বিশ্বের বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশের নাম এখনো মুছে যায় নি। শীর্ষ দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশ ১৪তম। প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে দুর্নীতির ধারণা সূচক প্রকাশ করে থাকে বার্লিনভিত্তিক ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই)। প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। এবার দুর্নীতির ধারণা সূচকে (করাপশন পারসেপশন ইনডেক্স- সিপিআই ২০১৯) বাংলাদেশের স্কোর ২৬। গত বছরও একই স্কোর ছিল বাংলাদেশের। দুর্নীতির এই তালিকার বিশ্বের ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৬তম। (তথ্যসূত্র: ২৩ জানু ২০২০) সেই বিবেচনায় বাংলাদেশের স্কোর ২৬ হওয়ায় দুর্নীতির ব্যাপকতা এখনো উদ্বেগজনক।
ভিন গায়ের দুর্নীতির কথা বলবো কেন, বলা সমীচিনও নয়। ভিন গায়ের দুর্নীতি বলার আগে নিজ দেশ, এবং দেশের অর্থনীতি সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকা দরকার। দুর্নীতির ব্যাপকতা ও গভীরতার কারণে বাংলাদেশ উন্নয়নে পিছিয়ে। আপসোস হয়, দেশ এর চেয়েও বেশি এগিয়ে যেতে পারতো। যেতো কি! প্রত্যাশানুযায়ী এখনো হয়ে উঠে নি।
যা হোক, অসন্ন গারো ক্রেডিট নির্বাচন সংক্রান্ত দুর্নীতি বিষয়ক ভাবনাটা অবশ্য একান্তই আমার। কাউকে হেয় বা পক্ষপাতিত্ব করে লিখছি না। আমাদের সামনে সচেতনার কোন বিকল্প পথ নেই। ফলে পূর্ণ ধ্যান-ধারনা এবং বস্তবতার নিরীক্ষে লিখছি। দু’কলম লেখার অধিকারও আছে। তবে ব্যক্তি হিসেবে নয়। একজন সমিতির খাস সদস্য এবং শুভার্থী হিসেবে। তবে বলতে পারেন ব্যক্তিগত তাগিদ থেকে কথাগুলো লিখতে বাধ্য হচ্ছি। কাউকে না কাউকে কিছু বলতে হয়। কিছু লেখার থাকলে লিখতে হয়। যাকে আমরা বলি গণতান্ত্রিক অধিকার। সমাজের অসঙ্গতিগুলো চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে হয়। এটিই এ যুগের রেওয়াজ। এটি আমার নৈতিক দায়িত্বও বটে।
সপ্তাহব্যাপী সোস্যাল মিডিয়া ফেবুতে লক্ষ্য করছি নির্বাচনী দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই দু’দলের অবস্থান চাঙা করছে। দিগ্বিদিক আওয়াজ তুলছে। একেওপরের মধ্যে চলছে কাদা ছুরাছুড়ি, কানামাছি খেলা। মোদ্দা কথা, নির্বাচনী গরম হাওয়া বৈছে। নির্বাচনী ব্যানার ফেসটুন ছেয়ে গেছে ঢাকার অলি গলি। মিটিং-মিছিল, নির্বাচনীর বহর দেখে মনে হবে কোন জাতীয় সাংসদ নির্বাচন। নির্বাচন মাঠ এমনই হয়; যা দেখে দেশের জনগণও অভ্যস্ত।
আমার প্রবাস জীবনে উন্নত বিশ্বের অন্যতম দেশ ফ্রান্সে দু’বার জাতীয়, পৌর নির্বাচন স্বচোখে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। নির্বাচনের বিধি মেনে গুটি কয়েক পোষ্টার, লিফলেট এবং নির্দিষ্টস্থানে জনসমাবেশ, জন সংযোগ ছাড়া তেমন কিছু চোখে পড়েনি। এমন কি নির্বাচনের দিনও শান্ত স্বাভাবিক পরিবেশ দেখেছি। এসব দৃশ্য দেখে বুঝার উপায় নেই জাতীয় নির্বাচন চলছে। নির্বাচিত হয়ে তাঁরা গোটা দেশের প্রতিনিধিত্ব করে। কি অবাক করা বিষয়! অথচ দেশের ক্ষুদ্র সমিতি, খুবই নগন্য একটি অর্থলগ্নী প্রতিষ্ঠানে নির্বাচনের উল্টো চিত্র আমরা লক্ষ্য করছি। ফলশ্রুতিতে নির্বাচনী বাহার, হালচাল দেখে উৎসব মনে হলেও স্বভাবত প্রশ্ন জাগে, সেখানে আপনার নিজের কোন ব্যক্তিগত স্বার্থ জড়িয়ে আছে কি? অশংঙ্কাজনক ব্যাধি করোনাকেও পাত্তা না দিয়ে দলের প্রচার প্রচারণায় ঢাকাবাসীর ঘুম হারাম করে কিসের এতো মহোৎসব?
