আজ সকালে ঘুম থেকে উঠেই ফেসবুকে সবার্গ্রে দেখতে পেলাম ক’জন আদিবাসী স্বজন, বন্ধু কিংবা কোন ভাইয়ের বিরুদ্ধে ডিজিটাল মামলা হয়েছে। অর্থাৎ জাতীয় পক্রিকার সিনিয়র সাংবাদিক নিখিল মানখিনসহ তিনজনের বিরুদ্ধে ডিজিটাল আইনে মামলা ঠুকেছে। আমার জানার সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে, তবে আমার জানা মতে এটিই প্রথম কোন গারো আদিবাসী ভাইয়ের প্রতি অভিভাবক সূলভ কোন নেতা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে অভিযোগটি নথিভূক্ত করেছেন।
এরপর যদ্দুর ভার্চ্যুয়ালি জানতে পারলাম, TWA’র (ট্রাইব্যাল ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন) মেয়াদ উত্তীর্ন শাখা কমিটির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সাংবিধানিক ও সাংগঠনিক জটিলতা নিরসনকল্পে অনলাইন শীর্ষক আলোচনার সভাপতি, সঞ্চালক এবং এক আলোচকের বিরুদ্ধে দেশের জিডিটাল নিরাপত্তা আইনে গত ১৮ জুলাই ২০২১ ইং তারিখে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
অভিযোগ পত্রের কপি পড়ে দেখা গেল মামলার অভিযোকারী জনাব জুয়েল আরেং এমপি, ময়মনসিংহ-১ (হালুয়াঘাট-ধোবাউড়া), এবং মামলায় অভিযুক্তরা হলেন অনলাইন সঞ্চালক জন জেত্রা, সভাপতি নিখিল মানখিন এবং সম্মানীত আলোচক সুভাষ বর্মন।
ঐ মামলার প্রাথমিক তথ্য বিরণীতে বলা হয়, ইলেক্ট্রনিক্স ডিভাইস ব্যবহার করে আক্রমণাত্মক, মিথ্যা, মানহানীকর তথ্য প্রকাশ ও প্রচারে করে আইন শৃঙ্খলা অবনতি করাসহ সহায়তা করার অপরাধে এদেরকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
এ বিষয়ে অনলাইন সঞ্চালক মি. জন জেত্রার সঙ্গে যোগাযোক করলে তিনি অকপটে বলেন, আমাদের নামে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গত ১৮ জুলাই ২০২১ ইং তারিখে মামলা দায়ের হয়েছে। অনলাইনে আলোচনার মূল উদ্দেশ্য ছিল করোনাকালীন সময় আদিবাসীদের জাতীয় সেবাদাকারী প্রতিষ্ঠান ট্রাইব্যাল ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনের মেয়াদ উত্তীর্ন শাখা কমিটির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সাংবিধানিক ও সাংগঠনিক জটিলতা নিরসনকল্পে সুষ্ঠু সমাধানে বিশেষ উদ্যোগ। সেই আলোচনা সভায় সঞ্চালক হিসেবে দায়িত্বপালন করেন জন জেত্রা এবং সভাপতিত্ব করেছিলেন জনকন্ঠের সাংবাদিক নিখিল মানখিন। এছাড়াও আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আদিবাসী সমাজের প্রতিনিধিত্বকারী ব্যক্তি অধ্যক্ষ অঞ্জন ম্রং, সাংগঠনিক সম্পাদক সমিরন কুমার সিংহ সহ বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গ।
এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনের অতীত বর্তমান দায়িত্ব প্রাপ্ত নেতৃবৃন্দের কার্যক্রম ও ভূমিকা আলোচনার এক পর্যায়ে আবেগ আপ্লুত হয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে সুভাষ বর্মন জনাব জুয়েল আরেং কে ‘দুই নম্বর লোক’ বলে আখ্যায়িত করেন। যদিও এই বক্তব্য আমাদের কারোর কাম্য ছিল না। যার জন্য পরবর্তীতে রুপচান বর্মনের ফেইসবুক আইডি থেকে সুভাষ বর্মন জনাব জুয়েল আরেং কাছে আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করেন এবং উনার বক্তব্য প্রত্যাহার করে নেন।
আমি ধরে নিচ্ছি আমজনতা, দেশের কিছু প্রজা ভুল করেছে, ভুলও স্বীকার করে বক্তব্যও প্রত্যাহার করে নিয়েছে। যদি তাই হয় একজন অভিভাবক, সংসদ নেতা হয়ে এই সামান্য গালিগালাজ আপনি হজম করতে পারলেন না, হজম করতে না পারলেও ডিজিটাল আইন কী এর শেষ সমাধান! নাকি- ঘরোয়া, সামাজিকভাবে এর সুন্দর সমাধান করা যেত কি ! একটি গণতান্ত্রিক দেশে আমরা প্রত্যেককেই বাক স্বাধীনতার প্রতি যদি শ্রদ্ধাশীল হই, তাহলে একজন লোক আমাকে মন্দ, খারাপ বললেই কি সে মন্দলোক হয়ে যায়! ভার্চ্যুয়াল বাক বিতন্ডা ছাড়াও ভুর্চ্যয়ালের বাইরে, গোচরে অগোচরে নেতা নেত্রীর বিরুদ্ধে গাল মন্দ করে এদের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নিতে দেখি না! এখানেই বিষয়টি গভীরভাবে ভাবার বিষয় আছে।
পৃথিবীতে এমন অনেক নজির আছে শুধু নেতা, এমপিকে পেছনে বা সামনা-সামনি গালিগালাজ নয়, দেশের প্রেসিডেন্টকে পর্যন্ত সরাসরি এবং শারীরিকভাবে হেনস্তা করতে দেখা যায়। এইতো কিছু দিন আগে ফরাসী প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ দক্ষিণপূর্ব ফ্রান্সের দ্রোম অঞ্চল দেশটিতে করোনা মহামারীর কারণে জনজীবনে আরোপ করা নানা বিধিনিষেধ উঠিয়ে নেবার পর কিভাবে মানুষ আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরছে তা নিয়ে সরাসরি কথা বলার জন্য ম্যাক্রোঁ ওই এলাকার রেস্তোরাঁকর্মী ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলে সেখানেই এই হেনস্তের শিকার হন ফরাসী প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ। তিনি সফরে থাকার সময় ভিড়ের মধ্যে হঠাৎ চড় মেরে বসেন এক ব্যক্তি। বলা যায় তখন পৃথিবীর সকল মিডিয়ায় ঘটনাটি আলোচনা সমালোচনায় সাড়া ফেলে দেয়।
এছাড়াও ইতিহাস ঘাটলে আরও দেখা যায়, ১৪ ডিসেম্বর ২০০৮ সালে ইরাকের ঘটনা। তখন ক্ষমতাধর দেশের প্রেসিডেন্ট ছিলেন জর্জ ডব্লিউ বুশ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শেষবারের মতো ইরাক সফরে যান জর্জ ডব্লিউ বুশ৷ সে সময় এক সংবাদ সম্মেলনে বুশকে লক্ষ্য করে জুতা নিক্ষেপ করেন ইরাকি সাংবাদিক মুনতাজের৷ অবশ্য তাঁর ছোড়া জুতা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়৷ এরপর আদালত তাঁকে প্রাথমিকভাবে তিন বছরের কারাদন্ড দেয়৷ কিন্তু অতীতে তাঁর বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ না থাকায় পরবর্তী সময়ে তাঁর সাজা কমিয়ে ১ বছর করা হয়৷ বিভিন্ন মিডিয়াতে আরও এও বলা হয় যে, বুশকে লক্ষ্য করে জুতা নিক্ষেপের আগ পর্যন্ত তেমন একটা পরিচত ছিলেন না ৩০ বছর বয়সী টিভি সাংবাদিক মুনতাজের আল-জাইদি৷ কিন্তু গত ১৪-ই ডিসেম্বরের সেই ঘটনার পর ব্যাপক আলোচিত-সমালোচিত হন তিনি৷ একাধিক সংবাদমাধ্যমের দাবি, এই ঘটনা তাঁকে ইরাকে নায়কের মর্যাদা এনে দিয়েছে৷ কারাগার থেকে মুক্তির পর ইরাকে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করবেন সাংবাদিক মুনতাদির৷
