একজন কৃষিমন্ত্রী হয়ে দেশের কৃষি উন্নয়নের কথা ভাববেন এটা মানা যায়। বোধকরি জনগণও মানবেন। কিন্ত দেশের আবাদী জমিতে (ধানক্ষেত) প্রমোদের জন্যে কৃত্রিম লেক খনন করে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি ধরে রাখতে হবে এমন আজব চিন্তার উন্নয়ন যিনি করেন, ভাবেন; যিনারা প্রকল্পটি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাদের উন্নয়ন কর্মকান্ডকে ঠান্ডা মাথায় ভাবতে গেলে আমার ভয়ঙ্কর খটকা লাগে। আপনাদের লাগে কি না জানি না। আমার এমন লাগাটাই স্বাভাবিক। আমার মতোন শান্ত সুবোধ নাক চ্যাপটা চ্যাপা সুটকি খাওয়া নাখান্দা মানুষের মাথায় যদি ম্যাজিক কারেন্টের মতোন স্যুইচ দেয়ার আগেই বাতি জ্বলে, অর্থাৎ চ্যান্নত করে বিষয়টি ধরে ফেলে, আর আপনি ঘি মাখন খাওয়া নাক উঁচু মাথায় এটা খেলে না তা কি করে হয়!

মধুপুরের মধুবন নিয়ে কিছু বাঙালী অসাধু থেকে শুরু করে সরকার বাহাদুরও বহুদিন যাবত খেলছে। দৃশ্যত যা দেখি দেশের সকল আদিবাসী নিশ্চিহ্ন না করা পর্যন্ত আদিবাসীদের নিয়ে খেলার রাজনীতি কোনদিন বন্ধ হবার নয়। যার ফলে বৃটিশ পিরিড থেকে মধুপুরসহ বিভিন্ন আদিবাসী অঞ্চলে নানা প্রকল্পের আলামত পাওয়া যায়। আসলে সেটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়, উন্নয়নের নামে সেখানকার আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলায় এর প্রধান এবং অন্যতম উদ্দেশ্য বললে একেবারেই অত্যুক্তি হবে না।

বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি বিজরিত এলাকায় উন্নয়ন সংরক্ষণ প্রয়োজন। সেটাও না হয় মানলাম। কিন্ত যে উন্নয়ন কর্মকান্ড করতে গিয়ে সেখানকার জনগোষ্ঠীর স্বাভাবিক জীবন যাপন, জীবন বৈচিত্রকে মারাত্মক ব্যাহত করে, তাদের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ঠেলে দেয় এমনসব প্রকল্পকে কোন প্রকল্পের ভাষায় উন্নয়ন প্রকল্প বলে সেটির ব্যাখ্যা আমাদের কারোর জানা নেই। আপনার (কৃষিমন্ত্রী) জানা থাকতে পারে। আপনি যদি একা জেনে থাকেন তাহলে সেখানকার সচেতন আদিবাসী জনগণকে নিয়ে প্রকল্প করার আগে বসুন। বিষয়টি সমাধা করুন। এরপর সঠিক সিদ্ধান্ত নিন। যেকোন টেকসই উন্নয়নকে তরান্বিত এবং বাস্তবায়ন করতে হলে সেখানকার জনগোষ্ঠীকে সম্পৃত করুন। আপনি সেখানকার আদিবাসীদের পাশকাটিয়ে আবার সেই আদিবাসীদের আবাদী জমিতে প্রকল্প করবেন, বঙ্গবন্ধুর নামে অমুক তমুক করেন; এমন উন্নয়নের ভাষা সেখানাকার আদিবাসীরা বুঝে না, বুঝবে না তা ভাবলে আপনি বড় ভুল করছেন। আপনাদের মতোন সরকারের উন্নয়নের ভাষা সকল আদিবাসী জনগণের তর তর করে মুখস্ত হয়ে গেছে।

