‘বয়কট’ বা বর্জন সকল মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার। যেকোন দেশ, ব্যক্তি এটা করতে পারে। আবার একটি বিষয় ভাবুন তো- সব কাজ যেকোন ব্যক্তি, দেশ দিয়ে হয় কিংবা সে কাজ করা কি তাদের সাজে? সে কাজ করাটা সবার জন্য অত সহজ ব্যাপারও নয়। তৃতীয় বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র যে দেশ বছরে প্রায় ২.৬ বিলিয়ন ডলারের জিনিসপত্র ফ্রান্সে রপ্তানি করে, অপরপক্ষে তারাই আবার যদি ফরাসি পণ্য বর্জন করা তাহলে কে বা কারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে? যদি কোন দেশ তা করেন তাহলে সেটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে কি! আর যদি বয়কট করেও থাকে, এই প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার তাদের জন্য আহামরি কিছু না।
এবার মূল কথায় আসা যাক, অর্থনৈতিক বলেন আর রাজনৈতিক বলেন, ফ্রান্স একঘরে কোনো দেশ নয়, এক ঘরে করাও সহজ নয়। এটা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী দেশ। ইউরোপিয়ানভূক্ত নথিনুযায়ী ইতোমধ্যে ২৭টি দেশ অন্তর্ভূক্ত হয়েছে, আরও ইউনিয়ভূক্ত হওয়ার পর্যায়ে রয়েছেন। ফ্রান্স যদি উন্নয়নশীল কিংবা অনুন্নত দেশের বিরুদ্ধে কোনো অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নেয় তবে সেটা ইইউ পর্যায়েই নেবে। এক্ষেত্রে রপ্তানির সবচেয়ে বড় বাজার হারাতে পারে; তবে উন্নত দেশ নয়, হারাবে অনুন্নত, উন্নয়নশীল দেশ, তা কি আমরা ভেবেছি?
এহেন প্রসঙ্গক্রমে উদাহরণ হিসেবে একটি উন্নয়নশীল দেশের বৈশ্বিক ইস্যূ নিয়ে দুয়েকটি বিষয় আলোকপাত করা যেতে পারে, যেমন বাংলাদেশ-
বাংলাদেশের মতোন উন্নয়নশীল দেশ গেলো ২০১৮ সালে ইইউতে ১৮ বিলিয়নের সমপরিমাণ পণ্য রপ্তানি করেছে। এটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে অর্জন নেহাত কম নয়!
আবার আমার জানা মতে, গোটা ইউরোপে ৯০ হাজারের মতো অবৈধ বাংলাদেশী অভিবাসী আছেন যাদেরকে অনেকদিন ধরে ইইউ দেশে ফেরত পাঠানোর চেষ্টা করছে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকার অনেকদিন ধরে গড়িমসি করছে, বাংলাদেশ সরকার কানে তুলছেন না।
অন্যদিকে বাংলাদেশের রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে এবং তাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে যে কয়টি দেশ একটু আন্তরিক তার মধ্যে ফ্রান্স একেবারে সামনের সারিতে।
বাংলাদেশি হ্যাকাররা ফরাসি সাইটগুলো হ্যাক করতে শুরু করেছে এবং সেটা বিশ্ব মিডিয়াতে, নিউজে দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ যদি তথ্য প্রযুক্তিতে এতই উন্নত হয় তাহলে ভিন গায়ের প্রযুক্তিবিদ ভাড়া করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সার্ভার সিকিউরিটি নিয়ন্ত্রণ কেন করেন!
