আজকের লেখা যথেষ্ট আক্ষেপ, উদ্বেগ এবং উৎকন্ঠা নিয়ে লিখছি। তারপরও আমি আশাবাদী। আশাবাদী মানুষ হিসেবে সমাজে আশার বার্তা দিতে ভালো লাগে। আশা ছড়াতে ভালোবাসি। নিজের ভেতর দিনের পর দিন ধুমড়ে-মুছড়ে ফুলে-ফেপে বেড়ে ওঠা বিষফোঁড়া, যন্ত্রণার কিছু আশা প্রত্যাশার কথাগুলো দু’কলম লিখছি।
বিশ্ব পরিবেশ দ্রুত বদলাচ্ছে। চোখের পলকে বদলাচ্ছে মানুষের চিন্তা-চেতনা, আশা-আকাঙ্খা, চাওয়া-পাওয়ার নানা অংকের গাণিতিক মান ইত্যাদি। বিজ্ঞানের বদৌলতে মানুষ হাফ ছেড়ে বাঁচতে শিখেছে। বিশ্বায়ন এবং আধুনিকতার দমকা হাওয়া আদিবাসীদের নি:শ্বাসে প্রশ্বাসের সাথে আনাগোনা করছে দ্রুত গতিতে। বদলাচ্ছে রাজার নীতি, বদলে যাচ্ছে রাজনীতি, ব্যক্তির নীতির নীতি, আরও কত আপন পর নীতি। এমতাবস্থায় কৌশলকারির বিরুদ্ধে কৌশলী হয়ে পাল্টা জুতসই ব্যবস্থাই দিতে পারে এর মোক্ষম সমাধান। পরিবর্তন, সংশোধন, পরিমার্জন প্রয়োজন। ঘষা মাজার কথা ভাবতে হবে। স্বপ্নের এমন দোলনায় চড়ে আমি আগামীর পথে হেটে বেড়ায় দিবানিশি। ভাবতেইবা অসুবিধা কোথায়! এতে যদি জাতির মঙ্গল হয়। আবার মধুপুর শালবনে কল্যাণ ফিরে আসে।
ভাবতে অসুবিধে নেই কথা বললেই তো আর হলো না ! অসুবিধা আছে, আর সেটা হলো আদিবাসী সমাজের নেতৃত্বে। এটিই আজকে লেখার প্রধান প্রতিপাদ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমার জানা মতে নেতৃত্ব হলো, সমাজে নেতৃত্বের প্রকাশ হল দৃঢ়তাব্যঞ্জক, নিজেকে সম্পূর্ণভাবে মেলে ধরার অসাধারণ একটি ক্ষমতা এবং সবার ভার গ্রহণ করার মতো মনোবল থাকা প্রয়োজন। যাঁর মধ্যে এইসব গুনাবলী বিদ্যমান এবং স্বাধীনভাবে প্রকাশ করেন তিনি হবেন পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রের কিংবা প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দেয়ার একমাত্র অধিকারী বলে গণ্য হবেন। কিন্ত আজকাল গারো সমাজ তথা আদিবাসী সমাজের নেতা, নেতৃত্ব যা দেখি নেতৃত্বের গুণাবলী বিবেচনায় নেতৃত্ব আসে না, আসলেও টেকসই নেতৃত্ব আমরা দেখতে পাই না। তাছাড়াও জাতীয় পর্যায়ে গারোদের নেতৃত্ব দেয়ার ইতিহাস বেশি দিনের নয়। তাদের নেতৃত্ব নিয়ে যতটুকু দেখেছি, দেখছি তাও মনে হবে মাজা ভাঙ্গা কচুরি পানার মতোন নিজের ছায়া পানীর ঢেউয়ে কিংবা আউলা বাতাসে হেলেদুলে পড়ে।
ফলে সত্যিকার অর্থে গারোসহ অন্যান্য আদিবাসীর বিরাজমান নানা সমস্যা থেকে উত্তোরণের লক্ষণতো নয়-ই বরং গোটা জাতির অস্থিত্ব রক্ষা নিয়ে বিরাট প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। চারদিকে আদিবাসীদের এতো সমস্যা এ বিষয়ে নেতাদের মাথা ব্যাথাও নেই, তাদের ঘুম না হবার কারণও নেই এমন অবস্থা। মধুপুরে গত ১৮ তারিখে ঘটে যাওয়া ঘটনা এবং সেই ইস্যূকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের প্রতিবাদ (৩১শে আগস্ট ২০২১) সমাবেশে সেখানকার কিছু গারো এবং অন্যান্য আদিবাসী নেতাদের নগ্ন ভূমিকা তারই স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।
