স্টাফ রিপোর্ট মধুপুর: মধুপুর শালবনে এমন একটা সময় ছিলো কেরোসিন কুপি বাতি ছাড়া বিজলি (বৈদ্যুতিক) বাতির আলো দেখা পাওয়া অলিক স্বপ্ন মনে হতো। কংক্রিটে বিছানো পাকা রাস্তাও দুরাশা মাত্র। দু:খভরা মনে ভাবতে হতো, প্রাকৃতিক শালবন প্রাণভরে বিছিয়ে দিয়েছে, ফুলে ফলে ঢেলে দিয়েছে অনেক, দেয় নি শুধু জগতের আলো। আর তখনিই মনে হতো অজ পাড়া গাঁ। বিছিন্ন একটি জনপদ। শালবনের গভীরতা এতোটাই ছিলো, দিনদুপুরেও বন্য পশু ও জীব জন্তুর ভয়ে রাস্তায় হেটে যেতে গা ছমছম করে উঠতো। বনের দুধারে বৃক্ষের শীতল ছায়ায় সরু কর্দমাক্ত রাস্তা গহীন বনে কোথায় যেন মিলিয়ে গেছে। দিনদুপুরে পথ হারানোর ভয় ছিলো। বনের শিশু জন্মের পর প্রাণভরে আলো চোখে দেখে নি। সিনা টান করে নি:শ্বাস নিতে পারে নি। আচ্ছা বলুন তো যে শিশুর গায়ে সূর্যের আলো পরে নি, খোলা আকাশের বাতাস পায় নি তাহলে শিশুটি বলিয়ান হবে কি করে? এভাবে কত বছর প্রযুক্তি বিদ্যায় পিছিয়ে তা জগদীশ্বর ভালো জানেন।
ফাইল ছবি: উদ্যোক্তা লিয়াং রিছিল
আজকে সেই অজ পাড়া গাঁয়ে বৈদ্যুতিক আলো আছে। আছে ইন্টারনেট সংযোগসহ কম্পিউটার। দীর্ঘকাল পর গড়ে উঠেছে ব্যক্তি উদ্যোগে তথ্য প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। বাহ্ ভাবতে কার না ভালো লাগে! সেদিনের অগনিত মানুষের কল্পনা, চাওয়া যেন বাস্তব হতে চলেছে। এক ক্লিকে গোটা বিশ্ব যেন হাতের মুঠোয়।
আ.বিমা টাইমসকে এ উদ্যোগ সম্পর্কে গারো তরুণ উদ্যোক্তা এবং কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ুয়া (ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ) লিয়াং রিছিল জানান, আপনার সৃষ্টিশীলতা ও উদ্ভাবনী শক্তির অপার সম্ভাবনার দ্বার উম্মোচন করতে পারে তথ্য প্রযুক্তি। বিশাল পরিধি ধারণ করে বহুশ্রুত ছোট্ট শব্দ “আইটি” যার অর্থ ইনফরমেশান টেকনোলজি বা তথ্যপ্রযুক্তি। সমগ্র বিশ্ব বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর। তথ্যপ্রযুক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত অত্যাধুনিক যুগে এ খাতে উন্নত যারা তারাই মূলত অগ্রসর। আইটি সম্পর্কে অজ্ঞতা পশ্চাৎপদতার অন্ধকারে ঠেলে দিবে বললে একেবারে অত্যুক্তি হবে না। ফলে দিন অতিবাহিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্রমশ পিছিয়ে যাচ্ছে প্রত্যন্ত অঞ্চল বিশেষত দূরত্ব ও দুর্গমতায় বসবাসরত জনগোষ্ঠী। যুগের সাথে তাল মেলাতে প্রয়োজন তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ জনগোষ্ঠী। আত্মকর্মসংস্থানে এর জুড়ি মেলা ভার। এ খাতে বিস্তৃত বিশাল জব-মার্কেট। সব ধরণের কর্মক্ষেত্রেই তথ্যপ্রযুক্তি সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান অত্যাবশ্য এবং জরুরি একটি বিষয়। প্রত্যন্ত অঞ্চলে এই চাহিদা পূরণেই ক্ষুদ্র আঙ্গিকে প্রতিষ্ঠিত “Stura IT”। প্রতিষ্ঠানটি স্কুল পড়ুয়াদের কম্পিউটার বেসিক কোর্স ডেটাবেজ ম্যানেজমেন্টসহ প্রাথমিক পর্যায়ের যেমন- অফিস এপ্লিকেশন কোর্স প্রদান করে থাকেন। পাশাপাশি পেশাদার উচ্চতর কোর্স যেমন- ওয়েব ডিজাইন, গ্রাফিক্স ডিজাইন, হার্ডওয়্যার ও সফটওয়ার ইত্যাদি সেবায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
এছাড়াও Stura IT নামকরণ সম্পর্কে তিনি আরও বলেন, গারো পুরাণে, তাতারা রাবুগা হলেন নকগিপা অর্থাৎ সৃষ্টিকর্তা। শতাধিক নামে তিনি আরাধ্য হন। স্তুরা পান্তুরা (জীবনের একমাত্র বন্ধন ও সংযোগ), দাকগিপা রুগিপা (স্রষ্টা ও রূপকার), সুলগিপা ইমবিংগিপা (প্রান্ত বা কোণের নির্ণয় ও সুষমামন্ডিতকারী), জাংগিনি নকি গিপা (জীবনের অধীশ্বর), জামানি বিয়াম্বি (মানব জীবনের একমাত্র নিগূঢ় রহস্য) প্রভৃতি তাঁর আরাধ্য নাম। কোথাওবা তিনি নারী দেবীরূপে পূজিতা। সেই অর্থে তিনি প্রকৃতির গর্ভাশয়, সর্বোচ্চ অদ্বৈত শক্তি এবং সমস্ত কিছুর আদি। নকগিপার আলংকারিক নাম স্তুরা পান্তুরা (জীবনের একমাত্র বন্ধন ও সংযোগ) অনুসারেই প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা হয়েছে “স্তুরা আইটি”। ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের সহযাত্রীরূপে ছোট্ট পদক্ষেপ “স্তুরা আইটি “। প্রত্যন্ত অঞ্চলে তথ্যপ্রযুক্তি বঞ্চিত জাতিগোষ্ঠীদের জন্য অগ্নিছোঁয়া পৌঁছে দিতে আমরা দৃঢ়প্রত্যয়ী।
এক কথায় চমৎকার। আইটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি আপনার সেবায় বিশ্বস্ত এক নাম ও প্রতিষ্ঠান “স্তুরা আইটি” শ্লোগানে যাত্রা শুরু হলো মধুপুরের জলই নামক শালবনের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে। গারো তরুণ উদ্যোক্তার বিশ্বাস একদিন পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠি সমান তালে এগিয়ে যাবে পড়াশুনার পাশাপাশি আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তিতেও। প্রতিষ্ঠানটি পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে আইটি ক্যারিয়ার গড়তে অঙ্গীকারবদ্ধ বলে জানান।