বাংলাদেশ সরকার সাম্প্রতিককালে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে যে, কোনভাবেই এই দেশে আদিবাসী শব্দ ব্যবহার করা যাবে না। রাষ্ট্র ডিরেক্টলি বলেছে আসছে আদিবাসী দিবসে কোনভাবেই এই শব্দকে ব্যবহার করে আইন লংঘন করা যাবে না। এখন আপনি যখন নিজেকে বহু বছর ধরে আদিবাসী ভেবে আছেন বা আদিবাসী হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিচ্ছেন সেখানে আপনার কি করার থাকতে পারে? কি করার থাকতে পারে তার আগে কি করার নেই সেটি ভাবতে হবে। বাংলাদেশ ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনা করতে গেলে এই দেশকে কেউ আবিষ্কার করেনি। আমি বলতে চাচ্ছি আমেরিকাকে কলম্বাস যেভাবে আবিষ্কার করেছিলেন সেইভাবে এই দেশকে আবিষ্কার করার দরকার পরেনি। তারমানে বলাই যাচ্ছে এই দেশে বহু বহু বছর ধরেই মানুষের বসবাস ছিল এবং তাবৎ পৃথিবীর সবাই সেটা জানতো। তাহলে এই বহু বহু বছর ধরে এই দেশে কারা বসবাস করে আসছিল সেটিই আমাদের প্রধান প্রশ্ন। আর যে দেশের ভূখণ্ড এতটাই পুরনো সে দেশে আদিবাসী নাই কথাটিও অনেকটা জোকসের মতোন। এখন আপনি বলতে পারেন অনেক দিন ধরে বসবাস করলেই কি আদিবাসী হয়ে যায়? না হয় না। কিন্তু আদিবাসী হওয়ার যে শর্তগুলো জাতিসংঘ দিয়েছে তার সাথে কিন্তু এই দেশে বসবাসরত অনেক জনগোষ্ঠীরই মিল আছে। আচ্ছা এই বিষয় অনেক পুরনো তাই এই বিষয় নিয়ে কথা বলতে চাই না। কথা বলতে চাই একটি বিষয় নিয়ে সেটি হলো, এই দেশে যারা নিজেদের আদিবাসী বলছে তারা যদি আদিবাসী নাই হয়, তাহলে প্রকৃত আদিবাসী কারা সেটি চিহ্নিত করে দেওয়া উচিৎ রাষ্ট্রের। এই কাজ যদি সরকার করে দিতে পারে তবে বিচার বিশ্লেষণ, গবেষণা করে তারপর না হয় নিশ্চিত হওয়া যাবে আসলেই এই দেশে তারাই স্বীকৃত আদিবাসী হওয়ার যোগ্যতা রাখে।

আদিবাসী শিশু

আদিবাসী শিশু, ছবি: বাপন

সরকার বাহাদুর আর রাষ্ট্র এতদিন ধরে একটি কথাই বলে এসেছে তারা ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষ। ক্ষুদ্র শব্দটি কি অর্থে ব্যবহার হয়েছে সেটি বুঝা বড় দুষ্কর। এই পৃথিবীর বেশী শতাংশ আদিবাসীদের সংখ্যাই নগন্য। তারা সব দেশের বসবাসকারী লিডিং জনগোষ্ঠীর চায়তে সবখানেই অল্প মাত্র। সংখ্যা গননা করে যদি বাংলাদেশের মত ইতর যুক্তিকে কাজে লাগিয়ে অন্যান্য দেশের আদিবাসীদের নামকরণ করা হয় তবে পৃথিবীর সব দেশের আদিবাসীই শুন্য হয়ে যাবে। কিন্তু বড় প্রশ্ন হল আদিবাসীরা সব দেশেই সংখ্যায় কেন নগন্য? আদিবাসীরা সংখ্যায় নগন্য নয়। আদিবাসীরা মূলত একটি গাছের শিকড়ের মতোন। মাটির নিচে এদের বিস্তার কম এবং অল্পই দেখা যায় কিন্তু গাছের শাখা প্রশাখা মিলিয়ে আদিবাসীদের প্রভাব অনেক বড়। যেকোন দেশ বা ভূখন্ডে আদিবাসীরাই যেকোন জাতির প্রসারে পরোক্ষও প্রত্যক্ষভাবে অবদান রাখে। দেশের অতীত, বর্তমান, জলবায়ু, আবহাওয়ার তথ্য তাদের কাছেই গচ্ছিত থাকে। প্রযুক্তির অভাবে নুয়ে থাকা এই আদিবাসীদের সরল সহজ জীবন যাপনকে পুঁজি করে রিফিউজিরা সেখানে এসে রুটির লোভে, বন্দুকের নলের ডগায় কিংবা, খাবারের লোভে লুফে নেয় সব জ্ঞান। ভূখণ্ডের আদিম কৃষি ব্যাবস্থা, সার্ভাইব করার কায়দা কানুন তারা শিখে নেয় কৌশলে। তারপরই শুরু হয় রিফিউজিদের সেই এলাকায় উত্থান। এই উত্থানে যে ডালপালা গজায় সেটিই আমরা গাছের মত দেখতে পাই আর নীচে পরে থাকে শেকড়। সেই শেকড়কেই বাংলাদেশ এখন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বলছে।

