গারোদের মৃত সৎকার করার পদ্ধতিকে বলা হয় মি.মাং খাম। মি.মাং শব্দের অর্থ মৃত আত্মা এবং খাম বা গাম এর অর্থ কাজ বা আচার। মৃত ব্যক্তির উদ্দেশে শ্রাদ্ধ দানের মাধ্যমে এ মি.মাং খাম-এর পরিসমাপ্তি ঘটে।
গারোরা সাংসারেক ধর্মালম্বী হিসাবে মৃত সৎকার করা হয় শ্মশানে দাহ করার মাধ্যমে। এটাই তাদের প্রচলিত রীতি। তবে কোন আত্মহত্যা এবং বিভিন্ন মারাত্মক ব্যাধি যেমন- কুষ্ঠ, যক্ষা, কলেরা, কালাজ্বর, বসন্ত ইত্যাদির কারণে কেউ মারা গেলে দাহ করা না গেলে লাশটিকে মাটিতে দাফন করার প্রচলনও ছিলো। অথবা জীবিতকালে অনেকেই তার নিজের সৎকার কিভাবে হবে, তা বলে দিয়ে যান। তাই মৃতের ইচ্ছানুসারে দাহ অথবা কবর দেওয়া হতো।
বিষয়টি গারোদের বিশ্বাস, আত্মা অবিনশ্বর, মানুষের আত্মার পুনর্জন্ম হবে। তাই পাপাত্মার স্থান শয়তান বা হিংস্র পশুপাখি হয়ে জন্ম নেবে; আর পুণ্যাত্মার জন্ম হবে ভালো মানুষের গর্ভে। তাই দাহ বা দাফনকালীন সময়ে মৃত ব্যক্তির প্রতি আচার পালন করা হয়, তা ঐ মৃত আত্মার কল্যাণ বা মঙ্গল কামনায়।
গারোদের মি.মাং খাম বা মৃত সৎকার দুটি ভাগে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। একটি হলো মৃত্যুর পূর্বে এবং আরেকটি হলো মৃত্যুর পরবর্তীতে। কারোর মৃত্যুর সম্ভাবনার দেখা যাওয়ার সাথে সাথে নিকটতম আত্মীয় (চ্রা, মানক)-দের দ্রুত সংবাদ প্রেরণ করতে হবে। যাতে মৃত্যুপথযাত্রী এবং তার আপনজন উভয়ই পরস্পরকে বিদায় ও আশীর্বাদ জানাতে পারে, সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করতে পারে। তখন অনেকেই মৃত্যুপথযাত্রীকে চা.চত্তা বা শেষবারের মতো খাওয়ানোর জন্য মাংস দিয়ে খাবার, চু-বিচ্চি এবং কাফনের সাদা কাপড় নিয়ে আসেন। তারপর মৃত্যুর আগপর্যন্ত সকলে মিলে সেবা এবং পাহারা দিয়ে থাকেন। ঠিক এমনই আরও অনেক পদ্ধতি গারো মৃত সৎকারে রয়েছে যা প্রাচীন ঐতিহ্যের নিজস্বতায় উঁচু মানের। তার মধ্যে যেমন, ‘খিম্মা সঙা’ পদ্ধতি বা ঐতিহ্য।
সাধারণত মৃতশয্যার পাশে একক অথবা দলীয় ভাবে মৃতলোকের জন্য কথা ও সুরের মাধ্যমে শোক প্রকাশ করা হয়, একেই বলা গ্রাপা বা শোক গাঁথা। এই গ্রাপা বা শোক গাঁথা সৎকারের পরেও তার নিকট আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশিরাও খিম্মায় গিয়ে মৃত আত্মার স্মৃতিচারণ এবং তার আত্মার মঙ্গল প্রার্থনা করেন।
আক্ষরিক অর্থে খিম্মার মানে স্মৃতিস্তম্ভ এবং সঙার অর্থ পোতা বা গেড়ে দেওয়া। গারোরা সাংসারেক ধর্মের রীতি অনুসারে মৃতের স্মৃতি রক্ষার্থে তার আত্মীয়স্বজনেরা কাঠের খোদাই করা খুঁটি দিয়ে স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করেন, এটিকেই বলা খিম্মা সঙা। এই খিম্মা তৈরির বিশেষ পদ্ধতি রয়েছে, যেমন-
- মাথা বা আগার দিকে মানুষের মাথার মত করে বানাতে হয়
- যে কোন খিম্মার বেলায় ৫টি অথবা ৭টি তাক বা স্টেপ থাকে
- পুরুষের জন্য হলে উপর থেকে জাংখি রাখতে হয়
- মহিলার জন্য হলে নিচ থেকে জাংখি রাখতে হয়
এরপরের করণীয় হচ্ছে, এটিকে বাড়ির সামনে বা উঠানের এক কোণে খিম্মা সঙা করতে হয়। তারপর, মহিলা এবং পুরুষ অনুযায়ী খিম্মাতে বা.রাচলা (দকমান্দা/শাড়ি বা ধূতি), খুতুপ, মালা/গয়না পড়িয়ে দেওয়া হয়। মৃতের জন্য থালা-গ্লাস, বৃদ্ধবৃদ্ধা হলে তাদের লাঠি এবং তার জীবিতকালিন ব্যবহৃত দা, কুড়াল, কাস্তে, খন্তা, কোদাল, দিকথম, জান্তি এবং অন্যান্য সৌখিন দ্রব্যগুলো এবং মৃতের সৌখিন জিনিষপত্র যদি থাকে, তাহলে সেগুলোও সেখানে রাখতে হয় এবং আনুষ্ঠানিকভাবে মৃতের উদ্দেশে কলাপাতায় অল্প পরিমাণে ভাত, তরকারি, চু এবং আয়োজনের অন্যান্য চিন্না-আন্না করতে হয়।
গারোরা খ্রীষ্টান ধর্মে দীক্ষিত হবার পর থেকে গারোদের অতি প্রাচীন ঐতিহ্য খিম্মা সঙা পদ্ধতি প্রায় বিলুপ্তির পথে। বাংলাদেশে শুধুমাত্র মধুপুর অঞ্চলে খিম্মা ঐতিহ্য কিছুটা এখনো চোখে পড়ে। তথ্যসূত্র: গারো সংস্কৃতির মাধুর্য (প্রকাশিতব্য)
লুই সাংমা, ফ্রান্স
ওয়েভ ডেভেলপার, ব্লগার, আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সার এবং
সাংস্কৃতিক কর্মী, lchiran76@gmail.com