নিউজ ডেস্ক: উবারভিলিয়ে (Aubervilliers Cité) শহরের পৌর নির্বাচনের চূড়ান্ত পর্বে Madame Mériem DERKAOUI এবং DR. Zishan BUTT এর বৃহত্তর বাম জোটের প্যানেলে কমিশনার পদে প্রার্থীতা নিশ্চিত করেন একমাত্র বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ফরাসী প্রতিনিধি, ফ্রান্স উদীচীর সভাপতি কিরণ্ময় মন্ডল।
নির্বাচনী যাত্রা সম্পর্কে দ্যা আ.বিমা টাইমস নিউজকে তিনি বলেন, এদেশে আসার পর থেকেই একটি দলের মোর্যাল অবলিগ্যাশান এবং চেতনা দারুণভাবে নিজের ভেতর কাজ করছিল। সেই তাগিদ থেকেই এদেশের বিভিন্ন জাতীয় রাজনৈতিক দল এবং অঙ্গ সংগঠনের সঙ্গে সখ্যতা শুরু হয়। এছাড়াও উদীচী সংগঠনের সাংগঠনিক কাজের পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশীয় মূলধারার রাজনৈতিক মতাদর্শীদের সঙ্গে মতবিনিময়ের অনেকবার সুযোগ হয়। মূলত ২০১৫ সালে আন অফিসিয়্যালী ফ্রান্স কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যাত্রা শুরু করেন; এবং ২০১৯ সালে অফিসিয়্যালী নিবন্ধিত হয় এই বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ফরাসী প্রতিনিধি, ফ্রান্স উদীচীর সভাপতি কিরণ্ময় মন্ডল।
এছাড়াও তিনি বাংলাদেশে স্কুল জীবন থেকেই খেলাঘর, ধলেশ্বরী খেলাঘর জেলা সংগঠকের দায়িত্ব পালন করেন এবং বিভিন্ন সাংগঠনিক পরিবেশে তার বেড়ে ওঠা। কলেজ জীবনে ছাত্র রাজনীতি, ছাত্র ইউনিয়ন এবং উদীচী, পরে ঢাকায় এসে কমিউনিস্ট পার্টি এবং উদীচী সংগঠনে যুক্ত হয়ে দুটোই সমানতালে সাংগঠনিক কাজ চালিয়ে যান এই মেধাবী রাজনীতিবিদ।
নির্বাচনের প্রার্থীতা এবং জোটের ভবিষ্যত কার্যক্রম সম্পর্কে বলেন, প্রথম পর্বে ৫টি দলের নির্বাচনী প্রার্থীতা তালিকায় মোট ১৫০ জনের বাছাই পর্বে ৫৩ জনের নাম চূড়ান্ত করে। চূড়ান্তপর্বে সরকার দলীয় জোট এবং অন্যান্য দলের সঙ্গে এই ৫৩জন প্রতিনিধি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সরাসরি লড়াই করবেন। বাছাইকৃত ৫৩ জনের প্রতিদ্বন্দির মধ্যে তাঁর অবস্থান ৩৪ নম্বরে রয়েছেন।
উদীচী সাংগঠনিক এবং রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেন, প্যারিসের উবারভিলিয়ে শহরে ১১৮ জাতিগোষ্ঠির বসবাস। বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির এই বিশাল সম্পদকে পুঁজি করে এই শহরে যাত্রা শুরু করেছে ” ভাষা ও সাংস্কৃতিক ভবন ” (Maison des Langues et des Cultures)।
মহান একুশ এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনকে কেন্দ্র করে ফ্রান্সের এই শহরে উদীচীর প্রায় এক দশকের পথ চলা। বিভিন্ন ভাষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এই বিপুল সম্ভারকে একত্রে উজ্জীবিত করার একটি ক্ষেত্র তৈরির কাজে উদ্যোগী এবং ধারাবাহিক ভূমিকা উদীচী ফ্রান্স সংসদের অবদান সর্বাগ্রে।
ভাষা ও সাংস্কৃতিক ভবনটি উদ্বোধনের সময় একে ফরাসি ভাষায় সহজে বলা হোলো “des usines à espoir” অর্থাৎ প্রত্যাশার কারখানা, যার শুরুটা করা হয়েছিল সবচেয়ে কঠিন এক সময়ে, সর্বাধিক ঝুঁকি নিয়ে। ফলে এটি ফরাসী সরকারের কাছে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠির জন্য বড় প্রাপ্তি।
এছাড়াও ফ্রান্সে প্রথমবারের মতো সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় চালিত একটি ভবনের কক্ষের প্রতীকী নামকরণ করা হয় ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহীদের নামে; অর্থাৎ যাকে বলা হয় ‘শহীদ রফিক কক্ষ’। উদীচী ফ্রান্স সংসদের পক্ষ থেকে আগামী ফেব্রুয়ারীতে এই নামকরণের আনুষ্ঠানিকতাসহ ‘৫২র বাংলা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ও সকল ভাষা শহীদদের সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাদি এই ভবনে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই ভবনের নির্মাণাধীন মূল কক্ষের নামকরণও হ’তে যাচ্ছে ‘৫২র ভাষা আন্দোলনের স্মরণে যা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