আদিবাসী গারোদের মুখস্ত হয়ে গেছে মধুপুর গড়াঞ্চলে ১৯২৭ সালের ভূমি সমস্যা। ১৯২৭ সালের উপনিবেশিক বন আইনের ৬ ধারার মাধ্যমে তৎকালীন পূর্ববঙ্গীয় বন বিভাগ ১৯৫৫ সালের ফরেস্ট গেজেট। ১৯৬২ সালে আইয়ুব খান ও মোনায়েম খানের আমলে স্থানীয় গারোদের উচ্ছেদের জন্য ‘জাতীয় উদ্যান’নাম দিয়ে বিশ হাজার আটশো সাতাশ একর শালবনে কাটা তারের বেড়া। ১৯৭৮ সালে টেলকি গ্রামের দক্ষিণে নয়াপাড়া পুরো গারো গ্রাম উচ্ছেদ করে সে এলাকায় প্রতিষ্ঠা করা হয় বিমান ফায়ারিং রেঞ্জ। ১৯৮৯ সাল থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সহায়তায় ‘উডলট বাগান’ করার প্রকল্প। উডলট বাগান হল মধুপুর গড় এলাকার শালবন বা দীর্ঘ মেয়াদে বেড়ে উঠা প্রাকৃতিক বনজ গাছ নিধন করে বিদেশি ইউকেলিপটাস প্রজাতির গাছ লাগানো। দিবালোকে উজার করা হয় প্রাকৃতিক শালবন। ফলে কেউ ভুমি হারায়, কেউবা আবার ৪০ শতাংশ লাভের আশায় নিজের ভূমি তুলে দেয় বনবিভাগকে। ২০০০ সালে মধুপুরে ইকোপার্ক নির্মাণের পদক্ষেপ গ্রহণ করে দেশের বনবিভাগ। বিশ্বব্যাংক ও এশিয়ান ব্যাংকের কাছ থেকে সাহায্যের সংবাদ পাওয়ার পর মধুপুরের শালবনে ৪৭৮ বর্গকিলোমিটার ব্যাপী ইকোপার্ক স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়। যেখানে থাকবে ছয়টি ব্যারাক ও ১০টি পিকনিক স্পট। ১৯৮৬ সালের টাঙ্গাইল জেলার মধপুরের পীরগাছায় তিন হাজার একর জায়গা জুড়ে গড়ে তোলা হয় রাবার বাগান। এখানে প্রায় ১ লাখ ৫৫ হাজার রাবার গাছ রয়েছে। এখানে গারোদের জমাজমিও দখল হয়েছে রাবার বাগান তৈরিতে। সম্প্রতি বন বিভাগ বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতায় ‘সাসটেইনেবল ফরেস্ট অ্যান্ড লাইভলিহুড’ বা সুফল প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এছাড়া ‘মধুপুর জাতীয় উদ্যানের ইকোটুরিজম উন্নয়ন ও টেকসই ব্যবস্থাপনা’র আওতায় বন বিভাগ স্থানীয় মানুষের ভূমিতে সীমানা প্রাচীরসহ আরবোরেটাম বাগান, দ্বিতল গেস্টহাউস, ভূগর্ভস্থ জলাধার নির্মাণসহ নানা স্থাপনা নির্মাণ প্রক্রিয়াধীন। ২০২০ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর আরেকটি ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটায় বনবিভাগ। শোলাকুড়ি ইউনিয়নের পেগামারি গ্রামে বংশপরম্পরায় জমি ভোগকারী বাসন্তী রেমার ৪০ শতাংশ জমির পাঁচশ’কলাগাছ কেটে ফেলে বনবিভাগ…..ইত্যাদি ইত্যাদি অর্থাৎ মধুপুর গড়াঞ্চলের ইতিহাস পড়ে, এ অঞ্চলে বনবিভাগ কর্তৃক সকল উন্নয়নের গাণিতিক এবং জ্যামিতিক সূত্র পড়তে পড়তে আদিবাসীরা মুখে ফেনা তুলে ফেলেছে। সুতরাং আপনার সরকারের প্রকল্পের ভাষা বুঝা কঠিন কোন বিষয় নয়; বরং আপনারা ক্ষমতা বলে, জোর জবরদস্তি করে আদিবাসীদের অধিকার বিষয়ে সাংঘর্ষিক যে সকল উন্নয়ন কর্মকান্ড করছেন সেখানকার আদিবাসীদের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে আপনি/ আপনারা তা কি বুঝতে পারেন?

দোখলা লেক প্রকল্প ২০২২

ছবি: দ্বিতীয় দফায় টাঙ্গানো লেক প্রকল্পের ব্যানার

দেশের সরকার যদি কোন এলাকায় প্রকল্প করতে চায় তাহলে সে এলাকার ভূমি অধিগ্রহণ করে এরপর সেটি বাস্তবায়ন করা আইনগতভাবে বৈধতা দেয়। কিন্ত মধুপুর এলাকার আদিবাসী মানুষ এমন প্রকল্প চায় না, যা জাতিসত্তার জন্যে হুমকি মনে করে; তাহলে সে আবাদী জমিতে জোর জবরদস্তি করে রাতের আঁধারে সাইনবোর্ড টাঙ্গিয়ে দিয়ে সেখানকার নিরাপরাধ মানুষকে হয়রানি করছেন, বনবিভাগ অবৈধভাবে ভূমি দখল করতে চায় তা অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ারই নামান্তর। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা স্বপ্নের পরিপন্থী।

বাংলাদেশ স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি, পায়ের ধূলোকণা দেশের প্রতিটা অঞ্চলে থাকতে পারে এবং রয়েছে। তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা রেখে বলছি, তাঁর পায়ের ধূলো থেকে শুরু করে সকল স্মৃতি চিহ্ন ধরে রাখতে দেশের বিভিন্ন জায়গায় এমনসব স্থাপনা তৈরি করলে সংকোচিত আবাদী জমির অবশিষ্ট আর থাকে কী! আবাদী জমিতে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিস্তম্ভ এবং নানা স্থাপনা তৈরিতে ব্যবহার করে, আদিবাসীদের হুমকির মধ্যে ঠেলে দিয়ে বঙ্গবন্ধুর মৃত আত্মা শান্তি পাবে কী? মোদ্দা কথা দেশের কৃষকের পেটে লাঠি মেরে কোন দেশের উন্নয়ন হতে পারে না। বঙ্গবন্ধুর সোনার দেশ গড়ার স্বপ্ন এমনটা বোধয় ছিল না। ফলে জুতসই এবং টেকসই উন্নয়নের কথা ভাবুন। আদিবাসীদের পেছনে ফেলে, শোষিত বঞ্চিত করে নয়। সমঅধিকার, সমউন্নয়নের কথা ভাবুন। বঙ্গবন্ধুর সোনার দেশ গড়ে তুলুন।

গত সোমবার সম্মিলিত আদিবাসী জনতার ব্যানারে মধুপুরের দোখলায় আয়োজিত সমাবেশের মধ্যে দিয়ে গারোদের জমিতে বন বিভাগের লেক খনন প্রকল্প না করার জোড় দাবি উঠে, এবং প্রকল্প বাতিল করাসহ আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে হয়রানি বন্ধ না করলে আরও কঠোর আন্দোলন করবে বলে কঠোর হুশিয়ারি দেন এলাকার আদিবাসী ছাত্র জনতা। আমি একজন শুধু আদিবাসী হিসেবে নয়, একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে এ আন্দোলনকে সমর্থন করি, আন্দোলন এবং প্রকল্প প্রতিহত করার যেীক্তিকতা দাবি করছি।