ফাদার বা বিশপ ইচ্ছে করলেই নিজের মনগড়া অনুষ্ঠান করতে পারে না। উপর ওয়ালার পারমিশন লাগে, তাইতো একি তারিখে একদিনে সব মিশনে ওয়ানগালা অনুষ্ঠান করে। উপর ওয়ালারাও বসে থাকে না কোন জাতির আদি সংস্কৃতির ভালো খারাপ হিসেব করে দেখে ভালোর দিক বিবেচনায় সংযোজন করে। গারোদের আদি পর্ব ওয়াগালায় ভালোর দিক খুঁজে পাওয়া যায়, নিজেদের কষ্টের ফলানো ফসল, প্রথম সৃষ্টি কর্তাকে উৎসর্গ দিয়ে তারপর নিজেরা খায়। এরকম ভালো নিয়ম অন্য জাতির সংস্কৃতিতে বেশী দেখা যায় না, তাই ক্যাথলিকেরা ওয়ানগালা নামের আগে আরো কিছু শব্দ সংযোজন করে যীশু খ্রীষ্টের নামে, খ্রীষ্ট রাজার পর্ব ওয়ানগালা নাম দিয়ে পালন করে।
গতকাল ফেসবুকে ঢাকা নকমান্দি থেকে প্রতাপ রেমা মেসেঞ্জারে ওয়ানগালার তারিখ আমন্ত্রণ পত্র ও প্রোগ্রাম পাঠিয়েছিল। ফেসবুকে লেখার কেন জানি ইচ্ছে হয় না, আগে ঢাকায় ব্রাদারেরা ওয়ানগালা করে শুরু করে প্রার্থনা, গান, বাইবেল পাঠ শেষে সংস্কৃতি আনুষ্ঠান। তারপর মেঘালয়ে যেতাম শত ঢামার ওয়ানগালা দেখতাম, মনমতো হতো না, তাই বিশিষ্ট লোকদের কাছে প্রশ্ন করতাম গারোদের ওয়ানগালা কি এরকমি? তারা সত্যি কথা বলল, এই আসিনাং জায়গার ওয়ানগালা সত্যিকার ওয়ানগালা নয়, এটা পলিটিক্স ওয়ানগালা। সরকার টাকা দেয়, বড় বড় নেতারা আসে, ওয়ানগালার সময় যে নাচ গান বা গ্রিগা মেসা হয় সেটাই দেখায়।
পরের বছর অক্টোবরের ১৫ তারিখে আবার গেলাম আসল সাংসারে ওয়ন্না ওয়ানগালা দেখতে, গিয়ে দেখি ছোটখাটো অনুষ্ঠান, প্রস্তুতির পর্বগুলো শেষ হয়ে গেছে। বলে সব পর্ব দেখতে হলে আরো আগে আসতে হবে ভাবলাম চোখে দেখা না হলেও প্রশ্ন করেতো জানা যাবে। দেখছি আর সময় সুযোগ মতোন প্রশ্ন করছি জানলাম ওয়াগালা নামের অর্থ, কয়টি ভাগ আছে এবং কি কি।
‘ওয়ানগালা’ এখানে দুটো শব্দ আছে ওয়ান+গালা = ওয়ানগালা ‘ওয়ান’ মানে হলো ‘ওয়ানতি পুড়া’ আবেং গোত্রের গারোরা চাউল গুড়োকে ‘মানতি পুড়া’ বলে। আর আ.চিক গোত্রের গারোরা ‘ওয়ানতি পুড়া’ বলে। শব্দটি আ.চিক গোত্রের ভাষা থেকে এসেছে। ‘গালা’ অর্থ অনুষ্ঠান শেষ করে ফেলে রেখে দেওয়া অর্থাৎ গালা মানে ফেলে দেওয়া এইভাবেই বললেন। গারোরা সবসময় ওয়ানগালার সময় চাউল গুড়ো করে পানিতে মিশিয়ে সাদা রং বানিয়ে কপালে, গালে, পিঠে, ছেলেরা বুকে, মাখায় এটাকে সাংসারেক গারোরা ‘ওয়ানতি পুড়া থকগা’ বলে। এই ওয়ানতি পুড়া থেকে ‘ওয়ান্না’ শব্দটি এসেছে, আমি এইভাবে পেয়েছি, আরো অন্য রকম ব্যাখ্যাও থাকতে পারে। ওয়ানগালার তিনটি পর্ব থাকে, যেমন- ১। রোগালা, ২। চাচাৎ স-ওয়া, এটাকে চাচাৎ লিখলাম কারন রোমান অক্ষরে chachat লেখা, এবং ৩। ক্রাম গগাদা বা জল ওয়াৎদা।
