ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে পাতাল ট্রেন, বিভিন্ন নান্দনিক শিল্প কর্ম, শৈল্পিক স্থাপনা ইত্যাদি পর্যটকের জানার কৌতুলকে একধাপ বাড়িয়ে দেয়। কোন কোন পাতাল ট্রেনের বয়স একশত বছরের বেশি পুরোনো হবে। আকাশের রানী কনকর্ড সুপারসনিক বিমান, অত্যাধুনিক হাইস্পিড ট্রেনের কথা বাদ-ই দিলাম। এসব পাতাল ট্রেনে উঠা নামা, নির্দেশনা মেনে ট্রেন পরিবর্তন করা নতুন পর্যটকের জন্যে খানিকটা ঝামেলারও বটে। ইন্টারকানেক্টিং পাতাল ট্রেনের ষ্টেশানগুলো একেকটি মাল্টিষ্টোরেজ বিল্ডিং। অর্থাৎ ফ্রান্স ইউরোপীয় ইউনিয়নভূক্ত দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তিশালী একটি দেশ।

উন্নত বিশ্বে উন্নত জীবন হওয়া এটাইতো স্বাভাবিক। এমন সব ভাবনার মধ্যেই ইন্টারসিটি ট্রেনে, রাস্তায় ফকির মিসকিন দেখলে উন্নয়নশীল, অনুন্নত দেশের মানুষের বিদেশ সম্পর্কে বদ্ধমূল ধারণাটাই পাল্টে দেয়। মনে খটকা লাগে। হ্যাঁ যা সত্যি তাই বলছি। মিছামিছি মিথ্যে বলে কি লাভ ! নান্দনিক প্যারিস শহরের অলিগলিতে কত বিচিত্র পেশার মানুষের দেখা মেলে যা আমাদের কল্পনাতীত। হাতের ক্যামেয়ার তেমনি এক অদ্ভত এবং অভিনব কায়দায় ভিক্ষাবৃত্তির খোঁজ মেলে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস শহরে।

বরশিতে ভিক্ষা পিকস ১ছবি : আ.বিমা টামস আর্কাইভ

দৃশ্যটি দেখে মনে হতে পারে কোন ভদ্র লোক চেয়ারে বসে আয়েশিভাবে বরশি ছিপ হাতে ডাঙ্গায় বসে গভীর জলাশয়ে দিব্যি মাছ শিকার করছে। লোকটির মনোযোগ, বেশবুশা দেখেও আসলে তাই মনে হয়। মাথায় ব্রান্ডের টুপি। পরনে কাপড় তার কালো রঙের জিন্স জ্যাকেট। সাথে স্কাই ব্লু কালারের জিন্স প্যান্ট। পায়ে নাইক ব্রান্ডের সাদা কেটস, সঙ্গে স্মার্ট ফোন, বয়স কম….ইত্যাদি। লোকটার ব্যবহারও অমায়িক। এতকিছু বর্ণনার পর সে অবসাদগ্রস্ত লোক কথাটি শুনতে বিশ্বাস করতে কষ্ট হবে তাই না? শুধু তাই নয়, লোকটি চেয়ারে বসে আয়েশিভাবে বরশি ছিপ হাতে ডাঙ্গায় বসে জলাশয়ে দিব্যি মাছ শিকার করছে আসলে তা জলাশয়ে নয়। রীতিমতোন উন্নত এবং খাঁটি বরশি ছিপ ফেলে বরশির স্থলে ছোট্ট প্লাস্টিকের গ্লাস বেঁধে জনবহুল এলাকার পথে বসে ভিক্ষে করছিল।

উন্নত দেশে, উন্নত জীবন গড়তে গিয়ে কেনইবা তাদের এমন দুর্গতি এর হেতু খুব বেশি জানা না গেলেও ব্যক্তিগত কিংবা পারিবারিক কলহের কারণে কিছু মানুষ বিকারগ্রস্থ, অবসাদগ্রস্থ হতে দেখা যায় যা অনেকের ধারণা। এদের মোট পরিসংখ্যান জানা না গেলেও, প্যারিস শহরে এদের বেশ দেখা মেলে। এদেরকে বাঙালিরা ফেনা বলে। ওরা নেশাগ্রস্থ হয়ে উঠে। স্বাভাবিক জীবনে ফিরে না। পরিবার পরিজন ছেড়ে একা থাকে। ফলে বাঁচার তাগিদে কেউবা পথের ভিখারি। নানা কায়দা, কৌশলে ভিক্ষে করে ভিক্ষের টাকায় খাবার না কিনে মদ কিনে খায়। দিনরাত অ্যালকোহলিক, মদ নেশায় বুদ হয়ে থাকে। এইসব ব্যক্তিরা আনন্দ উপভোগের জন্য কম বরং প্রয়োজনীয়তা থেকে বা নির্ভরশীলতার কারণে বেশী মদ্যপান করেন। ফ্রান্সে এদেরকে এসডিএফ (sans domicile fixe) বা যাদের কোন আবাসন সংস্থান নেই।

আরও অবিশ্বাস্য লাগে- সরকারি, বেসরকারি সেচ্ছাসেবী সংগঠনের কেয়ারে এরা থাকতে পছন্দ করে না। কোনভাবে তাদের ঘরে আটকে রাখতেও পারে না। এদের মধ্যেই কিছু এসডিএফরা মূলত রেলওয়ে ষ্টেশানে, রাস্তার ভিখারি হয়ে বাস্তুহারা জীবন যাপন করে। উন্নত বিশ্বেও এমন কিছু উদভট কর্মকান্ড চোখে পড়ে। যাদের কর্মকাণ্ড সত্যিই অদ্ভত, মাঝেমধ্যে অবাক করে।

লুই সাংমা, ফ্রান্স
ওয়েভ ডেভেলপার, ব্লগার, আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সার এবং
সাংস্কৃতিক কর্মী, lchiran76@gmail.com