বাপন নেংমিঞ্জা, শেরপুর: বাংলাদেশে বসবাসরত গারো আদিবাসীদের জীবন-মান, সমস্যা, ক্রান্তিকাল, পাওয়া বা পাওয়ার গল্প বললে হয়তো আরব্য রজনীর গল্পগুলোর মত একহাজার একরাতের বেশিও সময় লেগে যেতে পারে। গারো আদিবাসীদের এই দেশে রয়েছে শত শত বছরের ইতিহাস। তেমনি বাংলার বুকে একটি গারো জনপদের নাম আ.বিমা।
কেন বা কী অর্থে আ.বিমা ?
গারো ভাষায় আ.বিমা শব্দটির বাংলা তর্জমা করলে দাঁড়ায় ‘আ’ বা ‘হা.আ’ মানে ‘মাটি’ আর ‘বিমা’ স্ত্রী লিঙ্গার্থে ‘মা’ । অর্থাৎ আ.বিমা শব্দটির সন্ধি বিচ্ছেদ করলে এমন দাঁড়ায়, আ+বিমা=আ.বিমা, যার আক্ষরিক অর্থ হলো ‘মাটির মা’ । এ শব্দটিকে ব্যাপক অর্থে মাটির উর্বরতা, উর্বর ভূমিকে বুঝানো যেতে পারে। আসলে বাস্তবেও তাই। মধুপুরের মাটিতে যেকোন বীজ বপন করলেই যেন সোনা ফলে। তাইতো লোক মুখে সহসায় বলতে শুনা যায় যে, মধুপুরের মাটি সোনার চেয়েও খাঁটি।
মোদ্দা কথা, বন পাহাড়ের সঙ্গে গারোদের অবিচ্ছেদ্য অংশ, যেন একটি নাড়ীর বন্ধন। স্বাধীনতাত্তোর এবং এর স্বাধীতার পরবর্তী গারোদের মাতৃভুমি বাংলাদেশ। অনেক ক্ষেত্রে আ.বিমা শব্দটি মাতৃভূমির চাইতেও বড় অর্থে ব্যবহৃত হয়। এক্ষেত্রে এটিও বুঝানো হয় আ.বিমা হলো এমন একটি স্থান যেটি গারো আদিবাসীদের শেকড়কে ইঙ্গিত করে। বাংলায় এই আ.বিমা অঞ্চলকে বোঝাতে গেলে টাঙ্গাইল জেলাধীন মধুপুর উপজেলায় বসবাসরত গারো জাতিগোষ্ঠীর জনপদকে বোঝানো হয়। আরও ব্যাপক অর্থে বলতে গেলে শুধু মধুপুর নয়; ময়মনসিংহ জেলাধীন কিছু গ্রাম, জামালপুর জেলার মধুপুর ঘেষা কিছু গ্রাম অর্থাৎ ব্রম্মপুত্র নদীর দক্ষিণাংশে অবস্থিত গারো জনপদ এই এলাকার অন্তর্গত।
আ.বিমা গারো জনপদে সমস্যা, আন্দোলন সংগ্রামের গল্প
মধুপুর আ.বিমায় গারোদের বহু বছর ধরে বসবাস হওয়ায় রাজনৈতিক নানা সমস্যায় জর্জরিত হতে হয়েছে যুগের পর যুগ। আর এই সমস্যাগুলো কাঁটার মালা হয়ে গেথে আছে এই এলাকার আকাশে বাতাসে। ডকুমেন্টারি তৈরি করতে গিয়ে গারোহাব পরিবার সবার আগে যে সমস্যাটি খুঁজে পেয়েছে তা হল ভূমি সমস্যা। এই ভূমি সমস্যায় হাজার সমস্যার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