‘রোগালা’ এই পর্ব বিকালে শুরু হয়, পুরোহিতের কাজ শেষ হলে, যুবক যুবতীরা উঠানে একত্র হয় যে যেভাবে পারে সেজেগুজে আসে। ছেলেরা দামা বা ঢোল, আদুরো, বাংশি, রাং, ক্রাম নিয়ে মেয়েদেরকে মাঝখানে রেখে চারিদিকে গোল হয়ে দাঁড়ায় বাজনার তালে তালে গান করে ছন্দ মিলিয়ে নাচে। প্রত্যেক বাড়ি বাড়ি ঘুরে বাদ্য বাজিনা বাজায় নাচে, গান করে, অনেকে বলে সাংসারেক গারোদের এই পর্বটি বড় দিনের সময় গারোরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে বাদ্য বাজিনা বাজিয়ে যীশুর গান বা কীর্তন গায়, গারো এলাকা ছাড়া অন্য এলাকায় এটা দেখা যায় না।
‘চাচাৎ স-ওয়া’ বাংলায় ধুপের ধুয়া দেওয়া, এখানে পুরোহিতের দরকার নেই, নকমা একা তার ঘরে বড় বড় পাত্রে আগুন জ্বালিয়ে প্রচুর ধুপের গুড়া পুড়বে। আর প্রচুর ধোঁয়া ঘরের দরজা জানালা উপরের চালের ফাঁক দিয়ে বাহির হবে, আর ওয়ানগালায় উপস্থিত লোকেরা সবাই উঠানে দাঁড়িয়ে দেখবে। এই ধুপের ধোঁয়াকে তারা মেঘের প্রতীক হিসেবে দেখে, ধোঁয়া যত বেশী কালো হয়ে উড়বে সেই রকম মেঘ সমুদ্র থেকে কালো হয়ে উড়ে আসবে। আর সাংসারেকদের গ্রামে পাহাড় পর্বতে প্রচুর বৃষ্টি হবে, তাদের কষ্টের ফলানো ফসল ভালো হবে, অভাব দুর হবে। এই কারনে খুব সাবধানে ধুপের ধোঁয়া পুড়তে হয়, যদি কোন কারনে কম ধোঁয়া বাহির হয় তাহলে মহা বিপদ, সেই বছর বৃষ্টি কম হবে ফসল ফলবে না ইত্যাদি। এই পর্ব শেষ হলে প্রথমে উঠানে বাজিনার তালে তালে নাচবে, তারপর নকমার ঘরের ভিতরে ভাত ছিটিয়ে দিবে। এমনভাবে ভাত ছিটিয়ে দেবে যেন মাটি দেখা না যায়, তারা মনে করে প্রথম বৃষ্টির সময় যেন শিলা বৃষ্টি হয়, এমনভাবে শিলা পড়বে যেন মাটি দেখা না যায়, এই ভাত ছিটানোকে তারা সাদা শিলার প্রতীক হিসেবে ব্যবহা করে। পরে সবাই ঘরের ভিতর ঢুকে বাদ্য বাজনার তালে তালে নেচে পা দিয়ে মাটিতে ছিটানো ভাত মারিয়ে মাটিতেই মিশিয়ে দেবে।