যদি কোন ধরণের গোলযোগ না হয় তাহলে ঢাকা গারো কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লি.-এর নির্বাচন আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হবে। আমার লিখার আগ্রহ নির্বাচন নিয়ে নয়। আমার লেখার আগ্রহ, আপনি কারি কারি টাকা খরচ করে নির্বাচন করছেন এর হেতু কি?
এর প্রতিত্তোরে কেউবা বলবেন স্রেফ জনসেবা! খুবই ভালো কথা। গারো কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লি. নির্বচনী খরচের রেকর্ড বলে, এ ধরণের নির্বাচন আয়োজন করতে প্রতি নির্বাচনে কমপক্ষে ৭ লক্ষ টাকা খরচ করে প্রতিষ্ঠানটি। নিজেকে প্রশ্ন করুন, এমন মোটা দাগের টাকা এটি কার? এবার সাধারণ গানিতিক হিসেব কষে নেয়া যাক, ৭ লক্ষ টাকা প্রতিষ্ঠান ব্যয় করে এবং আরও একেকজন প্রার্থী (আনুমানিক) কম করে হলেও ৩ বা অধিক টাকা খরচ করবেন নগন্য একটি নির্বাচনে। এবার প্রতিষ্ঠান এবং প্রার্থীর বিষয়টি কি দাঁড়ালো? এসব প্রার্থীরা নির্বাচনে লক্ষ লক্ষ টাকা ধার দেনায় নির্বাচন করে। লক্ষ টাকা খরচ করে আমাদের প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ সদস্যরা কি সুফল পায়? নির্বাচিত প্রার্থীরা মাসনদে এসে আমাদের কি প্রতিদান দেয়?
এবার সমিতি দুর্নীতির আরেকটু গভীরে প্রবেশ করা যাক। কিছুদিন আগেও ‘যমুনা টিভি’র এক প্রতিবেদনে চট্টগ্রাম খ্রীষ্টিয়ান কো-অপারেটিভ সমিতি কর্মকর্তাদের নজিরবিহীন অর্থ লুটপাট খবর প্রকাশিত হয়। ভুয়া তথ্য ও কাগজপত্রের মাধ্যমে বিনিয়োগের আড়ালে ৯৭ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দ্য কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লিগ অব বাংলাদেশ লিমিটেডের (কালব) সাবেক চেয়ারম্যানসহ ৭ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) প্রণব কুমার ভট্টাচার্য বাসসকে মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন (তথ্যসূত্র: ইত্তেফাক অন লাইন)। টাঙ্গাইল জেলার মধুপুরে জলছত্র আ.বিমা ক্রেডিট ইউনিয়ন থেকে প্রায় ১ কোটি সমিতির গচ্ছিত অর্থ তচ্ছরুপ হয়েছে এবং মামলাটি চলমান (এক বিশ্বস্ত সূত্রে), ময়মনসিংহ খ্রীষ্টায়ান ক্রেডিট ইউনিয়ন, ময়মনসিংহ আ.চিক হাউজিং সোসাইটির অর্থ আত্মসাৎ হয়েছে এবং মামলাটি চলমান রয়েছে (এক বিশ্বস্ত সূত্রে)। এ ব্যাপারে ‘একুশে চোখ’ সরেজমিন প্রতিবেদনটি করেন। এছাড়াও এরকম প্রত্যেক খ্রীষ্টানসহ আ.চিক সমিতিগুলোর অডিট রিপোর্ট ঘাটলে, হালনাগাদ করলে দেখা যাবে এর অসল রহস্য এবং লুটপাটের মূল হোতা আসলে কারা! সকল খ্রীষ্টিয়ান ক্রেডিটগুলোতে গারোরাও এখন সদস্য। মসনদে বুক ফুলিয়ে তারাও এখন সামিল হয়।
মোদ্দা কথা, গারো কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লি. নিয়ে আমাদের অতীত অভিজ্ঞতাও খুব সুখকর নয়। বরং দিনকে দিন দুর্নীতি, দুর্নীতিবাজদের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। ফলে ক্রেডিট ইউনিয়ন মানেই অগণিত মানুষের কাছে একটি জোচ্চোরদের আখড়া। অসৎ লোকের অভয়ারণ্য। যে বা যারাই মসনদে যায় হরিলুট করে খায়। সমিতির বিধি বিধান তোয়াক্কা করে না। তারা কেউ কোনকালে দায়বদ্ধ নয়। সকল অনিয়ম ও দূর্নীতিই এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান ঐতিহ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্বাচনে সৎ গারো এবং কোয়ালিফাইড প্রার্থীরা নির্বাচনে বরাবর অনুপস্থিত। কদাচিৎ নির্বাচনে গেলেও তাদের