কালের কন্ঠ অনলাইন ডেস্কে তসলিমা নাসরিন এর ‘যার শত্রু নেই, সে কেমন লেখক ?’ প্রতিবেদনটি খুব দরদ দিয়ে পড়ছিলাম। এইতো আজ সকালেও খুব মনযোগ দিয়ে বারংবার পড়লাম। এক কথায় তাঁর কথাগুলো আমার বেজায় মনে ধরেছে। আপনিও চাইলে পড়তে পারেন। পড়তে কোন বাঁধা নেই। কারোর প্রতি আপনার বিদ্বেষ, বৈরিতা থাকতেই পারে। তবে পড়া, জানা, বুঝার মধ্যে কোন ফারাক থাকতে নেই। ঘড়ি বাঁধা রুটিন থেকে বেরিয়ে মস্তিষ্ককে মাঝেসাজে ঝাকুনি দিতে হয়। আর তখনই মাথা খেলে ভালো।

এর মানে এই নয়, আমি তসলিমা নাসরিন এর বিগ ফ্রেন্ড। অথবা আমিও তাঁর মতোন সেলিব্রেটি হতে চাই; তাও কিন্ত নয়। অতো বড় ক্ষুরধার সমালোচক এবং লেখক আমি অন্তত নই। ছোট মাথায় এসব খেলে না। খেলার কথাও না আমার। তাই এসব নিয়ে বেহুদা চিন্তা করবেন। সময় নষ্ট করবেন না। যাদের সবকিছু লোড নেয়ার অভ্যাস নেই এসব টুকিটাকি বিষয় নিয়ে করোনাকালে বাড়তি লোড মাথায় নিবেন না। না নেয়ায় ভালো। বরং ভালো হবে বিষয়টি বুঝার চেষ্টা করলে। আর আপনি লেখক হয়ে থাকলেতো কোন কথায় নেই। আমি বলবো সমাজ সেবকদের জন্যেও লেখাটি বেশ প্রযোজ্য। প্রনিধাণযোগ্য এবং বাস্তবধর্মী একটি লেখা।

প্রবাসী লেখিকা তসলিমা নাসরিন সেখানে অবলিলায় বলছিলেন, ‘বড় কিছু বাঙালি লেখক সম্পর্কে খুব গর্ব করে বলা হয় তাঁদের কোনও শত্রু নেই। শুনে আঁতকে উঠি আমি। শত্রু নেই, তাহলে কেমন লেখক তাঁরা, কী লেখেন যে শত্রু তৈরি হয়নি? তাঁরা এমন লেখা লেখেন, যে লেখা পড়ে সবাই খুশি থাকে। বামপন্থী ডানপন্থী কট্টরপন্থী নরমপন্থী সকলেই খুশি, ধনী গরিব নারীবিদ্বেষী নারীবাদী সকলেই খুশি, কেউ লেখার কোনও বিষয়ে আপত্তি করে না, মন খারাপ করে না, রুখে ওঠে না। কারণ আপত্তি করার, মন খারাপ করার বা রুখে ওঠার কিছু থাকে না তাঁদের লেখায়।

আমার ভয় হয় এমন লেখকের নাম শুনলেই। এই লেখকেরা এক নষ্ট সমাজে বাস করছেন, কিন্তু নষ্ট সমাজের নিন্দে করেন না, করলে নষ্ট সমাজের হর্তাকর্তারা তাঁকে পছন্দ করবেন না তাই। এই লেখকেরা  বৈষম্যের মধ্যে বাস করেন, কিন্তু বৈষম্যের প্রতিবাদ করেন না, প্রতিবাদ করলে শত্রু তৈরি হবে, বৈষম্যে বিশ্বাস করা মানুষ তাঁকে ঘৃণা করবে এই ভয়ে।

এই লেখকেরা বিস্তর জাতীয় পুরস্কার পান, বড় বড় সাহিত্য সভায় সভাপতিত্ব করেন, পুরু পুরু ফুলের মালা পরেন গলায়, উদবোধনের ফিতে কাটেন, প্রকাশকেরা এই লেখকদের রচনাবলী প্রকাশ করেন। এই লেখকেরা নিষিদ্ধ হন না, বরং বিক্রি হন ভালো।‘

এসব কথাগুলো আপনার দিলে বৈদ্যুতিক শকের মতোন হিট করবে-করবেই। কথাগুলো আগুন ছ্যাকার মতোন লাগতে পারে। আপনার গদিও গরম হতে পারে। একা রেগে গিয়ে নিজের মাথার চুল ছিড়ে ফেলার উপক্রম হতে পারে, আপনি যদি সে ডাচের লেখক/সমাজ সেবক হন। আবার টেবিলে বসে থাকলে দু’হাতে স্বজোড়ে টেবিল ছাপড়ে বলতে পারেন যে; লেখক কিংবা সমাজ সেবক হতে গেলে শত্রু লাগে এ আবার কেমন কথা!

