মধুপুর গড়াঞ্চলে বেশ কিছুদিন ধরে পুনরায় টান টান উত্তেজনা বিরাজ করছে। মূলত মধুপুরের টেলকীতে আরবোরেটুম বাগান সংরক্ষণ স্থাপনা উদ্বোধন করতে গিয়ে তোপের মুখে পড়েন কিছু আদিবাসী নেতা! মধুপুরের আদিবাসীদের ভূমিতে ইকো-ট্যুরিজম প্রকল্প একটি দীর্ঘদিনের এবং আদিবাসীদের চলমান সমস্যা। যা কোন সরকার স্বপ্রনোদিত হয়ে সমস্যার সমাধান করে নি, বরং তা জিইয়ে রেখে কৌশল পরিবর্তন করে, বিভিন্ন নামে আদিবাসী অঞ্চলে প্রকল্পগুলো যেকোনভাবে বাস্তবায়নের পায়তারা করে চলেছে দিনের পর দিন।

টেলকীতে আরবোরেটুম বাগান সংরক্ষণ স্থাপনা ইকোট্যুরিজমের প্রমাণ হিসেবে সাম্প্রতিক সময়ে সোস্যাল মিডিয়াসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত নতুন প্রকল্পের নীল নকশা মধুপুরের আদিবাসীদের বিস্মিত করেছে। আরও বিস্মিত করেছে ঐ অঞ্চলের গোটা আদিবাসী জাতিকে কে বা কারা সে প্রকল্পে যুক্ত হয়ে প্রকল্পটি কোদাল দিয়ে মাটি কেটে উদ্বোধন করে। ফলে সে অঞ্চলের ছাত্র সংগঠনসহ আদিবাসী জনতা মনে করে এ প্রকল্প উদ্বোধনের মধ্যে দিয়ে ইকোট্যুরিজম প্রকল্পের কালো অধ্যায় শুরু হয়েছে। মধুপুর অঞ্চলে নতুন করে কালো ইতিহাস রচিত হয়েছে।

চলমান প্রকল্প বন্ধসহ মধুপুর আদিবাসী অঞ্চলের সকল ধরণের ইকো-ট্যুরিজম বন্ধ এবং অনতিবিলম্বে এ সমস্যা সমাধান কল্পে গত ৯ই মে মধুপুরের বিক্ষুব্ধ আদিবাসী ছাত্র-জনতার ব্যানারে জলছত্রের প্রধান সড়কের ওপর মানববন্ধন ও স্মারকলিপি প্রদান কর্মসূচী পালন করে। মানববন্ধনে সকল ছাত্র সংগঠন, এলাকার আদিবাসী জনতা এবং অন্যান্য মানবতাবাদী আদিবাসী সংগঠন একযোগে সংহতি প্রকাশ করে। সেদিনের মানববন্ধন ও স্মারকলিপিতে তাঁদের দাবীসমূহ যেমন-

১। টেলকী গ্রামে তথাকথিত আরবোরেটুম/উদ্ভিদ সংরক্ষণ উদ্যানের নামে আদিবাসীদের পূর্বপুরুষদের বিদ্যমান প্রাচীন সামাজিক কবরস্থান/শশ্মান (মাংরুদাম) এর স্থানে প্রাচীর নির্মান, সংশ্লিষ্ট অন্যান্য স্থাপনাসহ প্রকল্প বাস্তবায়ন অবিলম্বে বন্ধ করা।

২। চলমান প্রকল্প এলাকা ও তৎসংলগ্ন স্থানীয় আদিবাসীদের স্বত্বদখলীয় কৃষি ও ফসলি (বাইদ/চালা) জমিতে কোন ধরণের প্রকল্প বাস্তবায়ন না করা।

৩। জাতীয় উদ্যান ও সংরক্ষিত বনভূমি ঘোষণা বাতিল করে মধুপুরে স্থানীয় আদিবাসীদের নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদ ষড়যন্ত্র বন্ধ করা।

৪। আদিবাসীদের প্রথাগত ভূমি অধিকারের স্বীকৃতি প্রদান ও সমতলের আদিবাসীদের ভূমি সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন দ্রত গঠন করা।

প্রকল্প বাস্তবায়ন নথিতে এবং সাংগঠনিক কার্যকলাপ যে বিষয়গুলো খুবই লক্ষনীয় বিষয়-

ক) প্রকল্পে উল্লেখিত বাক্য ‘স্থানীয় ও নৃগোষ্ঠী জনগণের সহায়তায় মধুপুর জাতীয় উদ্যানের ইকো-ট্যুরিজম উন্নয়ন ও টেকসই ব্যবস্থাপনা প্রকল্প’ কথাটি উল্লেখ করে প্রকল্প বাস্তবায়নে একটি দুরভিসন্ধি সিদ্ধান্ত বলে-ই প্রতীয়মান হয়।