একবার কে যেন আমাকে এক ফোনালাপে বলেছিল, গত কয়েক দশক ধরেই পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই রাজনীতি নিয়ে সমাজবিজ্ঞানীদের সংজ্ঞার বৈশিষ্টসমূহ রাজনৈতিক নেতৃত্ব গঠনে অনিবার্য উপাদান হিসেবে অনুভূত হয় না। প্রকৃত বৈশিষ্ট অনুযায়ী তৈরি হয় না রাজনৈতিক নেতৃত্বের। কোন দেশের বাস্তবতার ভিত্তিতেই ওই দেশের রাজনীতির প্রকৃত চরিত্র ফুটে উঠতে দেখা যায়। আর এ ধরণের হাইব্রিড চরিত্রের ওপর ভর করে গড়ে উঠা রাজনৈতিক নেতৃত্বের বৈশিষ্ট ও যোগ্যতাই যেন আজকাল প্রশংসিত হয়, প্রতিযোগিতায় জয়লাভ করে। এমন বাস্তবতার সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একজন সফল রাজনৈতিক নেতৃত্ব হিসেবে টিকে থাকাটাই অনেকটা অসম্ভব। বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ধরণটাই যেন সমাজবিজ্ঞানীদের দেয়া সংজ্ঞাসমূহের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে উঠছে। এক্ষেত্রে, ছলেবলে কৌশলে দেশের বড় দুটি রাজনৈতিক দলে গুরুত্বপূর্ণ পদ এবং দলীয় আশীর্বাদ না পেলে জাতীয় রাজনীতিতে নেতৃত্বের টিকেট পাওয়া এবং টিকে থাকার কথা ভাবাই যায় না। তাই, এমন অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা না থাকলে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক নেতৃত্ব সৃষ্টিতে পরামর্শ দেয়াটা কঠিন হয়ে পড়ে।
সেই ফোনালাপের কথায় যেন অক্ষরে অক্ষরে ফলে যাচ্ছে। মধুপুরের নেতৃত্ব নিয়ে কথা বলছিলাম। মধুপুরে নেতৃত্ব যেন এখন এক মহা বিষেদাগার। অপরিনামদর্শী নেতৃত্ব গারো জাতিকে বিভাজনে, সাম্প্রদায়িকতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। স্বাধীনতার পর গারো এলাকায় ইকোপার্ক আন্দোলনে বিভাজনের রাজনীতি প্রথম গোচর হয়েছিল। সে সময় আরও আত্মপ্রকাশ করেছিল অযোগ্য, দালাল শ্রেণীর কিছু হাইব্রিড নেতা। বাঙালী, জাতীয় রাজনীতির ছত্রছায়ায় তারাই এখন আবার মাথা চারা দিয়ে উঠেছে। গারো জাতিসত্তার সংগঠনকে ব্যক্তি ও রাজনৈতিক, বা দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করে জাতির কাছে কলঙ্ক অধ্যায় উপহার দিতে শুরু করেছে। সেসব নেতাদের অপকর্ম, মোটা দাগের দুর্নীতি, ইকোপার্কসহ নানা ইস্যুতে তারা বিতর্কিত ভূমিকা তো সর্বজনবিদিত।