তাঁর জোটের নির্বাচনী অঙ্গীকার সম্পর্কে বলেন, এবার পৌর নির্বাচনে বৃহত্তর বাম জোটের প্যানেল নির্বাচনী ওয়াদাপূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ, যেমন শিক্ষা, সংস্কৃতি, এবং সংহতি। এছাড়াও প্যালেনটি নির্বাচিত হলে সকল নাগরিকের জন্যে একটি কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে; যেমন, ফ্রি ক্যান্টিন (প্রথম চার মাস), এলাকা নির্মাণে ইকোলোজিক্যাল এনভাইরনমেন্ট বিষয়টি গুরুত্ব দেয়া, খেলাধুলা এবং সংস্কৃতিতে সমান অ্যাক্সেস, স্কুল শিক্ষকদের অভিজ্ঞতা উন্নতিকরণ, ছাত্র ছাত্রীদের বিভিন্ন দেশ ভ্রমনে তত্ত্বীয় জ্ঞান বৃদ্ধি ব্যবস্থাসহ এলাকায় খাদ্য সহায়তা ইত্যাদি সুনিশ্চিত করা।
আগামী ২৮ জুন ২০২০ উবারভিলিয়ের পৌর নির্বাচনের চূড়ান্ত পর্বে যে তিনটি প্যানেল সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে যাচ্ছে, সে প্যানেলগুলো হলো-
১) Mme Mériem DERKAOUI এবং Dr. Zishan BUTT, PCF (Parti Communiste Français), La France Insoumis, Europe écologie les verts, PS (Parti socialiste এর এক অংশ), PRG (le centre gauche) এবং ENSEBBLE।
২)Mme.Karine Franclet, UDI (Union des. démocrates), LR (les Républicans), République en Marche, Modem (le mouvement démocrate)
৩) M. Sofienne Karroumi, AC (Alternative Citoyennes), M. Marc Guerrien PS (আংশিক ), M. Jean Jacques Karman (Gauche )।
নির্বাচনী প্রচার অভিজ্ঞতায় তিনি বলেন, সরকার দলীয় ডানপন্থি জোটের সঙ্গে বৃহত্তর বাম জোটের হাড্ডা-হাড্ডি লড়াইয়ে সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।
পৌর নির্বাচনে নির্বাচিত হয়ে কোন দেশের অর্থনীতি এবং উন্নয়নে দলগুলো কাজ করবে; তো চলুন সংক্ষিপ্তাকারে নজর দেয়া যাক-
ফ্রান্সের ভৌগোলিক এবং বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থান- ফ্রান্স যার সরকারী নাম ফরাসি প্রজাতন্ত্র (France বা République Française) ইউরোপের অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তিশালী একটি রাষ্ট্র। এটি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে পশ্চিমা বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জাতিগুলির একটি। ফ্রান্স আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছে; বিশ্বের প্রায় সর্বত্র এর প্রাক্তন উপনিবেশগুলি ছড়িয়ে আছে। আটলান্টিক মহাসাগর, ভূমধ্যসাগর, আল্পস পর্বতমালা ও পিরিনীয় পর্বতমালা-বেষ্টিত ফ্রান্স বহুদিন ধরে উত্তর ও দক্ষিণ ইউরোপের মাঝে ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক ও ভাষিক সংযোগসূত্র হিসেবে ভূমিকা পালন করে আসছে।
আয়তনের দিক থেকে ফ্রান্স ইউরোপের তৃতীয় বৃহত্তম রাষ্ট্র; রাশিয়া ও ইউক্রেনের পরেই এর স্থান। আর জনসংখ্যার দিক থেকে এটি ইউরোপের চতুর্থ বৃহত্তম রাষ্ট্র। মূল ভূখণ্ডের বাইরে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ফ্রান্সের দশটি উপনিবেশ আছে, যেগুলি বেশির ভাগই প্রাক্তন ফরাসি সাম্রাজ্য থেকে পাওয়া।
ফ্রান্স মোটামুটি ষড়ভুজাকৃতির। এর উত্তর-পূর্বে বেলজিয়াম ও লুক্সেমবুর্গ, পূর্বে জার্মানি, সুইজারল্যান্ড ও ইতালি, দক্ষিণ-পশ্চিমে অ্যান্ডোরা ও স্পেন, উত্তর-পূর্বে ইংলিশ চ্যানেল, পশ্চিমে আটলান্টিক মহাসাগর, উত্তরে উত্তর সাগর, এবং দক্ষিণ-পূর্বে ভূমধ্যসাগর।
