“সব ভালোবাসাই ভালোবাসা না, কিছু ভালোবাসা ক্ষণিকের জন্যও ভালবাসা হয়ে আসে। পৃথিবীর সব ভালোবাসাই পূর্ণতা পায় না। তবে ক্ষণিকের কিছু কিছু ভালোবাসা দুঃখ ভরা স্মৃতি আর এক আকাশ হতাশা রেখে যায়। যা আমাদের আজীবন কাঁদায়।” আরও কথা, এলোমেলো ভাবনা মনের মধ্যে ভীড় করে।

তখন মধ্য রাত। দু’চোখের পাতা এক করার চেষ্টা করছি। অমলিন বিছানায় শুধু এপাশ ওপাশ করছি। শত চেষ্টা করেও চোখে এক ফোঁটা ঘুম নেই। প্রিয় ঘুম কোথায় যেন নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে। বিছানায় শুয়ে সদ্য ঘটে যাওয়া কিছুদিনের স্মৃতিগুলো রোমন্থন করছে সূর্য। ঘুম নেই বলে হঠাৎ কেন জানি লেখা-লেখির দীর্ঘশ্বাস প্রবল হয়ে উঠছে। জাগ্রত হচ্ছে এলোমেলো সব রঙিন কল্পনা, প্রিয় সকল ভাবনা। তোমার কথা ভেবে ঘুম নেই বলেই হয়তো ! পড়ার টেবিলে রাখা সাদা কাগজ আর কালো কালির ছোঁয়ায় ঠিক যেমন এই ছোট গল্পটি।

এইতো দু-তিন দিন আগেও সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল। হঠাৎ কালবৈশাখী ঝরের ন্যায় নিমিষেই সবকিছু লন্ড-ভন্ড হয়ে গেছে। সূর্য ঢাকায় প্রাইভেট ভার্সিটিতে ২য় বর্ষে পড়াশোনা করে। ঢাকা শহরে থাকার মতো কেউ নেই। তাই একটা বাসা ভাড়া নিয়ে কোনো রকমে থাকার বন্দোবস্ত করে নিয়েছে। অচেনা শহরে নিজেকে মানিয়ে নিতে একটু অসুবিধে হলেও বেশ মানিয়ে নিতে শিখেছে সূর্য। কোনমতে ঢাকায় বাসা ভাড়া। একলা থাকা, একলা পথ চলা…. এই গল্পের জন্ম ঐ ঢাকার ভাড়া বাড়ীতেই!

দেশে করোনা মহামারীতে যখন জনজীবন দুর্ভোগময়, তখন সূর্য ঢাকায় অবস্থান করে চার দেয়ালের মাঝে জীবন যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। যখন সারাদেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ, তখন অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে। এই লকডাউনে বাইরে বের হলে করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ভয়, অন্যদিকে সরকারের লালিত সামরিক, বে-সামরিক বাহিনীর হেনস্তার ভয়। সব মিলিয়ে দিনরাত বাসায় বন্দি অসহ্য জীবনযাপন বলা যায়। ইট পাথর, কংক্রিটের চার দেয়ালে অবাধ্য সময় না যাওয়ায় স্বাভাবিক ভাবেই সবাই মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সময় অতিবাহিত করে। এভাবেই ফেসবুক নামক ডিজিটাল প্লাটফর্মেই প্রথম পরিচয়। অতঃপর নিয়মিত কথোপকথন। এরপর সম্পর্কটা গড়াতে গড়াতে প্রেম অবধি গড়িয়েছে।

মেয়েটির নাম সুভাষিণী। মাস-খানেক আগেই ফেসবুকে পরিচয়। মেয়েটির নাম যেমন, তেমনি মিষ্টিসুরে সাহিত্য মাখা কথা ! নাকি প্রেমে পড়লে সকল রমনীদের কথা সুমিষ্ট লাগে ঠিক তখন ঠাহর করতে পারে নি সূর্য। এক কথায় ওসম (awesome) বলতেই হবে। এভাবে চলতে থাকে ভালোবাসা আর সম্পর্কের গভীর রেখা। ভার্চুয়ালি চলতে থাকে জানা অজানা কথার লেনাদেনা। এবং নিয়মিত চলতো। সূর্য তার বাচন ভঙ্গিতে মুগ্ধ হয়ে শ্রবণ করতো, আর সেও দিব্যি হেসে মধুর সুরে নানা কাহিনী, গল্প শোনাতো। বাচন-ভঙ্গি, কথাগুলো এতটাই সুমিষ্ট ছিল যে, তার মুখ দর্শন না করেই সে গভীর প্রেমে তলিয়ে গিয়েছিল। খুবই সহজ সরল, সাদামাটা মেয়ে। সবকিছু খুব সহজেই বলে দেয়। কোন কিছুই মুখে বলতে আটকায় না। ভার্চুয়াল কথাবার্তায় মেয়েরাও এত সহজ সরল হয়, এ প্রথম দেখেছে সূর্য; কি আশ্চর্য ব্যাপার তাই না ?

