আ.বিমা টাইমস নিউজ ডেস্ক: পাহাড়ের অশান্তি এখন সারা দেশে অশান্তি সৃষ্টি করবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের ওয়াকার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন। আজ ৩১ জানুয়ারি মঙ্গলবার বিকেলে চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ চত্ত্বরে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে চুক্তি যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের দাবিতে সংহতি সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই আশঙ্কা করেন।
‘পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলন’ এর ব্যানারে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে সম্মিলিত বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তুলুন’ শ্লোগানকে সামনে রেখে আয়োজিত সমাবেশে বাংলাদেশের ওয়াকার্স পার্টির চট্টগ্রাম জেলার সাধারণ সম্পাদক শরীফ চৌহানের পরিচালনায় সভাপতিত্ব করেন কবি ও সাংবাদিক আবুল মোমেন।
শান্তি চুক্তির ২৫ বছর সমাবেশ, ছবি: অলিক মৃ
সমাবেশে প্রধান অতিথি রাশেদ খান মেনন বলেন, “দীর্ঘ লড়াই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এই শান্তি প্রক্রিয়া আমরা শুরু করতে সক্ষম হয়েছিলাম। কিন্তু আজ আমি উদ্বিগ্ন। এই পাহাড় এখন অশান্ত। শুধু তাই নয় পাহাড়ের অশান্তিকে ঘিরে এই চট্টগ্রামে ও সারাদেশে অশান্তি সৃষ্টির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আপনারা দেখেছেন, গত কয়েকমাস ধরে ওই পার্বত্য চট্টগ্রামে একটি সংগঠনের সাথে যুক্ত হয়ে জঙ্গী মৌলবাদীরা সেখানে সশস্ত্র ট্রেনিং নিচ্ছে দেশের অভ্যন্তরে হামলা চালানোর জন্য। সংবাদপত্রের মারফতে জানলাম, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে যুবকদের এনে ট্রেনিং দিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে জঙ্গি হামলার পরিকল্পনা তারা করেছিল। তাদের টার্গেট ছিল কাশিমপুর জেল। কারণ সেখানে জঙ্গিরা রয়েছে। অর্থাৎ পাহাড়ের অশান্তি এখন সারাদেশের অশান্তি।”
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পার্বত্য শান্তি চুক্তির ফলে ইউনেসকো শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন। আশা ছিল এই চুক্তি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় উদাহরণ সৃষ্টি করবে। কিন্তু তা হয়নি বলে হতাশা ব্যক্ত করেন। বহুবার সংসদে সরকারের কাছে পার্বত্য ভূমি কমিশন আইন প্রণয়ন করার জন্য আবেদন করলেও বারবার তারা আমলাদের কাছ থেকে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, “শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছিল ভূমি কমিশন আইন করতে। ৩০ হাজার আবেদন পড়েছে ভূমি কমিশনে, একটিও নিষ্পত্তি করা হয়নি। তাহলে যে আইনে যে সমস্যার সমাধানের কথা ছিল তা আমরা করছি না।”
শান্তি চুক্তির ২৫ বছর সমাবেশ, ছবি: অলিক মৃ
রাশেদ খান মেনন আরো বলেন, “জিয়াউর রহমান পার্বত্য সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে সামরিক বাহিনীর সহযোগিতা নেয় এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে তারা সেদিন সাধারণ নিরীহ মানুষকে এনে অভিবাসী বানিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসিয়ে দিয়েছিল। এ ঘটনার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের অভ্যন্তরণে কয়েক হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিল। শান্তি চুক্তিতে তাদের পুনর্বাসনের কথা ছিল। তা দূরে থাক আজ এ বিষয় নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে গিয়ে কথা বলতে পারবেন না। আজকে পাহাড়ে আমরা দেখি অলিখিত সামরিক শাসন। সেখানে শুধু সেনাবাহিনী নয়, এপিবিএন, নতুনভাবে পুলিশের ক্যাম্প করা হচ্ছে। এই পাহাড়া দেশের এক দশমাংশ। একদিন খালেদা জিয়া বলেছিল, চুক্তি করে এক দশমাংশ শেখ হাসিনা ভারতের হাতে তুলে দিবে। ৩০ বছর হয়েছে তা হয়নি। আজ যদি সরকারও একই যুক্তি দেয়, একই ধরণের বিচ্ছিন্নতার কথা বলেন, তাহলে পাহাড়ে কখনো শান্তি আসবে না। শুধু পাহাড়ের মানুষ নয় মূল স্রোতের সব মানুষকে এ দাবিতে এক হতে হবে। পাহাড়ি বাঙালি মিলে চুক্তি বাস্তবায়নে সরকারকে বাধ্য করবো। এটা আমাদের দায়িত্ব।”