হ্যাঁ ওঁনার কথা বলার আসল গোমর তো ওখানে। ওখানেই প্রতিটা শব্দের ঘ্রাণ নেয়ার আছে। আমিও বলি, শত্রু না থাকলে সে আবার কেমন লেখক? সে আবার কেমন সমাজ সেবক? লেখক হতে গেলেও শত্রু লাগে, তেমনি ভালো কাজ করতে গেলেও অযাচিত শত্রু তৈরি হয়ে যায়। শত্রু থাকতে হয়।  এই অপ্রত্যাশিত বিষয়টি নিয়মে পরিনত হয়েছে। নিয়মে পরিনত করেছে সমাজের স্বার্থন্বেষী, লোভী কিছু মহল। বুদ্ধিজীবি লেবাস ধরে মাছরাঙার মতোন ঘাপটি মেরে বসে থাকে। বহুদল করে। বহুবার নিজের মত পাল্টায়। সুযোগ বুঝে পল্টি মারে। বিকারগ্রস্থ লোকদের লেলিয়ে দেয় সোস্যাল মিডিয়ায়। অর্থাৎ নিজে ভালো কিছু করেনি, অথচ অযাচিত কথা বলার জন্য তখন অতি উৎসাহি মানুষের অভাব হয় না। ভালো করলেও কিছু বলতে হবে, খারাপ কাজ করলেতো দাড়ি কমা সেমিকোলন ছাড়া মন্তব্য তো অবশ্যই।  জগতে এমন কিছু মানুষও আছে কাউকে কোনভাবে ছাড় দেবেন না। আর এই মানুষগুলো সবসময় ভালো কাজে বাঁধাগ্রস্থ করে। সে ব্যক্তিগতভাবে সমাজের উন্নয়ন চায় না। নিজেও কিছু করবে না, বুদ্ধিতে কুলাবে না, সেই তিনি অন্যকেও ভালো কিছু করতে দেবেন না। সত্যি বলতে কি,  এমন মানুষ নিজেকে ছাড়া অন্যকে বুঝতে পারে না, বুঝতে চায় না। অন্যকে বুঝার ক্ষমতা তার একেবারেই নেই। অন্যকে বিপদে, বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে এ ধরনের মানুষ সমাজে অপ্রয়োজনে দাপরে বেড়ায় শুধু নিজ স্বার্থ হাসিলের জন্য।

জ্ঞানীরা বলেন, আপনার পেছনে সমালোচনা আসা মানে হলো আপনি কিছু না কিছু কাজ করছেন। ভালো লেখায় এবং ভালো কাজে সমালোচনা আরও ঢের বেশি। খারাপ কাজের সমালোচনা সাধারণত এক ঘেয়েমি হয়। এক তরফা লাগে। কিন্ত ভালো লেখা, ভালো কাজে সমালোচনায় বৈচিত্র থাকে। বৈচিত্র থাকতে হয়। সেখানে আমাদের জানার, বুঝার এবং ভাবার অনেক আছে। নিজের ভুল থাকলে আপদমস্তক শুধরে নেবার সুযোগ হয়।

কিন্ত বাস্তবে যা দেখি, কিছু লেখক ভালো লেখে না তবুও প্রশংসিত হন। তেমনি সমাজ সেবার নামে আকাম-কুকাম করলেও গলায় মালা পায়। ফলে সে লেখক নাক উঁচু ভাব করে বসে থাকেন। তিনি ভাবেন একমাত্র তিনি সেরা লেখক, উত্তম সেবক। অথচ কিছু সমাজ সেবক ভালো কাজ করেন এবং ভালো লেখেও এমন বৈষম্যের মধ্যে বাস করেন। বৈষম্যের প্রতিবাদ করেন না। প্রতিবাদ করলে শত্রু তৈরি হবে। সে শুধু ভাবে বৈষম্যে বিশ্বাস করা মানুষ তাঁকে ঘৃণা করবে এই ভয়ে লেজ গুটিয়ে লেখালেখি করেন, দাগি সমাজ সেবকও বদহজমের কথাও দিব্যি হজম করেন নীরবে। ঠান্ডা মাথায় দল করেন। এই জাতীয় লেখক, সমাজ সেবকেরা বিস্তর জাতীয় পুরস্কার পান, হরহামেশা প্রশংসিত হন। সোস্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হন। সেলিব্রেটি হন। বড় বড় সাহিত্য সভায় সভাপতিত্ব করেন, পুরু পুরু ফুলের মালা পরেন গলায়, উদ্বোধনের ফিতে কাটেন, প্রকাশকেরা এই লেখকদের রচনাবলী প্রকাশ করেন। এই লেখকেরা নিষিদ্ধ হন না, বরং বিক্রি হন ভালো, এহেন প্রবাসী লেখিকা তসলিমা নাসরিন যথার্থই লিখেছেন।

এ জাতীয় লেখক কিংবা সমাজ সেবক দেশ এবং জাতির জন্য ভয়ঙ্কর, এবং ভয়ানক হয়ে ওঠতে পারে। এর কারণ হলো ওরা প্রতিবাদী নন, নিজের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য নিজেকে যেকোনভাবে সংযত করে রাখে এবং সুযোগ বুঝে বাম হাত ঢুকিয়ে দিতে ভুল করে না। এবং সে ভুল করবেন না। তারা  রাতারাতি সমাজে মধ্যমণি হতে পারেন। তারাই রাজপথের জাতীয় প্রতীকী হয়ে ওঠেন।