সুভাষিণীর কথা বলার ভঙ্গি নিছক বাকপটুতা নয়তো! পরক্ষণে সে ভাবে হয়তোবা নয়। তার বিশ্বাস সে আপন দক্ষতায় সাহিত্যের ভাষায় কথা বলে। সাহিত্য মাখা কথা এতটাই শ্রুতিমধুর ছিল যে, তার কথা শুনে যে কেউ প্রেমে পড়তে বাধ্য। অঙ্গবিন্যাস, কথা বলার ষ্টাইল দেখে যে কেউ বলে দিতে পারবে, যে সে সাহিত্য চর্চা করে। আসলে সে নিয়মিত বাংলা সাহিত্য চর্চা করে। ছোট বেলা থেকে তার বাংলা সাহিত্যের প্রতি দুর্বল ছিল। অন্যরকম অনুভূতি কাজ করতো। সেই আগ্রহ থেকেই সাহিত্য চর্চা এবং লেখালেখি। সাহিত্য প্রেমি মানুষ স্বভাবতই সবার থেকে একটু আলাদা। ভিন্ন মাত্রায় চিন্তাভাবনা করে। সাহিত্যের অসীমতার মাঝে নিজের জীবনকেই ডুবাতে চেষ্টা করে। সেও হয়তো ব্যতিক্রম কিছু ছিলো না।

অসাম্প্রদায়িক চিন্তাধারা, মানবতার কথা, সামাজিক চিন্তাভাবনা, পারিবারিক ও ব্যক্তির জীবনী পরিকল্পনার কথা শুনলে যে কারোর মন ছুঁয়ে যাবে! এই দিকটা সত্যিই মনমুগ্ধকর ছিল। এই যুগে সাদামাটা জীবন প্রত্যাশা করে এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া খুবই নগণ্য, দুষ্কর। সুভাষিণী সদ্য কলেজ পাশ করে ভার্সিটিতে ভর্তির পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর মাঝে তার জীবনে সূর্যর ভালবাসার মানুষ আকারে আগমন অপ্রত্যাশিত ছিল বটে। আসলে মানুষের জীবনে কখন কিভাবে ভালো লাগা শুরু, আর সে ভালো লাগা থেকে ভালোবাসার সৃষ্টি হয় সেটা বলে কয়ে আসে না। ভালোবাসা কখনো শেখাতে, শিখিয়েও দিতে হয় না।

সুভাষিণী ভার্সিটি ভর্তির পর জড়ালেও প্রেমে জড়াবে বলে মনোনিবেশ করেছিলো। আন্দাজ করেছি তার জীবনে সূর্যর অপ্রত্যাশিত আগমনে পড়াশোনায় কিঞ্চিৎ ব্যাঘাত হলেও হতে পারে ! ভালোবাসার মানুষের হঠাৎ আগমনে সত্যি সে বেশ খুশিও ছিল। তার মনে প্রশান্তি এনেও দিয়েছিল। যখনই তাদের মাঝে কথা হয় তখনই একে অপরকে ভালোবাসার চাদরে মুড়িয়ে দিতো। এই পাগলামি আর অফুরন্ত ভালোবাসা সত্যি যেন ঐশ্বরিক আশীর্বাদ। এ রকম ভালোবাসা পাওয়া যে কারোর ভাগ্যের ব্যাপার। তাদের এই পাগলামো উভয়ইকেই সারা জীবন ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার জানান দিচ্ছিল। তাদের ভালোবাসা অসীম আকাশের তারার ন্যায়, গভীর সমুদ্রের ন্যায় ভালোবাসার বিশালতা। এমন ভালোবাসা সত্যিই অনেক মূল্যবান। মাঝে মাঝে ন্যাকামো সুরে একজন অন্যজনকে জিজ্ঞেস করে “এতো ভালোবাসো যদি কখনো হারিয়ে যাই।” তখন সে এক বাক্যে বলে দিতো  “হারাতে দিলে তো হারাবা, চাইলেও হারিয়ে যেতে পারবে না। ঘাড় ধরে খুঁজে নিয়ে আসবো!” পরক্ষণেই আবার জিজ্ঞেস করতে দেরি করতো না সাথে সাথে ” যদি মরে যাই!” সাথে সাথেই উত্তর আসতো “আমাকে বিয়ে করার আগে মরবে না, আর মরতে দেব না”। একে অপরের প্রতি অগাধ বিশ্বাস, সীমাহীন ভালোবাসা, অপার আস্থা, আষ্টেপৃষ্টে জাড়িয়ে থাকা সমস্ত খারাপ লাগা, হতাশা, অবসাদ, ক্লান্তি রূপকথার গল্পের জাদুকরের জাদুকরী শক্তির ন্যায় নিমিষেই সব দূর হয়ে যেতো।