পরাজয় বরণ করতে হয়। এসব সমিতিতে বেশিরভাগ অদক্ষ, অসৎ এবং দুরভিসন্ধি লোকদের আনাগুনা বেড়ে গেছে। বর্তমানে সমিতির নির্বাচন মানে ক্ষমতায় যেকোন উপায়ে যাওয়া। আরাম-কেদারা দখল করা। অর্থাৎ সুই হয়ে ঢুকে ফাল হয়ে বের হওয়ার মতোন। সুযোগে এবং ভদ্রতায় ধান্দাবাজি। নির্বাচিত পর্ষদ এবং কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজসে এসব দুর্নীতির জন্ম দেয়। দুর্নীতির আষ্টেপৃষ্টি জড়িয়ে ফেলে। সে দুর্নীতির গ্লানি টানতে হয় সকল নিরাপরাধ সদস্যদের। সমিতিকে বারোমাস গুণতে হয় লসের হিসেব। মেরুদন্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারে না আমাদের নিষ্কন্টক স্বপ্নগুলো।
ঢাকা গারো কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লি. এর অর্থিক তছরুপ এবং ঋণ খেলাপি সম্পর্কে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তার তথ্য মতে, সমিতি বর্তমানে চরম অর্থিক সংকট এবং অস্থিতিশীল অবস্থা বিরাজ করছে। এছাড়াও করোনার প্রভাব সমিতিতে অর্থিক সূচক উদ্বেগজনক হারে কমে যাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ক্ষমতাসীন দল কিছু ভালো কাজ করলেও প্রাজ্ঞতার পরিচয় দিতে পুরোপুরি ব্যর্থ। ভবিষ্যতেও পারবেন কি না জানি না। কাজের অভিজ্ঞা, দক্ষতা না থাকলে যা হবার তাই হয়। এবারে বিরোধী দলও যোগ্য প্রার্থী তাও মনে করেন না। বিগত সময়ে বিভিন্ন সমিতিতে দুর্নীতির ঘা এখনো শুকায় নি। সে যদি দুর্ভাগ্যক্রমে ক্ষমতায় পর্ষদে আসে তাহলে এমন বেসামাল সমিতি এবং দুর্নীতির দৌরাত্য সামলাবে কি করে? এখন বাকি বিষয় বুঝে নেয়ার দায়িত্ব আপনাদের সকলের।
এমন দোদুল্যমান পরিস্থিতে নির্বাচনে না গিয়ে দুটি প্যানেল মিলে যোগ্য প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়ায় যেতে পারতো, অথবা প্রয়োজনে প্যানেল বহির্ভূত যোগ্য কাউকে সমিতির বিশেষ ক্ষমতা বলে পর্ষদে আসীন করলে একদিকে যেমন মৃতপ্রায় সমিতি ফিরে পেত মহাপ্রাণ এবং অন্যদিকে সমিতির নির্বাচনী বরাদ্দের অর্থও বেঁচে যেতো। ঢাকা গারো কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লি. গারোদের জন্য একটি গর্ভের নাম হতে পারতো। অনন্য উদহরণ হতে পারতো। এমনটি না হলে অদক্ষতা, কাজের কোয়ালিটিকে ধারণ করতে না পারলে অধুনা নির্বাচনের নিনাদ ও নির্বাচনের সকল দামামা নিরর্থকই থেকে যাবে। সন্দেহাতীতভাবে দীর্ঘ মেয়াদী জোচ্চোরদের আখড়ায় পরিনত হবে।
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে, সমবায় সমিতিতে দুর্নীতির ব্যাপকতা ও গভীরতার কারণে বাংলাদেশে দুর্নীতিগ্রস্ত বা বাংলাদেশের অধিবাসীরা সবাই দুর্নীতি করে- এই ধরনের ভুল ব্যাখ্যা দেয়া হচ্ছে। যদিও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও দারিদ্র্য দূরীকরণসহ সর্বোপরি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে কঠিনতম অন্তরায় দুর্নীতি, তথাপি দেশের সকল আপামর জনগণ দুর্নীতিগ্রস্ত নয়। তাই আমি হলফ করে বলতে পারি, সততায় এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনায় এই গারো কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লি. ঢাকার গারো আদিবাসীদের অর্থনৈতিক অভিবাক হতে পারতো। করোনাকাল বা যে কোন দুর্যোগের আর্থিক প্রনোদনায় অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারতো। এখনো পারে নি। ভবিষ্যতেও পারবে কি না প্রশ্নটি উহ্য রয়েই গেলো।