সভাপতির বক্তব্যে কবি ও সাংবাদিক আবুল মোমেন বলেন, “মূলধারার জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ, সমর্থন, সক্রিয় ভূমিকা ছাড়া এ সমস্যার সমাধান সহজে হবেনা। দেশের বড় রাজনৈতিক দলগুলো এ প্রশ্নে নিরব।” তিনি উল্লেখ করেন, শুধু পাহাড়ে নয়, সমতলেও আদিবাসী গোষ্ঠী তাদের ভূমি হারাচ্ছে। বড় দলগুলোর এসব প্রশ্নে ভূমিকা দেখা যায়না।তারা শুধু ক্ষমতা রক্ষা ও দখলের লড়াইয়ে ব্যস্ত আছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, “পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ায় পাহাড়ে নতুন জটিলতার উদ্ভব হচ্ছে। পাহাড়ে শুধু পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ের বিষয় ছিল। অথচ সেখানে এখন জঙ্গীবাদী গোষ্ঠী যাদের বিভিন্ন এজেন্ডা আছে তাদের উপস্থিতিও দেখছি। যদি একটি অঞ্চলকে আমরা অশান্ত রাখি এবং স্বাভাবিক জীবনকে বানচাল করে রাখি সেই অঞ্চল অস্থিতিশীল হতে বাধ্য। আর অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সুযোগ যারা গ্রহণ করে তারা সেই অবস্থার সুযোগ নিতে পিছ পা হয় না। বাংলাদেশে নানা বিষয় নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে রাখা হয়। আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে ‘আদিবাসী’, না ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ বলব এরকম নানা বিভ্রান্তির মধ্যে রেখে দিয়েছে। চুক্তি কার সাথে কার হয়েছিল সেখানেও ফাঁক রাখা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের স্বাভাবিক জীবন ও ভূমি অধিকার ফিরিয়ে দেয়ার জন্য পার্বত্য জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন সংগঠন, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং বাম প্রগতিশীল শক্তিকে নিয়ে নতুন করে কথা বলে সমস্যার সমাধানের পথ সরকারকেই বের করতে হবে বলে মন্তব্য করেন।
সিপিবি সভাপতি কমরেড শাহ আলম বলেন, “পার্বত্য শান্তি চুক্তির ২৫ বছর হয়ে গেল। এখনো সেটি বাস্তবায়ন হয়নি। যে সরকার এই চুক্তি করেছে সে সরকার আজ ১৪ বছর ক্ষমতায়। তারা বাস্তবায়ন করছে না কেন? তাহলে সরকারের মধ্যে অন্য কোনো সরকার আছে কিনা? তারা কী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চেয়েও বড়? না হলে কেন চুক্তি বাস্তবায়ন করতে পারছে না?”
তিনি বলেন, “চুক্তির সময় বিএনপি লং মার্চ করে বলেছিল, শান্তি চুক্তি করলে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে ফেনী পর্যন্ত ভারত হয়ে যাবে। তা এখনো বাংলাদেশেই আছে। ভারত হয়নি। এটি একটি জিওপলিটিক্সের এলাকা। রাঙামাটির সাথে ভারতের যেমন সীমানা আছে, মিয়ানমারেরও আছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম অশান্ত রাখলে নানা বিদেশি শক্তি এদের নিয়ে খেলবে। বাংলাদেশে শান্তি আসবে না। নানা রকম যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি হবার আশঙ্কা আছে। এটি সরকারকে ভাবতে হবে।” তিনি পাহাড়িদের উদ্দেশ্য করে বলেন, “চুক্তির সময় আপনারা এক ছিলেন। এখন নানা রকম বিভক্তি। রক্তক্ষয়ী অন্তর্ঘাত থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। হয়ত বাইরের শক্তি সেখানে হাত ঢুকিয়েছে। পাহাড়িদের ঐক্য আবার গড়ে তুলতে হবে। পাহাড়ি ও বাঙালির ঐক্য গড়ে তুলতে হবে।” সরকারকে এই ভূরাজনৈতিক খেলা থেকে বের হয়ে এসে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় অবিলম্বে চুক্তি বাস্তবায়ন করার আহবান জানান তিনি।
সমাবেশে আরো বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল(বাসদ) এর সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ সদস্য সৌখিন চাকমা, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) এর কেন্দ্রীয় নেতা জসিম উদ্দিন বাবুল, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের যুগ্ম সমন্বয়কারী জাকির হোসেন, এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, ঐক্য ন্যাপের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হারুন রশিদ ভুঁইয়া, ন্যাপ কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মিঠুল দাশগুপ্ত, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের প্রতিনিধি অলিক মৃ, পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি সুমন মারমা প্রমুখ।