এক আকাশ স্বপ্ন নিয়ে দু’জনই ঘর বাঁধার স্বপ্নজাল বুনেছিলো। ভালোবাসার গভীরতা দিনকে দিন গভীর থেকে গভীরতম হয়ে উঠছিলো। একটা ব্যাপার হলো এখন পর্যন্ত তারা কেউ কাউকে কখনো ফিজিক্যালি দেখে নি। ফেসবুকে এক দুটো ছবি দেয়া নেয়া হয়েছে মাত্র। ভালোবাসা আর বিশ্বাসের শক্তি দিনকে দিন সম্পর্কে সামনে অগ্রসর হওয়ার শক্তি ও অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিল।

একদিন উভয়ের সম্মতিতে দেখা করার ইচ্ছা প্রকাশ করে। শুধু ওরা ভেবে পাচ্ছিলা না কোথায় দেখা করবে। এরপর কোথায়, কিভাবে দেখা করবে সব কিছুই প্লানিং ফাইনাল করে ফেলে। সুভাষিণীর খুব ইচ্ছে ছিল ইট-পাথরের শহরে দেখা না করে মাতৃ গ্রামে, গ্রামীণ পরিবেশে সজীবতার মাঝে দেখা করবে। খোলা আকাশে শব্দহীন পরিবেশে হাতে হাত রেখে একে অপরের চোখে চোখ রেখে ঘর বাঁধার, আজীবন এক সাথে থাকার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বাক্য একসাথে উচ্চারণ করবে।

সূর্য সপ্তাহখানেক পরেই গ্রামে যাবে বলে প্রত্যহ পঞ্জিকা মিলাচ্ছে। কিন্তু অপ্রত্যাশিতভাবে সূর্যর সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষার তারিখ প্রকাশ করেছে ভার্সিটি কর্তৃপক্ষ। সে ভাবছে তাদের সমস্ত পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে ! প্রবল ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সূর্যর বাড়ি যাওয়া হয়ে ওঠে নি। নিজের অনিচ্ছা সত্ত্বেও কথা দিয়ে কথা রাখতে না পেরে দুঃখ প্রকাশও করে। যদিও তার বিকল্প কোনো উপায় ছিল না। এরপর আবার মনস্থির করে সামনে বিশেষ কোনো দিনে দেখা করবে। আগের ন্যায় নিয়মিত ভাববিনিময় চলতে থাকে। সবকিছু আগের ন্যায় ঠিকঠাক- ভালোই চলছিলো।

