শিশু বিষয়ক উইকিপিডিয়ার তথ্য মতে, শিশুর ইংরেজি শব্দ Child। ভূমিষ্ঠকালীন ব্যক্তির প্রাথমিক রূপ যে এখনও যৌবনপ্রাপ্ত হয় নাই কিংবা বয়ঃসন্ধিক্ষণে প্রবেশ করে নি সে শিশু হিসেবে সমাজ কিংবা রাষ্ট্রে চিহ্নিত হয়ে থাকে। সাধারণত যে সন্তানের বয়স ১৮ বছরের নিচে অবস্থান করছে সে শিশু হিসেবে চিহ্নিত। কখনো কখনো অনাগত সন্তান অর্থাৎ যে সন্তান এখনো ভূমিষ্ঠ হয় নাই বা মায়ের গর্ভে অবস্থান করছে সেও শিশুরূপে পরিগণিত হয়ে থাকে। একজন ব্যক্তি তার পিতা-মাতার কাছে সবসময়ই সন্তান বা শিশু হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকেন। তবে, নির্দিষ্ট সময়, স্থান অথবা ঘটনার প্রেক্ষিতে শিশুসুলভ আচরণ বা ষাট বছরের শিশু শব্দগুচ্ছেরও প্রয়োগ হয়ে থাকে। জীববিজ্ঞানের ভাষায়- মনুষ্য সন্তানের জন্ম এবং বয়ঃসন্ধির মধ্যবর্তী পর্যায়ের রূপ হচ্ছে শিশু। চিকিৎসাশাস্ত্রের সংজ্ঞানুযায়ী মায়ের মাতৃগর্ভে ভ্রুণ আকারে অ-ভূমিষ্ঠ সন্তানই শিশু।

শিশু আইন, শিশু অধিকারের ওপর তোয়াক্কা না করে শিশু সন্তান বা অপ্রাপ্ত বয়সের শিশুদের আজকে দেশে শিশুশ্রমে বাধ্য করছি এটা ওপেন সিক্রেট। বাধ্য করছি শিশুদের রাজনৈতিকসহ নানা অনৈতিক কাজে, উদ্দেশ্যপ্রনোদিতভাবে ব্যবহার করতে। এহেন প্রশ্ন থেকে যায়- তাহলে আমরা সভ্য, আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় শিশু আইন এবং শিশু অধিকারকে কতটুকু গুরুত্ব দিয়ে থাকি?

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ময়দানে শিশু বা অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের ব্যবহার নতুন নয়। এ মূহুর্তে বাংলাদেশে ইন্টারনেট জগতে ‘শিশু বক্তা’ হিসেবে পরিচিত রফিকুল ইসলাম বহুল আলোচিত সমালোচিত একটি নাম। অনেকের কাছে তিনি রফিকুল ইসলাম মাদানী নামে পরিচিত। কিন্ত প্রশ্ন জাগে, আদৌ কি এই শিশু বক্তা রফিকুল ইসলাম সত্যি সত্যিই শিশু? কেউ যদি শিশু সুলভ কথা বার্তা, কিংবা বাহ্যিক আকার আকৃতি দেখতে শিশুর মতোন হলেই কি তাকে শিশু বলা যায়? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাদের আরও গভীরে যেতে হবে।

আপনি দেখবেন, গত ২৫শে মার্চ ঢাকায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সফর বিরোধী মিছিলের সময় মতিঝিল এলাকা থেকে প্রথম আটক হন রফিকুল ইসলাম। তাকে কয়েক ঘন্টা আটক রেখে আবার ছেড়ে দেয় পুলিশ। সর্বশেষ গত বুধবার তাকে আবারো আটক করেছে দেশের র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বা র‌্যাব। আরও জানা যায়, আটকের পরে তার বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা দায়ের করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। র‌্যাবের ভাষ্য মতে, তাকে ‘রাষ্ট্র বিরোধী ও উস্কানিমূলক’ বক্তব্য দেয়ার অভিযোগে নেত্রকোনা থেকে আটক করা হয়েছে।