এমন এক গাদা উদাহরণ টানা যেতে পারে, তবে উদাহরণ দিলেই তো আর হবে না। আপনি বিষয়টি বুঝবেন কিনা, বুঝতে পারছেন কি না সে বিষয়টি প্রধাণ্য দেয়ার চেষ্টা করছি মাত্র।
ফ্রান্স খ্রীষ্টান দেশ হলেও এ দেশে ধর্ম নিপেক্ষতায় বিশ্বাস করে। এদেশে ‘liberté, égalité, fraternité’ বা স্বাধীনতা, সাম্য এবং ভ্রাতৃত্ব-কে ধর্মের চেয়েও বেশি মানা হয় বলা যেতে পারে। এগুলো ফরাসি রাষ্ট্রের মূল এবং প্রধান ভিত্তি। এদেশের সরকার, জনগণ- সবাই আইনের অধীনে। এখানে সকল মত, সকল পথ এবং সকল বর্ণের মানুষকে সমান অধিকার দেওয়া হয়ে থাকে। ‘শার্লি অব্দো’ সে দেশের এমন একটি প্রতিষ্ঠান যে কিনা বিভিন্ন কার্টুনগুলো ছাপে সেগুলো কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম বা গোষ্ঠিকে খেপানোর জন্য নয়, তারা সমসাময়িক সকল বিষয় নিয়েই ব্যাঙ্গাত্বক কার্টুন ছাপে। সবাই যে তাদের কার্টুন উপভোগ করে- ব্যাপারটা এমনও না। তারা যখন সিরিয়া থেকে ইউরোপে আসার পথে নৌকাডুবিতে নিহত শিশু আয়লান কুর্দির কার্টুন ছেপেছিলো অনেক ফরাসিরাও তার প্রতিবাদ করেছেন। তবে তাদের কার্টুনের সাথে একমত না হলেও তাদের সেটা করার অধিকার যে আছে, সে বিষয়ে সবাই একমত। ফ্রান্স ভলতেরের দেশ। ভলতের বলে গেছেন, “তোমার বক্তব্যের সাথে আমি একমত হতে না পারলেও তোমার বলার অধিকার রক্ষায় আমি প্রাণ দিতেও প্রস্তুত থাকবো”!
ফরাসীরা স্বাধীনতা, সাম্য এবং ভ্রাতৃত্বে বিশ্বাসী। আজকে ব্যাঙ্গাত্বক বিষয়টি নিয়ে কিছু কিছু দেশ পণ্য বয়কটের ডাক দেয়, সাড়া দিয়ে যাচ্ছে উন্নত, অনুন্নত, এবং উন্নয়শীল দেশসমূহ। এই ইস্যূতে কে বা কারা বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হবে ভাবতে পারছেন? এমনিতেই অনেক দেশ নানা বৈশ্বিক চাপে রয়েছেন এবং রয়েছেন আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার ওপর। মোদ্দা কথা বৈশ্বিক দৌঁড়ের ওপর রয়েছে অনেক দেশ। তাহলে এবার ভাবুন বিষয়টি কি দাঁড়ালো? আরও ভবিষ্যতে আপনার সামনে কি দাঁড়াতে পারে ?
বোধ করি উপরোক্ত উদাহরণগুলো আপনাদের বুঝতে সহায়ক হবে। মূল কথা হলো- ফ্রান্সের পণ্য শুধু ইউরোপীয় দেশগুলো ভোগ করে তা কিন্ত নয়, পৃথিবীর প্রায় সকল দেশে এবং অনেক আরাব দেশেও এদের পণ্যের বাজার রয়েছে, সে পণ্য ছাড়া তাদের জীবন চলে না প্রসাধনী, ঔষধ কিংবা প্রযুক্তিইবা বলেন। তাই আপনাদেরকে বলছিলাম কোন পণ্য বয়কট, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা কোন ধর্মীয় চেতনা পরিবর্তন বর্ধক হতে পারে না। আমরা যদি ধর্মকে বিশ্বাস করি, শ্রদ্ধা করি, স্বধর্মীয় চেতনার মধ্য দিয়ে ধর্মীয় ভাতৃত্ববোধকে ধারণ করতে পারি, উদারমনোভাবান্ন হতে পারি তাহলে সবকিছুই পরিবর্তন করা সম্ভব।
লুই সাংমা, প্যারিস, ফ্রান্স
ওয়েভ ডেভেলপার, ব্লগার, ফ্রিল্যান্সার এবং সাংস্কৃতিক কর্মী।