হঠাৎ সূর্যর কেন জানি মনে হলো, সুভাষিণী আর আগের মতো নেই। ভালো মতোন কথা বলে না, কথা বলার পরিমাণ নগণ্য হতে থাকে। এমন ব্যবহারে বুঝতে বাকি রইল না যে, সে রীতিমতো অবহেলা করছে। কি উদ্দেশ্য, কি কারণ ছিল সেটা অজানা। তবুও সে সারাদিন চুকিয়ে কথা বলার অপেক্ষায়, সাহিত্য মাখা কথা শুনার প্রবল ইচ্ছায় প্রহরগুনছে। এরপর হঠাৎ সুভাষিণীর নাম্বার থেকে মেসেঞ্জার থেকে অতি অল্প সময়ের জন্য উত্তর আসে “আমি ব্যস্ত আছি, পরে কথা বলব !” সূর্য বোকার মত সব মেনে নেয়। সারাক্ষণ শুধু অনুভব করে সুভাষিণীর শূন্যতা। নিজের অজান্তেই বাড়তে থাকে হতাশা। কোন কিছুই ভালো লাগে না। এক বুক হতাশা নিয়ে ভাবে “এই কি সেই সুভাষিণী ছিল, যার সাথে আমি এতদিন কথা বলতাম।” এতদিনের তিলে তিলে গড়া সম্পর্ক কীভাবে যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল। সূর্য সম্পর্কের ফাটলে নিয়মিত পানি ঢালে। যাতে করে ফাটলের পরিধিটা বেড়ে না যায়। সবসময় সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করে। সে সুভাষিণীকে অনেক করে বুঝিয়ে বলে, সময় না দেওয়ার কারণ জানতে চায়। ওপাশ থেকে একটি উত্তরই আসে “মনে বিশ্বাসকে লালন করো, অযথাই ভুল বুঝচ্ছ” আস্তে আস্তে !

সূর্য হতাশায় নেশাগ্রস্ত। অন্ধকার ঘরে সিগারেটের ধোওয়ার সাথে ফিস ফিস করে কি সব পাগলের মতো প্রলাপ করতে থাকে। আগের থেকে সম্পর্কের অবনতি দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। স্বপ্নের গড়া সম্পর্ক এই বুঝি ইতি হতে চলেছে।                             ভাগ্যের বুঝি এমনই পরিহাস ছিল! কথায় আছে “সব ভালোবাসাই ভালোবাসা না, কিছু ভালোবাসা ক্ষণিকের জন্যও ভালোবাসা হয়ে আসে। পৃথিবীর সব ভালোবাসাই পূর্ণতা পায় না। তবে ক্ষণিকের কিছু কিছু ভালোবাসা দুঃখ ভরা স্মৃতি আর এক আকাশ হতাশা রেখে যায়। যা আমাদের আজীবন কাঁদায়।” আরও কথা, এলোমেলো ভাবনা মনের মধ্যে ভীড় করে।

মধুর সম্পর্কে যে ফাটল ধরেছে, তা আগের অবস্থানে আসা সত্যিই দুষ্কর ব্যাপার ছিল। কেননা এখন আর আগের মতো কথা হয় না। ওপাশ থেকে কোন ম্যাসেঞ্জারে বার্তা, আর কল আসে না। তবে সূর্য  সম্পর্কের ব্যাপারে বিশ্বাসে অটল। সে ফিরবে বলে সে আশায় বুক বেঁধে আছে। আগের মতোন সাহিত্য মাখা কথা শুনার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। এখনো বিশ্বাস সুভাষিণী ফিরবে, আগের মতোন তাকে ভালোবাসবে। সূর্য নিজেও বিশ্বাস করে সেও তাকে ভালোবাসে, সেও তাকে চায়, সেও হইতো তাকে ভালোবাসে হারাতে চায় না। হয়তো সেও সূর্যকে পাবার জন্যে নীরবে নিভৃতিতে অঝোরে, কিংবা বালিশ ভিজিয়ে চুপিসারে, সঙ্গোপনে কাঁদে!

একদিন হঠাৎ সূর্য লোকমুখে শুনতে পায়, সে অন্য কারো সাথে ঘর বাঁধার সপ্ন দেখছে। কথাগুলো শুনে শুন্যবুক ধুমরে মুচড়ে ওঠে…….। সূর্যও এক বুক চাপা কষ্ট নিয়ে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে। চাইলেই কী সব ভুলা যায় ? সূর্য একা চাইলেই কী ভেঙ্গে যাওয়া এলোমেলো স্বপ্নগুলো আবার এক করতে পারবে ? এমন হাজারও প্রশ্ন যেন ঘুরপাক খেতে থাকে। হঠাৎ সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে, ওপাশ থেকে সেই সাহিত্য মাখা কন্ঠস্বর সুভাষিনীকে নতুন করে আবিষ্কার করে সূর্য।

তরুণ লেখক- ধ্রব মানখিন (থাংবাদ)

শিক্ষার্থী– ইংরেজি বিভাগ, শান্ত–মারিয়াম বিশ্ববিদ্যালয়।