খ) বনবিভাগ আদিবাসীদের ভূমিতে প্রকল্প গ্রহণ, প্রকল্প আনয়ন, বাস্তবায়ন সম্পর্কিত কোন ধরণের আগাম আলাপ-আলোচনা, বাস্তবায়নের পূর্ব নোটিশ দেয়ার রেওয়াজ দেখা যায় নি। টেলকীতে বাস্তবায়ন প্রকল্পেও সেটি বনবিভাগ অনুস্মরণ করে নি।

গ) জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদের মাধ্যমে টাঙ্গাইল বিভাগীয় বনবিভাগের কাছে লিখিত ম্যামোরেন্ডাম (স্মারক নং JAUP/01-21, ২৯ এপ্রিল ২০২১ তারিখ) কৌশলগতভাবে তড়িঘড়ি করে কিছু সাংগঠনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গের কাছে সই গ্রহণ এবং তাঁদের তৈরিকৃত প্রতিবাদ লিপিতে লিপিবদ্ধকৃত ভাষাসহ মর্মার্থগুলো বিভিন্ন আদিবাসী সংগঠনের নেতৃবৃন্দের কাছে যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করা হয় নি।

এদত বিষয় এবং সার্বিক পরিস্থিতে জনাব জন জেত্রা’র (সভাপতি-বাগাছাস, কেন্দ্রীয় কমিটি) অভিমত, ‘জয়েশনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদের কিছু ব্যক্তিদের সাংগঠনিক কার্যক্রম সম্পর্কে পর্যালোচনা করতে গিয়ে এমন অবস্থা যে, কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেড়িয়ে এলো। তাঁদের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের এমন কিছু তথ্য আমাদের কাছে রয়েছে; এবং তাঁরা স্পষ্টভাবে অভিযুক্ত। ফলে তাঁরা নিজ থেকে সাংগঠনিক পদ হতে পদত্যাগ করা উচিত। তা-না করলে তাঁদেরকে সাংগঠনিকভাবে কেন্দ্রীয় ও শাখা কমিটির মাধ্যমে অভিশংসনের মুখোমুখি করা হবে।‘

তাছাড়াও জনাব লিয়াং রিছিল এর বক্তব্য (সাধারণ সম্পাদক-জিএসএফ, কেন্দ্রীয় কমিটি), ‘আমি ব্যক্তি লিয়াং এর বিরুদ্ধে অথবা আমাদের অবস্থানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রোপাগান্ডা হতে পারে। আমাদের অবস্থান সম্পর্কে ভুল বুঝানো হচ্ছে বা কাউকে ভুল বুঝতে পারে। আমরা জয়েশনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদ সংগঠনের সঙ্গে একযোগে কাজ করতে চাই। নিজেদের মধ্যে বিভাজন আমরা চাই না। জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদ সংগঠন সাংগঠনিকভাবে নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধের মতোন ঘটনা না ঘটলেও ব্যক্তিগতভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত কিছু ব্যক্তির নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধ জাতির উত্তর প্রজন্মের জন্যে কোনভাবেই সুখকর নয়। সেই নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে জাতির স্বার্থে এবং কল্যাণার্থে তাদের স্বীয়পদ থেকে সরে দাঁড়ানো উচিত। অথবা ইকো-ট্যুরিজম প্রকল্প বাস্তবায়নে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরী প্রয়োজন।’

মধুপুর টেলকীতে আরবোরেটুম/উদ্ভিদ সংরক্ষণ উদ্যানের নামে কিছু আদিবাসী নেতাদের সহায়তায় প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং উদ্বোধনের মধ্যে দিয়ে ভবিষ্যত নেতৃত্ব নিয়ে জনমনে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এ অঞ্চলের আদিবাসী নেতৃত্বসহ গোটা আদিবাসীদের অস্তিত্বকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। মধুপুরসহ আদিবাসীদের স্বার্থ রক্ষায় দেশের সকল আদিবাসী সংগঠন, আদিবাসী রাজনৈতিক নেতা, দেশে ও দেশের বাইরে বসবাসরত সমাজের বুদ্ধিজীবীরা মুখে কুলুপ এঁটে বসে না থেকে, জাতির বৃহত্তর স্বার্থে সকলের দ্রুত এগিয়ে আসা উচিত।

লুই সাংমা, ফ্রান্স
ওয়েভ ডেভেলপার, ব্লগার, আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সার এবং
সাংস্কৃতিক কর্মী।