উপরের সিঁড়িতে উঠা কত কঠিন কাজ, যে উঠে সে ভালো বুঝে। উপরে উঠতে দেহে দম লাগে। তারপর আবার অর্থনৈতিক দৈন্যদশা পেরিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা সেতো আরও ভয়াবহ চেলেঞ্জ। ধরিত্রীতে এমন বাস্তব, ভালো গল্প গোচরে অগোচরে রয়ে যায়, বলা হয়ে উঠে না। রঞ্জিতদের মতোন ভালো গল্প খুব বেশি নেই। যাও কদাচিৎ যে দুয়েকটি গল্প গোচর হয়, এ থেকে আমরা কতজনইবা শিক্ষা নিই। কতজনইবা সংকল্প করি আমিও রঞ্জিত রামাচন্দ্র হবো!
এ যুগের অনেক শিক্ষার্থী রঞ্জিতের গল্পকে শুধুই গল্প মনে করতে পারে। কারণ তারা মুখ ফোটে না চাইতে হাতে অনেক কিছু পেয়ে যায়। প্রয়োজনের অতিরিক্ত পেতে পেতে একদিন সে আর ‘রঞ্জিত’ হতে পারে না। রঞ্জিতের মতোন হতে পারে না বলে রঞ্জিতের বাস্তব গল্পকে শুধু গল্পই মনে করবে এটাই স্বাভাবিক।
এই রঞ্জিত রামাচন্দ্র ভারতের কেরালার কাসাড়গড়ের যুবক। সে যুবক এখন ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট (আইআইএম) রাঁচির সহকারী অধ্যাপক। যেটিকে ভারতের অন্যতম সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একটি বলে বিবেচনা করা হয়। এই দুটো বাক্যে এখনো আপনার মাথা টাসকি খাওয়ার মতোন বিষয় নাও মনে হতে পারে। ভনিতা না করে সকলে একটু বুঝার চেষ্টা করি। কারণ রঞ্জিতের সফলতা শুধু ভারতের নয়, তোলপাড় করা বিষয় হতে পারে গোটা বিশ্বে যারা জীবনকে ব্যর্থ, বৃথা প্রচেষ্টা মনে করে। যারা অর্থ, প্রতিপত্তি এবং অঢেল সুযোগকে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছেন। আর জীবনকে অযথা অর্থহীন ভাবছেন।
ছবি সংগৃহীত: রঞ্জিত রামাচন্দ্র এর পৈত্রিক বাড়ি
ব্যক্তি জীবনে নিজের সফলতার গল্প এবং এই কঠিন লড়াইয়ের গল্প ফেসবুকে লেখেন রঞ্জিত। সঙ্গে দেন তার পৈতৃক ভিটে ছোট্ট ত্রিপল ঢাকা কুঁড়েঘর এর ছবি। গত ৯ এপ্রিল ফেসবুক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘আমি আমার এই গল্প বলতে চাই। এই গল্প যদি কাউকে স্বপ্ন দেখতে অনুপ্রাণিত করে তবে সেটাই আমার সাফল্য।’তাঁর এই অনুপ্রেরণার কাহিনী ভাইরাল হয় সোশ্যাল মিডিয়ায়। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়ার পর রঞ্জিতের গল্পের শুরুটা নিয়ে নিশ্চয়ই আপনার মাথাটা মাল না খেয়েও হালকা ঝিম ঝিম করছে। এবার মনে হচ্ছে আপনি রঞ্জিতের গল্প শেষ না করে ক্ষান্ত হবেন না।
যেকোন ভালো বিষয় পড়তে বা জানতে বিশেষ কোন দিন, সময় বা অবস্থান কোন বিষয় নয়। আপনার জানার আগ্রহটাই মূল বিষয়। এবার যদি আরেটু বলি, তিনি সারাদিন কলেজ, ক্লাস, পড়াশোনা করে রাতে নাইট গার্ডের কাজ করতেন রঞ্জিত রামাচন্দ্র। এভাবেই জীবনের বেশ কয়েকটা বছর কেটেছে তার……..। এবার পুরো গল্পের পাতা শেষ না করতেই নিজেকে ওজনহীন মনে হতে পারে। মনে হতে পারে, নিজের বসার বস্তুটি যথা স্থানে নেই। নিজেকে মনে হতে পারে বাতাসে, মহাশূণ্যের সাদা মেঘের ভেলায় ভাসছেন এমন। কখন যে সাদা পরীরা কাছে এসে আপনার নাকে সুড়সুড়ি দিয়ে যাবে আপনি টেরও পাবেন না। আপনার মনোযোগটা যদি গল্পে প্রগাঢ় থাকে।