মধুপুর এলাকায় একেরপর এক এবং বিরামহীন তাদের কুতৎপরতা জাতির জন্য শুধু লজ্জাস্কার নয়, গারো জাতিসত্তার আগামী প্রজন্মকে পুরো অনিশ্চিতের দিকে ধাবিত করছে। অর্থ, পেশি শক্তিতে নেতৃত্ব পাওয়া যায়, আবার সে নেতৃত্ব, সংগঠন ভাড়ায় খাটানো যায় এমন তাবেদারি নেতৃত্ব গারো জাতির জন্যে রীতিমতো রেড সিগন্যাল। জাতীয় পর্যায়ে চরিত্রহীন নেতৃত্ব মধুপুরবাসীসহ গোটা আদিবাসীদের জন্যে এটাও আরেকটি নতুন ডিজিটাল বিনোদন হতে পারে। তবে সকল প্রগতিশীল মানুষের বিবেককে জানান দিচ্ছে এদের অস্তিত্ব, এটির উৎস আসলে কোথায়? এবং সেটিই আপনাকে খুঁজে বের করতে হবে। শেকড়ের সন্ধান পেলে অবশ্যই গাছের মূল কান্ডও খুঁজে পাওয়া যাবে। আর মূল কান্ড পেলে গাছটিই যদি পুরো পরিবেশ দূষণের কারণ হয়, তাহলে বুঝতে হবে গাছটি সমূলে উৎপাটন করে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে।
নেতৃত্বে ব্যত্যয় ঘটলে সে নেতৃত্ব কখনো সফল নেতৃত্ব হতে পারে না। দুরভিসন্ধি নেতা জাতিকে সুফল কিছু দিতে পারে না। ফলে গারো নতুন প্রজন্মদের জন্য আরও কি অন্ধকার ইতিহাস অপেক্ষা করছে, আমার চাইতে জগদীশ্বর ভালো বুঝবেন! নিজের বিবেককে প্রশ্ন করে দেখুন, বোধ করি আপনিও উত্তরটি পেয়ে যাবেন।
অনেক ক্ষেত্রেই আমরা অবিশ্বাস্য এগিয়েছি। কিন্ত এগুনোর মধ্যে কোন ছন্দ নেই। তাই-তো কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, ‘যে গতিতে ছন্দ থাকে না, তাকে দুর্গতি বলবো।‘ মধুপুরের গারোদের কপালে দুর্গতির লাল টিপ পড়িয়েছে কিছু নেতা, সংগঠন। ভুল নেতৃত্বে রাষ্ট্রের কাছে নুন্যতম অধিকার, মানবাধিকার এবং আদিবাসীদের অন্যান্য ন্যায্য অধিকার পাওয়া সম্ভব নয়। জাতীয় রাজনীতিতে অদুরদর্শী এবং ভঙ্গুর নীতির কারণে গারো জনজাতির আজ এই বেহাল দশা।
মোদ্দা কথা, আমরা জাতিসত্তার স্বপ্ন পূরণে সংগঠন গঠন করি। কিন্ত যে সংগঠনগুলো জাতির স্বপ্ন পূরণে ব্যর্থ, যে নেতৃত্বে আলো আসে না বরং অন্ধকার ডেকে আনে এমন সংগঠন, নেতৃত্ব নিষ্প্রভ। সকল গারো নতুন প্রজন্ম, বিবেকবান, প্রগতিশীল মানুষের কাছে এহেন একটি প্রশ্ন রেখে গেলাম- মধুপুরে সঠিক নেতৃত্ব, গারো নেতাদের কাছে জাতিসত্তার প্রত্যাশা যদি থাকে, তাহলে মধুপুরবাসীদের প্রত্যাশা পূরণে নেতৃত্বে পরিবর্তন, পরিমার্জন ছাড়া বিকল্প পথ নেই। গারোদের সংগঠন, নেতৃত্বে জলীয়বাষ্প শোধনের ফর্মূলা এ্যাপ্লাই করা প্রয়োজন। আমার জানা মতে মধুপুরে এখনো সফল নেতৃত্বের ইতিহাস রচিত হয় নি। তাই সফল নেতৃত্বের রুপরেখা তৈরি করে যোগ্য নেতৃত্ব পুন:গঠন করা জরুরি। আগামীর নেতৃত্বকে সঠিক এবং জনমত গড়ে তোলে শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
লুই সাংমা, প্যারিস, ফ্রান্স
ওয়েভপেজ ডেভেলপার, আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সার, ব্লগার এবং
সাহিত্য কর্মী lchiran76@gmail.com