ডকুমেন্টারিতে থাকছে ১৯২৭ সাল থেকে শুরু করে অদ্যাবধি বিভিন্ন রাজনৈতিক সমস্যার কথা, গারোদের সরল সাধারণ জীবন ধারায় বাধ সাধা উল্লেখযোগ্য ঘটনার- দুর্ঘটনার উল্লেখযোগ্য গল্প। ২০০৪ সালে ইকোপার্ক আন্দোলনে নিহত শহীদ পীরেন স্নাল ও চিরজীবন পঙ্গুত্বকে বরণ করে নেওয়া আরেক যোদ্ধা উৎপল নকরেকের নিজ মুখে শোনা গল্প। ২০০৪ সালের ৩ জানুয়ারী ইকোপার্ক বিরোধী আন্দোলনের মিছিলে গিয়ে পুলিশ ও বনরক্ষীদের গুলিতে নিহত হয় পীরেন স্নাল। দুটি পা হারিয়ে আজীবন পংগুত্বকে বরণ করে নেয় উৎপল নকরেক। এছাড়াও আহত হয়েছেন আরও অনেকেই।
মধুপুর বনে গারোদের সমস্যার অন্ত বা শেষ নেই। ইকোপার্ক নির্মাণ অল্প পরিসরে বন্ধ থাকলেও বিভিন্ন প্রজেক্টের নাম করে আবারও উচ্ছেদ আতঙ্ক ছড়ানো হচ্ছে আদিবাসীদের মনে। তার মধ্যে শালবন ধ্বংশ করে উডলট বাগান, গারোদের ধানী জমি ধ্বংশ করে বিনোদনের জন্য লেক খনন ইত্যাদি নানা সমস্যা লেগেই আছে আ.বিমায়। আদিবাসীদের এই বর্তমান দুরাবস্থা ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথাগুলোও স্থান করে নিয়েছে এই ডকুমেন্টারিতে।
দ্যা রিয়েল হিরো অফ গারোজ ডকুমেন্টরি তৈরির মানসপট
গারো আদিবাসীদের আ.বিমায় এই জীবনধারার নিপীড়িত, নির্যাতিত, দুঃখময় স্মৃতিকে আগামী প্রজন্মের জন্য ক্যামেরায় বাক্সবন্দী করতেই গারোহাব ‘দ্যা রিয়েল হিরো অফ গারোজ’ ডকুমেন্টারি তৈরি করে প্রকাশ করেছে ও উম্মুক্ত করেছে আজ বৃহস্পতিবার গারোহাব নান্দনিক ইউটিউব চ্যানেলে।
ডকুমেন্টারিটির চিত্র গ্রহণ করা হয়েছে আ.বিমার বিভিন্ন আলোচিত স্থান ঘুরে। গারোহাব মিডিয়া পরিবারের এই ডকুমেন্টারিটি দ্বিতীয়। প্রথম ডকুমেন্টারি নির্মাণ করা হয়েছিল মধুপুর বা আ.বিমায় বসবাস করা বিলুপ্ত প্রায় সাংসারেক ধর্ম নিয়ে ‘দ্যা লাস্ট লিজেন্ড অব সাংসারেক’। যে কেউ চাইলেই গারোহাব (GaroHub) ইউটিউব চ্যানেলে ভিডিওটি দেখতে পারে। দ্বিতীয় এই ডকুমেন্টারিটি প্রযোজনা ও পরিচালনা করেছেন লেখক, গীতিকার এবং সাংস্কৃতিক কর্মী লুই সাংমা। সহকারী পরিচালনা, চিত্র গ্রহণ ও সম্পাদনা করেছেন বাপন নেংমিঞ্জা। এছাড়াও ভিডিও স্ক্রীপ্টে ভোকাল দিয়েছেন প্রিন্সন ডি সাংমা (ফারুক)।
প্রযোজক ও প্রকাশকের অভিমত
আ.বিমা টাইমসকে ডকুমেন্টরি ভিডিওর প্রযোজক ও প্রকাশক লুই সাংমা বলেন, ভিডিওটি যুগের দাবি ও তথ্য সম্বলিত। সুতরাং এই ডকুমেন্টারি বর্তমান ও আগামী নতুন গারো প্রজম্মের জন্য একটি দলিল হয়ে থাকবে বলেই গারোহাব মিডিয়া পরিবারের বিশ্বাস ।