নিজেকে প্রশ্ন করুন, তাহলে কে এই শিশু বক্তা রফিকুল ইসলাম? সোস্যাল মিডিয়া মারফতে ফেসবুক ও ইউটিউবে রফিকুল ইসলামের যেসব ছবি ও ভিডিওগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তার কণ্ঠ, শারীরিক গঠন ও মুখাবয়বের কারণে তাকে কম বয়েসী ছেলেদের মতোন মনে হলেও তার ঘনিষ্ঠজনদের দেয়া তথ্য মতে তিনি ১৯৯৪ সালে নেত্রকোনা জেলার পূর্বধলা উপজেলায় জন্ম। সে হিসেবে তার বর্তমান বয়স ২৭ বছর। এই তথ্যানুসারে শিশু বক্তা রফিকুল ইসলামের বয়স যদি ২৭ হলে তাকে কি শিশু বলা যায়?

শিশু বক্তা রফিকুল ইসলামের বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করলে তার বক্তব্য কিংবা বত্তৃতায় যা প্রতীয়মান হয় চেহেরা, গঠন এবং মুখাবয়ব  শিশু মনে হলেও তিনি যেভাবে আঙ্গুল নাড়িয়ে বচন শুরু করেন, পেশাদার বাচন ভঙ্গিমা বা উচ্চস্বরে কথা বললেও সেখানে তার আদর্শিক বৈশিষ্ট্য, সাধারণ শিষ্টাচার, লোকাচারগুলো একেবারে অনুপস্থিত। ধর্মীয়ভাবে ধর্ম প্রধান, তেমনি রাষ্ট্রীয়ভাবে দেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীকে আমাদের যে আর্দশগত, অনুগত, অবনমিত হওয়ার মতোন বিষয়গুলো থাকে এবং তা অনুসরণ করতে হয় সেটিও অনুপস্থিত।

যদি তাই হয়, তাহলে এর নেপথ্যে কে বা কারা ? কার রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে মাঠে নেমেছে এই শিশু বক্তা রফিকুল? কেইবা প্রণোদনা দিচ্ছে শিশুকে বাঘের গর্জন দিতে? যেকোন রাজনৈতিক ইস্যূতে শিশু নয়, অথচ শিশুতুল্য মনে করে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার অভিপ্রায় কারাইবা এমন মদদ দেয় এমন নিষ্পাপ শিশুকে?

ধরে নিলাম শিশু বক্তা রফিকুল ইসলাম তিনি শিশু। কোন শিশু কি আদৌ এভাবে মঞ্চে প্রাজ্ঞ বিজ্ঞসুলভে কথা বলতে পারে? যদিওবা সে প্রাজ্ঞদের মতোন কথা বলার চেষ্টা করছে, তথাপিও সেখানে কোন দল বা গোষ্ঠীর এজেন্ডা বাস্তবায়নে সে মাঠে নেমেছেন সেটা সহজে অনুমেয়। ধর্মীয় লেবাসে যে বা যারা শিশুদের ব্যক্তি কিংবা রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার লক্ষে ব্যবহার করে, যার কথায় হাজার হাজার অনুসারি যুদ্ধার বেশে রাস্তায় নামতে পারে, তার মানে কি দাঁড়ায় আমাদের রাষ্ট্র নেতারা তা অবশ্যই তা বুঝতে পারে !

কথায় আছে, আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। রাজনীতি বা রাষ্ট্রনীততে আজকের শিশুকে যদি সঠিকরুপে তৈরি করতে না পারি, সুজাতি হিসেবে উপহার না দিতে পারি; তাহলে আগামী দিনের শিশু এবং পরবর্তী প্রজন্মদের জন্যে কি ভয়াবহ অন্ধকার অপেক্ষা করছে! শুধু আমাকেই ভাবাচ্ছে তা নয় ; এমন কর্মকাণ্ডে দেশের সুশীল সমাজ, রাষ্ট্রপ্রধানদের নিশ্চয়ই ভাবিয়ে তুলছেন!

লুই সাংমা, ফ্রান্স
ওয়েভ ডেভেলপার, ব্লগার, আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সার এবং
সাংস্কৃতিক কর্মী।