‘ক্রাম গগাৎদা’ ওয়ানগালা কোনদিন একদিনে শেষ হয় না, গ্রামে একজন নকমা বা গ্রাম প্রধান থাকবে হয়তো আরো পাঁচটা ধনী পরিবার থাকবে। তারাও বলবে আমাদের বাড়ীতেও হতে হবে তাহলে আরো পাঁচ দিন, এরকম পর্বগুলোকে ওয়ানগালা বলে না, বলে ‘ওয়ান্না চাআ’। তারপর প্রতিটি বাড়ীতে ঘুরাতো আছেই তবে কোন বাড়িতে ওয়াক মাংস দিয়ে খাওয়া দিতে দেখিনি, এমন কি নকমার বাড়িতেও না। লোকেরা সকালে বাড়িতে খেয়ে আসে অনুষ্ঠান করে, দুপুরে বাড়িতে গিয়ে খায় বিকেলে এসে আবার অনুষ্ঠান করে। তবে পান-সুপারি, চা, চু দিতে দেখেছি, কঠিন নিয়মের মধ্যে পালন করতে হয়, কোন রকম সমস্যা সৃষ্টি করা যাবে না। সব সময় সন্মানিত লোকেরা দাঁড়িয়ে বসে লক্ষ্য করবে। দোষ করলে রক্ষা নেই, ওয়ানগালা অনুষ্ঠানে আর থাকতে পারবে না, অনুষ্ঠান শেষ হলে লোকজন ডেকে বিচার করে শাস্তি দিবে। শেষের সারাদিন নকমার বাড়িতে অনুষ্ঠান হয়, শুরু হয় নকমার বাড়ি থেকে আবার শেষের অনুষ্ঠানো নকমার বাড়িতে হবে। এই শেষ দিনের নকমার বাড়িতে অনুষ্ঠানকে ওয়ানগালা বলে, এই দিন সন্ধ্যায় সমস্ত বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার্য জিনিসপত্র নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলে দেবে।
বর্তমান সময়ে গারোরা অনেক ওয়ানগালা করে। ভালো নিজের আদি সংস্কৃতি স্মরণ করা, পরবর্তী ছেলে মেয়েদেরকে নিজের সংস্কৃতির সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। তা-না হলে জাতির সব কিছুই শেষ হয়ে যাবে। একটি জাতির রাজনীতি থাকবে, অর্থনীতি থাকবে, ধর্মনীতি থাকবে, সমাজনীতি সংস্কৃতি থাকবে তবেই তো পূর্ণ জাতি হবে। সমাজ কর্মী সমাজের কাজ করবে, রাজনীতির মানুষ রাজনীতি করবে, পুরোহিতেরা ধর্মীয় কাজ করবে কিন্তু সমন্বয় থাকতে হবে এইতো।
ক্যাথলিকেরা প্রতিটি মিশনে ওয়ানগালা অনুষ্ঠান করে, ফাদার বা বিশপ ইচ্ছে করলেই নিজের মনগড়া অনুষ্ঠান করতে পারে না। উপর ওয়ালার পারমিশন লাগে, তাইতো একি তারিখে একদিনে সব মিশনে ওয়ানগালা অনুষ্ঠান করে। উপর ওয়ালারাও বসে থাকে না কোন জাতির আদি সংস্কৃতির ভালো খারাপ হিসেব করে দেখে ভালোর দিক বিবেচনায় সংযোজন করে। গারোদের আদি পর্ব ওয়াগালায় ভালোর দিক খুঁজে পাওয়া যায়, নিজেদের কষ্টের ফলানো ফসল, প্রথম সৃষ্টি কর্তাকে উৎসর্গ দিয়ে তারপর নিজেরা খায়। এরকম ভালো নিয়ম অন্য জাতির সংস্কৃতিতে বেশী দেখা যায় না, তাই ক্যাথলিকেরা ওয়ানগালা নামের আগে আরো কিছু শব্দ সংযোজন করে যীশু খ্রীষ্টের নামে, খ্রীষ্ট রাজার পর্ব ওয়ানগালা নাম দিয়ে পালন করে।