ভয়ঙ্কর দু:স্বপ্ন এখনো পার করেনি পৃথিবীর মানুষ। ২০২০ সালে করোনা মানুষের আধুনিক সভ্যতাকে বিলীন করে দিয়েছে। সামাজিক দূরত্ব সৃষ্টি করে পুরো পৃথিবীটাকেই স্তব্ধ করে দিয়েছে। মানুষখেকো করোনা ভাইরাস পরিচয় করিয়ে দিয়েছে- লকডাউন, আইসোলেশনের মতো চরম বাস্তব কয়েকটি শব্দের সঙ্গে। যা কোনোভাবেই এই গ্রহের সভ্যতার সাথে যুৎসই ছিল না।
ছন্দময় বছরটি নিয়ে কতশত স্বপ্ন বুনেছিল মানুষ। মানুষের সে স্বপ্নগুলো নিমিষেই বিষাদে রূপ নিল। ভয়ঙ্কর দানবের বেশে পৃথিবীতে হানা দিল অদৃশ্য এক অনুজীব। তছনছ করে দিল যাবতীয় স্বাভাবিকতা। চোখের সামনে কতশত প্রিয়জনকে গিলে খেল ঘাতক ভাইরাস। ২০২০ বছরটিকে অভিশপ্ত বছর হিসেবেই গণ্য করা যেতে পারে।
সেই অভিশপ্ত বছর পার করতে না করতেই আদিবাসী এলাকাতে হানা দিতে শুরু করলো ‘ইকোপার্ক ২০২১’ ভাইরাস। এই ভাইরাসটি শুধুমাত্র বাংলাদেশের আদিবাসী এলাকায় সংক্রমিত হতে দেখা যায়। এক গবেষণায় দেখা গেল, এই ভাইরাসটি মূল বৈশিষ্ট্যই হলো আদিবাসীদের অস্তিত্ব, ইতিহাস ঐতিহ্যকে দ্রুত সংক্রমিত করতে পারে। আদিবাসী জিন, আদি শেকড় তছনছ করে ফেলতে পারে। করোনা-১৯ ভাইরাসের প্রতিষেধক ভেকসিন বের হলেও ‘ইকোপার্ক ২০২১’ ভাইরাসের ভেকসিন এখনো আবিস্কার করতে পারেনি দেশের সরকার।
গোটা বিশ্ব জানে করোনা-১৯ ভাইরাসের উৎপত্তি চীনে। কিছু আন্তর্জাতিক মহলের ধারণা করোনা মানুষের আবিস্কার। এবং তা আবিস্কার করেছে খোদ চীন। যদিও এর সত্যতার প্রমাণ এখনো পায়নি। দেশের সকল আদিবাসীদের অভিযোগ ‘ইকোপার্ক ২০২১’ ভাইরাসটি বাংলাদেশ সরকার আবিস্কার করেছে। সত্যতার প্রমাণও রয়েছে আদিবাসীদের কাছে। তাইতো বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে ভাইরাসটি কোন কোন অঞ্চলে হানা দিবে তার একটি তালিকা, এবং রোড ম্যাপ তৈরি করে দিয়েছে। সরকারী এজেন্ডা বাস্তবায়নে নেমেছে বনখেকো (ফরেস্ট গার্ড) বাহিনী। আদিবাসীদের বিতাড়িত করতে এদেশের সরকার, কুচক্রীমহল ষড়যন্ত্র করে ইকো ট্যুরিজম ভাইরাসটি পরিকল্পিতভাবে সৃষ্টি করেন। যা আদিবাসী নিধনকল্পে ব্যবহৃত হতে পারে। যার ফলে বন রক্ষা, হোটেল-পর্যটনের নামে দেশ থেকে আদিবাসীদের অস্তিত্ব, ইতিহাস-ঐতিহ্য বিলীন করতে উচ্ছেদ নোটিশের মাধ্যমে ভাইরাটি প্রয়োগ শুরু করেছে দেশের বন বিভাগ। রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে ভাইরাসটি ছড়িয়ে দিচ্ছে দেশের সকল আদিবাসী অঞ্চলে।
