টাঙ্গাইল জেলার মধুপুরে আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। নয়-তো কেনইবা শান্ত আদিবাসী মানুষ করোনা কালে মিছেমিছি অশান্ত হবে, রাস্তায় নামবে? শুধু তাদের বসতভিটে ও জীবন–জীবিকা রক্ষার জন্য নয়, এহেন গোটা আদিবাসীদের অস্তিতও জড়িয়ে রয়েছে। কোন জাতিগোষ্ঠীর জীবন জীবিকা, অস্তিতকে কেউ যদি স্বমূলে উপড়ে ফেলতে চায় জাতিগোষ্ঠী হিসেবে কি করা উচিত? সেখানকার আদিবাসীরা শত শত বছর ধরে যে জমিতে বসবাস করে আসছে, বনবিভাগ সেই জমি থেকে উচ্ছেদ করতে পায়তারা করছে দীর্ঘকাল। সেই জমি থেকে উচ্ছেদ হওয়ার ভয় নিয়ত তাদের তাড়া করে ফিরছে! সরকারকে ভুলভাল বুঝিয়ে লোক দেখানো এসব বন বাণিজ্য প্রকল্পের কুশীলব কারা?

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রণালয়–সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গত ২০ ডিসেম্বরের মধ্যে সংরক্ষিত বনভূমি দখলদারদের তালিকা তৈরি করে ৩০ জানুয়ারির মধ্যে উচ্ছেদের নোটিশ জারি করায় মধুপুরের আদিবাসীদের মধ্যে উদ্বেগ আরও বহুগুণ বেড়ে গেছে। মধুপুর গড়াঞ্চলে বসবাসকারী ২৫ হাজার গারো, কোচ, বর্মণ সম্প্রদায়ের মানুষ বংশানুক্রমিকভাবে এই বনাঞ্চলে বসবাস করছেন এবং উঁচু চালা জমিতে জুমচাষ ও নিচু বাইদ জমিতে ধান চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। ১৯৮২ সাল পর্যন্ত তাঁরা জমির খাজনা দিয়ে আসছিলেন। এর পরে দেশের সরকার খাজনা নেওয়া বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

এহেন উল্লেখ্য ২০০২ সালে তৎকালীন সরকার মধুপুর বনাঞ্চলে ইকোপার্ক ঘোষণা করলে স্থানীয় সকল আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীরা প্রতিবাদ করেন। ইকোপার্ক বন্ধের আন্দোলন সংগ্রামে পীরেন স্নাল শহীদ এবং আরও শত শত গুরতর আহত, পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। সে সময়ের বিরোধী দল আওয়ামী লীগ ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর দাবির সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেছিল। অথচ সেই আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই ২০১৬ সালে মধুপুর বনাঞ্চলের অরণখোলা মৌজায় ৯ হাজার ১৪৫ দশমিক শূন্য ৭ একর জমিকে চূড়ান্তভাবে সংরক্ষিত বন ঘোষণা করা হয় এবং উক্ত মৌজাতেই ১৩টি গ্রামে বিভিন্ন আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর বসতি রয়েছে। সর্বশেষ ২০২০ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর বন বিভাগ অরণখোলা মৌজার পেগামারী গ্রামের গারো নারী বাসন্তী রেমার ৪০ শতক জমির কলাবাগান কেটে ফেলে। এরপরে প্রতিবাদের মুখে বন বিভাগ পিছু হটতে বাধ্য হন। অধ্যাবধি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার দেশের আদিবাসীদের ভূমি অধিকার প্রশ্নটি কেন ভাবছেন না!

অন্যদিকে দেখুন সেই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার দেশে বহিরাগত রোহিঙ্গা ইস্যূতে বাংলাদেশ কত উদার দেখালেন। রোহিঙ্গাদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নিয়ে দেশ দেদারসে বর্হিবিশ্বের প্রশংসাও কুরাচ্ছেন। এরপর রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে এবং তাদের ভবিষ্যত আবাসন, অধিকার নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন; তাহলে খোদ আদিবাসী জনগোষ্ঠীদের ভূমি অধিকার প্রশ্নে এতো নাটকীয়তা, এতো মহা প্রকল্প কেন?

ক্ষমতাসীন আওয়মী লীগ সরকার বহিরাগত রোহিঙ্গাদের জামাই আদরে রেখে নিজ দেশের আদিবাসীদের ভূমি অধিকার বঞ্চিত করছেন। মধুপুরের আদিবাসীরা দেশের জন্মগত নাগরিক, প্রাচীন ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি নিয়ে চাষবাস বসবাস করে বনভূমিতে; সেই জমি থেকে তাদেরকে উচ্ছেদ ষড়যন্ত্র করলে আদিবাসীরা হাট পা গুটিয়ে বসে থাকতে পারে না, থাকা উচিতও নয়। ফলে সেখানকার আদিবাসী জনগোষ্ঠীরা গেল সোমবার মধুপুর উপজেলা সদরের আনারস চত্বরে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন। এছাড়াও ঢাকাতে গত বুধবার মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়েছে।

দেশের গণতান্ত্রিক সরকারকে মনে রাখতে হবে, স্থানীয় কোন আদিবাসীরা বন ধ্বংস করে না। বরং তারা যক্ষের ধনের মতোন বন আগলে রাখে। বন বিভাগের কর্মকর্তাদের যোগসাজসে প্রকল্পের নামে বন উজাড় করে প্রভাবশালী ও ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা। আদিবাসীদের দাবী, কোনো এলাকায় ইকোপার্ক কিংবা সংরক্ষিত বনাঞ্চল করলে সেখানকার বাসিন্দাদের সঙ্গে নিয়েই তা করতে হবে। ঐতিহ্যগতভাবে তারা যে জমিতে আছে, সেই জমি তাদের স্থায়ীভাবে বন্দোবস্ত দিলে বনও রক্ষা পাবে, আদিবাসী মানুষের অধিকার রক্ষা পাবে। সেখানে সামাজিক বনায়নের বদলে প্রাকৃতিক বনায়ন তথা গ্রাম বন পদ্ধতি চালুর বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে আদিবাসীদের ভূমি সমস্যার সমাধান করা উচিত।

টাংগাইলের মধুপুরে জাতীয় উদ্যান ও সংরক্ষিত বনভূমি ঘোষণার নামে আদিবাসীদের নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদ-ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে-মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ তাদের গণতান্ত্রিক এবং ন্যায্য অধিকার। এদেশে প্রতিবাদ, লড়াই সংগ্রাম ছাড়া আদিবাসীদের আর কোন পথ তাদের সামনে খোলা নেই। দেশের সরকারকে গুরুত্ব দিয়ে বুঝা উচিত মধুপুরের বন রক্ষা করতে হলে রোহিঙ্গাদের অধিকার বাস্তবায়ন আগে নয়, দেশের সকল আদিবাসীদের ভূমি অধিকার সবার আগে নিশ্চিত করা উচিত।