
অনেকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও বলে, সবার জীবনে সফলতা সহজে আসে না। সেই সুযোগও হয়ে ওঠে না সবার, সুযোগ থাকে না; অথবা চেয়েও সুযোগ পায় না সে। আবার কেও কেও স্বপ্নের হরিণ নিজেই তাকে ধরা দেয়। এমন সাত জনমের ভালো কপাল নিয়ে সবাইতো জন্মায় না। মোদ্দা কথা, একজন শিল্পীর ক্ষেত্রেও ধূলোমাখা পথ পাড়ি দিতে হয়। আবার কখনোবা সামাজিক, রাজনৈতিক এবং ব্যক্তিস্বার্থের ঘূর্ণিপাকে কোণঠাসায় উর্তি গায়কীদের অবসাদ জীবন যাপন করতেও দেখি।
তেমনি এক গারো জাতিসত্তার তরুণ ফোক শিল্পী মার্কুস চিসিম। কোন এক রুপালী সন্ধ্যায় ভার্চুয়্যালী আড্ডায় সংগীত জগতে তার ছোট ছোট ইচ্ছেগুলো শৈল্পিক কথামালায় তুলে এনেছে প্রবাসী ফ্রীল্যান্সার, ব্লগার এবং সাংস্কৃতিক কর্মী লুই সাংমা।
গারো তরুণ শিল্পীর জন্ম ১৯৯২ সালে বিড়ই ডাকুনি মিশনে বেলাপাড়া গ্রামে। পিতা বেঞ্জামিন মারাক একজন সাধারণ কৃষক। ছোটবেলা থেকে ধর্মীয় গান এবং তবলা, দা.মাসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের প্রতি প্রচন্ড ঝোঁক ছিল। সংগীতে প্রবল আগ্রহ থাকলেও; ছিল না তার গান তালিমের গুরু। তবুও হাল ছাড়েনি। ঘরোয়া পরিবেশে মা ব্লানদিনা এবং বীনা চিসিম (মাসি) গাওয়া গানগুলো অনুপ্রাণিত করে। ফলে একদিন ঘরোয়া গায়কী থেকে বিভিন্ন স্কুল প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে নিজেই ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠে।
বাংলা ফোক শিল্পী বারি সিদ্দিকীর গাওয়া গান তার জীবনের আরেকটি টার্নিং পয়েন্ট। এরপর ধীরে ধীরে অনুপ্রেরণা, অনুকরনীয়, এবং শ্রদ্ধাভাজন শিল্পীর একনিষ্ঠ ভক্ত হয়ে উঠে; গানগুলো যেমন সোনা চাঁনপাখি, ঘরেও জ্বালা বাইরেও জ্বালা ইত্যাদি গান আত্মস্থ করে রীতিমতো বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোতে গানটি গেয়ে হৈ চৈ ফেলে দেয়। মূলত বিচ্ছেদি ফোক গান দিয়ে গানের জগতে আসা।
বছর পাঁচেক এর বেশি সময় ধরে গারোদের ঐতিহ্যবাহী উৎসব ঢাকা ওয়ানগালা নামে খ্যাত অনুষ্ঠানে সরব প্রদচারণা এবং স্বতস্ফুর্ত অংশ্রগ্রহণ করে জাতিসত্তার সংগীতকেও ভালোবেসে ফেলে এই উদ্যোমী তরুণ শিল্পী। হওয়াটা স্বাভাবিক। এবং এটাই জাতিগত টান। আবেগে নয়, গারো গানকে ভালোবেসে অন্তত তিনটি গান শ্রোতাদের উপহার দিতে পেরেছে। আর্থিক দৈনতার পরও নিজস্ব কিছু জমানো টাকা এবং তার শুভাকাঙ্খীদের অর্থায়নে করা হয়েছে। সে আ.চিক গানগুলো হলো, নিথুজক নিথুজক চা.মে (আর্নিস মান্দা কথা ও সুর এবং শিল্পী যাদু রিছিলের কম্পোজিশান), নিকসেঙ মান্না.. (কথা মালা আরেং ও সুর শিল্পী সমাপন রিছিল এবং কম্পোজিশান শিল্পী কিশোর ক্লোডিয়াস নাফাক), দো.মিসেল..(কথা ও সুর সমাপন রিছিল এবং কম্পোজিশান শিল্পী কিশোর ক্লোডিয়াস নাফাক) এই তিনটি গানই শ্রোতামুগ্ধ হয়েছে বলেও জানায়। বর্তমানে কোভিড ১৯ পেন্ডামিকে এবং আর্থিক সংকটে ইচ্ছে থাকলেও বাকী গানগুলো কম্পোজিশান, অডিশান, ভিজ্যুয়ালেশানে রূপ দিতে পারেনি এখনো। তবে সে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে এই অদম্য গারো শিল্পী। এখনো হাতে ফরিদ জাম্বিল, আর্নিস মান্দা, এবং চাকলা হাগিদক প্রমুখ গারো গুনীজনের লেখা আরো দশটি মৌলিক নতুন গান নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।
ভবিষ্যত পরিকল্পনা সম্পর্কে বলে, গানকে ভালোবেসে গান গেয়ে যাচ্ছি; যাতে গারো নতুন প্রজন্মদের জন্য ভালো কিছু দিতে পারি দেশের মাটিতে। বাংলাদেশে মূলত ভারতের বিশিষ্ট গারো শিল্পীদের গাওয়া গানগুলো বহুলাংশে পরিবেশিত হয়ে থাকে এবং ভালোও লাগে। তবে পাশাপাশি দেশের গুনীজনদের লেখা এবং কম্পোজিশানের গান যদি উপহার দিতে পারি, সেই প্রচেষ্টাই করে যাচ্ছি। আপনারা উপহার হিসেবে ইউটিউব দো.মিশেল প্রডাকশান (Do’mesal Production) এবং ইচ্ছে ছিল (Itchy Chilo) চ্যানেলে দেখতে পাবেন বলেও জানায়। ভবিষ্যতে স্টুডিওতে নিজস্ব কম্পোজিশানে গান উপহার দিবে বলে গভীর আশাবাদ ব্যক্ত করে।
আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞাতাও বলে, আর্থিক দৈনতায় সকলের ইচ্ছে ডানাগুলো অবসাদ অথবা বাধাঁগ্রস্থ হতে বাধ্য, তবে তার ঐকান্তিক ইচ্ছা এবং প্রচেষ্টা মানুষকে সফলতার দৌড় গোড়ায় পৌচ্ছে দেয় এও মিথ্যো নয়। ক্ষেত্রটিতে প্রয়োজন শিল্পীদের নিজস্ব প্রচেষ্টা এবং সামর্থহীনদের জন্য আপনার আমার আর্থিক সংশ্লিষ্টতা, প্রয়োজনুসারে সহায়তা প্রদান ইত্যাদি।