মধুপুরসহ দেশের বিভিন্ন আদিবাসী অধ্যূসিত অঞ্চলে ইকোপার্ক, পাঁচতারা হোটেল, পর্যটন শিল্প, বন ও জীব বৈচিত্র সংরক্ষণ ইত্যাদি প্রকল্পের নামে আদিবাসী উচ্ছেদের ষড়যন্ত্র থামছেই না। সেই ব্রিটিশ পিরিয়ড থেকে মহাপ্রকল্প বাস্তবায়নের মহড়া চলছেই তো চলছেই। বন নেই; তবুও কী সব বন প্রকল্পের নামে বনের ভেতর আলগা লোক দেখানো মহা কর্মযজ্ঞ, যা পাগলও ভালো বুঝে! মধুপুরকে ঘিরে, বনের আদিবাসীদের স্থায়ীভাবে উচ্ছেদ করতে কিছু গোষ্ঠী, মহল এখনো তৎপর। সামাজিক বনায়ন, বন উন্নয়ন প্রকল্প দেখিয়ে বিশ্ব ব্যাংক, এশিয়ান ব্যাংক আরও কত দাতা সংস্থাকে ভুলভাল বুঝিয়ে প্রকল্প এনেছে তার ইয়ত্তা নেই।
এ দেশ থেকে আদিবাসীদের বিলুপ্ত করতে সরকারের মাথায় ইকোপার্ক, ট্যুরিজমের ভূত চেপে বসে আছে। আদিবাসীদের দীর্ঘদিনের দখলী স্বত্ব ভূমি দখল করে, অবৈধভাবে ইকোট্যুরিজম বাস্তবায়ন তাঁদের মূখ্য বিষয়। যার ফলে আদিবাসীদের ভূমি সংরক্ষণ, তাঁদের স্বীকৃতি, প্রাচীন বসতভিটে, ঐতিহ্য রক্ষায় আন্দোলন, লং মার্চ, মানব বন্ধন, মহাসমাবেশ ইত্যাদি বিষয় দেশের সরকার বাহাদুরের কানে পৌঁছায় না। সরকার বাহাদুর যেন জন্মগত বধির। ভারি অবাক করা কান্ড! যা দেখি, আদিবাসীদের আন্দোলন, অস্তিত্ব রক্ষার দাবি শুনে বড় জোড় কথা দেয়, কিন্ত পরে তাঁরা আর কথা রাখে না; যেমন ঐ ছেলে বেলায় গেদু চাচার কাছে ছোট নাতির চকলেট খাওয়ার বায়না ধরার মতোন। গেদু চাচা নাতির মন গলাতে ফন্দি করে বলে কিনা আরে নাতি কাল সব তোকে কিনে দেবো, পরশু দেব বলে বুঝিয়েসুঝিয়ে নাতির পিঠ চাপড়ে আদর করে কান্না থামানোর অবস্থা।
বন নেই তো কি হয়েছে! বনায়ন, ইকোট্যুরিজমের নাম করে ফায়দা লোটার দিনতো ফুরোয়নি। সরকার, রাষ্ট্রযন্ত্র, রাজনৈতিক নেতা, কথিত নেতাদের ফান্দিফিকির যাকে বলে কলা দেখিয়ে বানর ধরার গল্প তো ওখানেই উহ্য থাকে। আদিবাসীদের উচ্ছেদ নোটিশ, মিথ্যে বন মামলা কাঁধে ঝুলিয়ে আর কত মজা নিবেন? আদিবাসীদের অধিকার লড়াইয়ে পীরেনদের আর কত রক্ত ঝরাবেন, আর কত উৎপলদের স্বপ্ন ভঙ্গ করবেন? বনভূমিতে বাসন্তী রেমাদের অস্তিত্ব রক্ষায় আর কত ধুকে ধুকে কাঁদতে হবে?
সরকার চলে যায় নতুন সরকার ক্ষমতায় আসে। নেতা যায় আরেক নেতা ঘুরেফিরে আসে। তবুও আদিবাসীদের ভাগ্য আর বদলায় না। বনবাসীদের কথা দিয়ে কেউ কথা রাখে না। দেখিনি। বিগত দিনগুলোতে এবং এখনো দেশের সরকার আদিবাসী ইস্যূতে উদাসীন। মধুপুর গড়াঞ্চলসহ দেশের সকল আদিবাসী এলাকায় অত:পর অদৃশ ভয়, যা করোনা ভাইরাসের চেয়েও ভয়ঙ্কর আতঙ্ক দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে দিনকে দিন। যা কোনোভাবেই বিগতগুলোতে আদিবাসী গ্রহে এবং সভ্যতার সাথে যুৎসই ছিল না, আগামীর দিনগুলো সুখকর হবে না।