বিশ্বের সবচেয়ে পুরনো জাতি-রাষ্ট্রের মধ্যে একটি হল ফ্রান্স। মধ্যযুগে ডিউক ও রাজপুত্রদের রাজ্যগুলি একত্র হয়ে একটিমাত্র শাসকের অধীনে এসে ফ্রান্স গঠিত হয়। বর্তমানে ফ্রান্স এর পঞ্চম প্রজাতন্ত্র পর্যায়ে রয়েছে। ১৯৫৮ সালের ২৮শে সেপ্টেম্বর এই প্রজাতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়। রাজনীতিতে কেন্দ্রীয় প্রবণতার উত্থান এবং বেসরকারী খাতের উন্নয়ন এই নতুন ফ্রান্সের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ফ্রান্স ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যতম প্রধান সদস্য। ফ্রান্স জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য-দেশের একটি এবং এর ভেটো প্রদানের ক্ষমতা আছে।
এছাড়াও অর্থনৈতিকভাবে ফ্রান্স একটি সমৃদ্ধশালী দেশ। ফ্রান্সের মোট দেশজ উৎপাদনের মূল্য ২৫০০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি। ফলে ফ্রান্স ইউরোপের তৃতীয় বৃহত্তম ও বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম অর্থনীতি। কৃষিদ্রব্য উৎপাদনে ফ্রান্স ইউরোপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দেশ; এটি মূলত খাদ্যশস্য, ওয়াইন, পনির ও অন্যান্য কৃষিদ্রব্য ইউরোপ ও সারা বিশ্বে রপ্তানি করে। ফ্রান্স ভারী শিল্পের দিক থেকেও বিশ্বের প্রথম সারির দেশ। এখানে মোটরযান, ইলেকট্রিক যন্ত্রপাতি, ও রাসায়নিক দ্রব্য উৎপাদন করা হয়। তবে ইদানীংকার দশকগুলিতে সেবামূলক শিল্প যেমন ব্যাংকিং, পাইকারী ও খুচরা বাণিজ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও পর্যটন ফরাসি অর্থনীতিতে ব্যাপক ও প্রধান ভূমিকা রাখা শুরু করেছে। ফ্রান্স সরকার কর্তৃক নিবন্ধিত কোম্পানির সংখ্যা ২৯ লক্ষ। সেই হিসেবে দেশটিতে প্রতি বারো জনের জন্য একটি করে কোম্পানি রয়েছে ।
জনাব কিরণ্ময় মন্ডল এর জন্ম বাংলাদশের মানিকগঞ্জ জেলায়। ছোট বেলায় থেকেই বিভিন্ন সংগঠন এবং রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। পেশাগত এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা সিভিল ইঞ্জিয়ার (স্মাতক)। তিনি ২০০২ সালে জীবন ও জীবিকার তাগিদে ফ্রান্সে আসেন এবং এদেশের বামপন্থী রাজনীতিতে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন এই হাস্যোজ্জ্বল সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং রাজনীতিবিদ।
তিনি একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সাংস্কৃতিক সংগঠক, রাজনীতিবিদ, লেখক, আবৃত্তিকার, সর্বোপরি জন দরদি একজন সদা হাস্য প্রিয় মুখ কিরণ্ময় মণ্ডল। অনুষ্ঠিতব্য প্যারিস সিটি মেয়র নির্বাচনে একজন কমিশনার পদপ্রার্থী। তিনি সকলের কাছে দোয়া প্রার্থী; এবং একজন বাংলাদেশি বাঙ্গালী বংশোদ্ভূত ফরাসি হিসাবে নির্বাচিত হলে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে অঙ্গীকারবদ্ধ।
সকল মানুষের স্বার্থে স্থানীয় প্রশাসনকে আরো কার্যকরী করে তোলার জন্য এই যৌথ প্যানেলে আপনাদের মূল্যবান ভোট দিয়ে Dr.Zishan BUTT-এর নেতৃত্বাধীন সোসালিস্ট পার্টির প্যানেলকে একত্রিত হয়ে বৃহত্তর বাম প্রগতিশীল জোটের জয় যুক্ত করার বিশেষ অনুরোধ তিনি জানান।
এহেন উল্লেখ্য, ফ্রান্সের পৌর নির্বাচনের প্রথম রাউন্ড গেল ১৫ মার্চে অনুষ্ঠিত হয়; এরপর সাতদিনের মধ্যে দ্বিতীয় রাউন্ড নির্বাচনের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থাকলেও কোভিড ১৯ প্রাদুর্ভাবের দরুন নির্বাচনটি স্থাগিত করা হয়েছিল।
ফ্রান্সে করোনা দুর্যোগের প্রেক্ষিতে পেছানো তারিখনুযায়ী আসছে ২৮ জুন ২০২০ পৌর নিবার্চনটি অনুষ্ঠিত হবার কথা রয়েছে।