এহেন মূল কথা হলো- আপনি যদি একটি এলাকা, সমাজের কিংবা রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করেন ভার্চ্যুয়ালি একটি গালির জন্যে বক্তব্যটি তুলে নেবার পরও ডিজিটাল আইনে মামলা রুজু করে আপনার প্রতি মানুষের আস্থাকে আরও একবার প্রশ্নবিদ্ধ করে কী? আপনারা যদি এমন কর্মকান্ড আয়নার সামনে করে দেখান তাহলে আপনার প্রতি, আদিবাসীদের একমাত্র জাতীয় এবং সেবামূলক সংগঠন TWAর প্রতি জন মানুষের আস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? বিষয়টি গভীরভাবে ভেবে ডিজিটাল সমাধানে না গিয়ে, অযাচিত যৎ সামান্য ভুল ক্ষমা করে দিয়ে আপনি একজন মহৎ, আদর্শবান অভিভাবকের পরিচয় দিতে পারতেন কী!
আইনকে শ্রদ্ধা এবং ব্যবহারের অধিকার সবার সমান। কিন্ত ক্ষমতায় বসে আইনের দোহায় দিয়ে কথায় কথায় আইন ব্যবহারের চর্চা, সেটিও ক্ষমতার অপব্যবহার, অপরাধের মধ্যেই পড়ে। আসল কথা হলো, শুধুমাত্র মানি লোকের মান রাখলে তো হবে না, তাহলে দেশে মানহীন, স্ট্যাটাসহীন লোকদের নিয়ে কে ভাববে? এসব আমজনতার অবদানের জন্যেই সমাজে কেউবা নেতা-নেত্রী হয়ে ওঠে। কেউ যদি নিজেকে অভিভাবক মনে করে তাহলে ওদের কথাও ভাবুন, ওদের দু:খ দুর্দশার কথা ধৈয্য ধরে শুনুন। সামান্য ভুলের জন্যে কোন অভিভাবক আবেগ তাড়িত হয়ে কোন স্নেহতুল্য ছেলে মেয়ে বা সন্তানের প্রতি এমন বিমাতাসূলভ আচরণ আমাদের কাম্য নয়, সবার কাছে দৃষ্টিকটুও লাগে।
মোদ্দা কথা, করোনায় বিপর্যস্ত আমরা আদিবাসীরাও। আদিবাসী জনগোষ্ঠির বিরাজমান দাবি দাওয়া সমাধান না করে ইস্যূগুলো জিইয়ে রেখেছে সরকার। এরই মধ্যে নতুন করে, নতুন বিষয় বা ইস্যূ নিয়ে নিজেদের মধ্যে বিচ্ছেদ, ব্যবধান না বাড়িয়ে; বরং চলমান সমস্যার দ্রুত সমাধানসহ TWAর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দিয়ে পিছিয়ে পড়া আদিবাসী জাতিগোষ্ঠির উন্নয়নকে তরান্বিত করা উচিত। এ বিষয়ক গ্রহণযোগ্য উদ্যেগ নিয়ে সকল নেতাদেরকেই আগে এগিয়ে আসতে হবে। নচেৎ এর সকল দায়ভার আপনার আমার, এবং আমাদের সকলের ওপর বর্তাবে।
দেশের ডিজিটাল আইন এবং অন্যান্য সকল আইনসমূহ জন কল্যাণেই প্রণীত হয়েছে। উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে নয়; আমরা চাই সে সকল আইন যেন সঠিক ব্যবহার এবং যথা স্থানে ব্যবহৃত হোক সেটিই আমাদের সকলের প্রত্যাশা।
লুই সাংমা, ফ্রান্স
ওয়েভ ডেভেলপার, ব্লগার, আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সার এবং
সাংস্কৃতিক কর্মী, lchiran76@gmail.com