এখন আসি প্রকৃতি আর আদিবাসীদের কথায়। দেশে ইদানিং রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা কমে গেছে। হিসাব মতে চিড়িয়াখানায় যতগুলো জলহস্তি আছে তার অর্ধেকও বাংলাদেশে আর রয়েল বেঙ্গল নেই। এখন রয়েল বেঙ্গল বাংলাদেশের অস্তিত্বে যেহেতু সংখ্যায় নগন্য আর সংখ্যায় বেশী হয়ে গেছে জলহস্তি তাহলে কি আপনি জলহস্তিকে বাংলাদেশের জাতীয় পশু বলবেন? ধরুন দেশে এখন যেহারে বিদেশি গাছ ইউকেলিপ্টাসের চাষ বেড়েছে তার চায়তে আম গাছের সংখ্যা খুবই নগন্য তাহলে কি আপনি ইউকেলিপ্টাসকে দেশের জাতিয় গাছ বলবেন? এই প্রসঙ্গ এনেছি একারনেই দেশের কিছু প্রভাবশালী মহল সংখ্যার হিসেব দিয়ে জাতির যেমন নামকরণ করছে তেমনি বিশ্বের দরবারে সেভাবেই তুলে ধরছে। অথচ দেশের জাতীয় পশুর অস্তিত্ব এতটাই হুমকির মুখে কিন্তু বিশ্বের সামনে এই রয়েল বেঙ্গলের নাম ভেঙে চালিয়ে দিচ্ছে। এই যে আমাদের জাতীয় পশুর সংখ্যার দিন দিন কমে যাওয়ার যে অবস্থা তেমনিই এই অবস্থার শিকার হচ্ছে দেশের আদিবাসীরাও। আদম শুমারিতো বিভিন্ন অজুহাতে তাদের সংখ্যাও কম দেখাচ্ছে আবার প্রকৃতপক্ষে বিতাড়িত হচ্ছে দেশ থেকেও। প্রকৃতির এই খেয়াল কিন্তু পুরনো নয়। আদিম সবকিছুই কমে যায় যখন সেখানে কৃত্রিম কিংবা পরদেশি-ভিনদেশি-ভিনজাতির রাজত্ব বৃদ্ধি পায়। বিশ্বাস না হলে যারা নিজেদের আদিবাসী ভাবা মানুষদের এলাকা ঘুরে আসুন দেখবেন সেখানে প্রকৃতি এখনও উত্তাল হয়ে নিজের পরশ ছড়াচ্ছে। বন এখনও বনই থেকে গেছে। পাহাড় এখনও উঁচু হয়েই দাঁড়িয়ে আছে। আপনারা যারা শহর থেকে পাহাড়ে ঘুরতে গিয়ে পাহাড়ের বিশালতা দেখে মুগ্ধ হন সেলফি তুলেন সেই বনের এই অবস্থা টিকে থাকার কারণ একটাই সেখানে এখনও আদিবাসীরা টিকে আছে। তারপরও আপনারা বাসায় এসে নিজেদেরকে আদিবাসী দাবি করেন। আদিবাসী শব্দ আওড়াতে নিয়ম বেধে দেন। এই লজ্জা কি আমাদের?

বায়ান্নতে বাংলাকে হারিয়ে যদি উর্দুকে রাষ্ট্র ভাষা মেনে নিতে হতো, একাত্তরে পাঞ্জাবি সেনাদের জুতার তলেই যদি পুর্ব পাকিস্তান থেকে যেতো তাহলে আপনারা বুঝতেন একজন আদিবাসীকে ক্ষুদ্র, উপজাতি, এইসব বলার কষ্ট কাকে বলে।