যা হোক আপনি এভাবে গল্পটি ভেবে ভেবে মেঘের দেশে ভাসতে থাকুন। ভারতের ২৮ বছরের যুবক রঞ্জিত যে ঘরে ঘুমাতেন; সেটি একেবারে জীর্নশীর্ণ। বৃষ্টি হলে টিনের ফুটো দিয়ে পানি ঢুকত ঘরে। সেই ঘরে একটু ঘুমাতে ত্রিপল দিয়ে বৃষ্টি ঠেকানোর ব্যবস্থা করেন। দ্বাদশ শ্রেণি পাশ করার পরই অর্থাভাবে পড়াশোনা ছেড়ে দেবেন, এমনটাই ভেবেছিলেন রঞ্জিত। কারণ পরিবারকে টানতে একটা চাকরি সত্যিই প্রয়োজন ছিল তার। কিন্তু চাকরি করতে গেলে তো পড়ার সময় পাবেন না। এবার আপনি নিশ্চয়ই গল্পের দুর্দান্ত একটি সিনে আছেন। এখন আপনাকে ঝাঁটাপেটা করলেও আপনি গল্পটি শেষ না করে জায়গা থেকে উঠবেন না আমি নিশ্চিত।
লোকালয় প্রবাদে বলে, ‘অভাগা যেদিকে যায় সাগর শুকিয়ে যায়’। না রঞ্জিতের বিষয়টি এর উল্টোটা ঘটে। অর্থাভাবেও তিনি ভেঙ্গে পড়েন নি। এমন অবস্থায় ঐ সময়ে দুটিই একসঙ্গে করার সুযোগ আসে রঞ্জিতের। পানাথুরে বিএসএনএল এর টেলিফোন এক্সচেঞ্জে নাইট গার্ডের চাকরির সুযোগ পান তিনি। এরপরই শুরু হয় আজকের গল্পের আসল লড়াই। নাইটগার্ডের কাজের মাঝেই সারারাত পড়াশোনা করতেন। আর দিনে পিউস এক্স কলেজে অর্থনীতিতে স্নাতকের ক্লাস করতে থাকেন। এভাবেই কেটে যায় তিন বছর। এরপর ধাপে ধাপে কেরালা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি ও তারপর আইআইটি মাদ্রাজে পড়াশোনা চালিয়ে যান। ভাল ফলাফলের জন্য ভর্তি হওয়া নিয়ে কোনো সমস্যা হয় নি তার। আর পড়াশোনার খরচ নিজেই চালাতেন কষ্ট করে। এরপর এবং এরপর…….শুধু চলতে থাকে সফলতার বাস্তব গল্প।
রঞ্জিত রামাচন্দ্র, ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট (আইআইএম) রাঁচির সহকারী অধ্যাপক, ভারত
এভাবেই ধীরে ধীরে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। ততদিনে তিনি বৃত্তিও পেতে শুরু করেন। ফলে আর ফিরে তাকাতে হয় নি তাকে। গবেষণা শেষে অধ্যাপনা শুরু করেন বেঙ্গালুরুর ক্রাইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে। এরপরেই আসে আইআইএম রাঁচিতে অর্থনীতিতে অধ্যাপনার সুযোগ। রঞ্জিত লিখেন, ‘ওই ছোট্ট কুঁড়েঘর থেকে আইআইএম রাঁচির পথটি ছিল দুর্গম। কিন্তু স্বপ্নে ঘেরা। আমায় মা-বাবা কখনও বলেন নি কী করতে হবে। আমার যেটা মনে হয়েছে করে গিয়েছি। আমার এই কাহিনী শুনে যদি কারো মনোবল বাড়ে, তবে নিজেকে সার্থক মনে করব’।
এরপর যদি আমাদের পৃষ্টার পর পৃষ্টা জাম্বু সাইজের এমন গল্প বই পড়তে বলা হয়, তাহলে বিরতিহীনভাবে, মুখে দানাপানি না দিয়ে পড়তে রাজি হবেন বোধ করি। একটি ভালো কিংবা মন্দ গল্প পড়তেও ধৈর্য্য লাগে। সবাই তা পারে না। পৃথিবীতে কিছু কিছু সত্য এবং বাস্তব ভালো গল্প থাকে যা তৈরি করতে নিজের মধ্যে সত্যিকারের দম লাগে যা সবাই পারে না। আপনি আমি না পারলেও, ঐ রঞ্জিতরা পারে। তাই আমাদের প্রত্যেকে ভালো স্বপ্ন দেখা শিখতে হবে এবং তারপর সেই স্বপ্নের জন্য লড়াই করতে হবে। এই গল্প থেকে অনুপ্রেরণা নিতে হবে এবং নিজের সফলতা নিজেকেই খুঁজতে হবে। তাহলেই আপনি সফল হবেন, রঞ্জিতের মতোন আপনার জীবনেও সফলতা আসবেই। সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে, হিন্দুস্তান টাইমস