সুপ্রিয় পাঠক, লেখাটি ফাদারের যাজকীয় জীবনের ৬০ বছর জুবিলী উৎসব পালনের প্রাক্কালে অর্থাৎ ২০১৫ তে সাক্ষাৎকারটি নেয়া এবং প্রয়াণে তাঁকে স্বরণার্থে লেখাটি পুন:রায় ছাপা হলো।

শ্রদ্ধেয় ফাঃ ইউজিন ই. হোমরিক সিএসসি-র সংক্ষিপ্ত জীবনী

১৯২৮ খ্রীষ্টাব্দের ৮ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্টের মিশিগান প্রভিন্সের মুসকিগন (Mercy Hospital in Muskegon, Michigan, USA) নামক স্থানে শ্রদ্ধেয় ফাদার ইউজিন ই. হোমরিক সিএসসি-র জন্ম হয়। জার্মান এবং ফ্রেঞ্চ ভাষায় পারদর্শী তাঁর পিতা স্বর্গীয় বার্নার্ড হোমরিক ছিলেন মিশিগানের বড় একটা ফার্মের মালিক এবং মায়ের নাম স্বর্গীয়া ইলা হোমরিক, গৃহিণী। ৪ ভাই এবং ২ বোনের মধ্যে যথাক্রমেবা স্বর্গীয় বার্নার্ড হোমরিক (মৃত), স্বর্গীয় রবার্ট হোমরিক, ডমিনিকান সিস্টার রোজমেরি (নার্স মিডওয়াইফ), ফাঃ ইউজিন হোমরিক, স্বর্গীয় যোসেফ হোমরিক এবং প্যাট্রিসিয়া হোমরিক (নার্স); এদের মধ্যে ফাদার ইউজিন ই. হোমরিক সিএসসি চতুর্থ সন্তান।

শিক্ষা জীবন- পারিবারিকভাবে সুন্দর পরিবেশে বড় হওয়ায় শ্রদ্ধেয় ফাদার ইউজিন ই. হোমরিক সিএসসি ছোটবেলাথেকেই ছিলেন অত্যন্ত সহজ সরল অথচ বুদ্ধির দিক দিয়ে অত্যন্ত মেধাবী। বিদ্যালয়ের সকল পরীক্ষায় গড়ে ৮৫%+ নম্বর পেয়ে তিনি তুখোর মেধাবী হিসাবে পরিচয় দিয়েছেন। ফাদার ইউজিন ই. হোমরিক সিএসসি কিশোরবেলাতেই মেধাবী ছাত্র, ইতিবাচক মনোভাব, ধর্মীয়কাজে স্বতঃস্ফুর্ত অংশগ্রহণ এবং শৃংখলাপূর্ণ জীবন যাপনের জন্য নিজ এলাকায় এবং বিদ্যালয়ে তিনি সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সমর্থ হয়েছিলেন। সেসময়েই গ্র্যাণ্ডরেপিডসের ডমিনিকান সিস্টারদের চালচলন এবং তাঁদের কর্মকাণ্ড দেখে ব্রতজীবন ফাঃ হোমরিক নিজেও ব্রতজীবনে আসার আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন। তিনি যথাক্রমে নটরডেম ইউনিভার্সিটি (মিশিগান, যুক্তরাষ্ট্র) এবং মেরিনল কলেজ (নিউইয়র্ক)-থেকে ডাবল এমএ করেছেন।

পৌরোহিত্য অভিষেক ও ধর্মীয় কাজে অবদান- শ্রদ্ধেয় ফাদার ইউজিন ই. হোমরিক সিএসসি নিজ শহরের (মিশিগানের মুসকিগন) সেন্ট যোসেফ স্কুলে অষ্টম শ্রেণী সমাপ্ত করে ১৯৪২ খ্রীষ্টাব্দে মাত্র ১৪ বছর বয়সে নটরডেম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে অবস্থিত পবিত্র ক্রুশ সেমিনারিতে যোগ দেন। সেমিনারীতে অনেক বিদেশি সেমিনারীয়ানদের সাথে থেকে তাঁদের ভাষা এবং সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার সুযোগ পেয়েছেন। সেমিনারীয়ানদের সেই দলে একজন বাংলাদেশীও ছিলেন বলে তিনি বাংলাভাষার প্রতি আকর্ষণ বোধ করেন এবং তখনই বাংলাভাষা কিছু কিছু শিখতে থাকেন।

১৯৪৭ খ্রীষ্টাব্দের ১৬ আগষ্ট ওয়াশিংটন ডিসিতে চার বছর ঐশতত্ত্ব অধ্যয়ন শেষে মাত্র ১৯ বছর বয়সে তিনি প্রথম ব্রত গ্রহন করেন। তারপর ১৯৫৫ খ্রীষ্টাব্দের ৮ জুন তারিখে ২৭ বছর বয়সে তিনি যাজক পদে অভিষিক্ত হয়েছেন এবং এর এক বছর পরই মিশনারি কাজ করার জন্য সোজা চলে আসেন ঢাকায়। ঢাকার নটরডেম কলেজে মিয়া মোহাম্মদ আব্দুল হামিদ-এর তত্ত্বাবধানে এক বছর বাংলাভাষা শিক্ষা লাভ করেন এবং ১৯৫৬ হতে ১৯৫৯ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত গোল্লা ধর্মপল্লিতে ফাদার ডমিনিক ডি রোজারিও, সিএসসি-এর সাথে সহকারী পালক পুরোহিত হিসাবে কাজ শুরু করেন। এরপর বিড়ইডাকুনি ধর্মপল্লীতে বদলী হয়ে সেখানে নয় মাস থাকার পর ১৯৬০ খ্রীষ্টাব্দে জলছত্র উপধর্মপ্ললীতে চলে আসেন। সেসময় জলছত্র উপধর্মপ্ললীতে ছিলেন ফাদার স্টিফান ডায়াস। তখন ময়মনসিংহ ধর্মপল্লী হতে জলছত্রকে আলাদা ধর্মপল্লী হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার কাজ চলতে থাকে। একবছর পর ১৯৬১ খ্রীষ্টাব্দে ফাদার ইউজিন ই. হোমরিক সিএসসি-কে জলছত্র ধর্মপল্লির প্রথম পালক পুরোহিত হিসাবে দায়িত্ব অর্পন করা হয়। সর্বশেষ ১৯৯২ খ্রীষ্টাব্দে তৎকালীন পীরগাছা উপধর্মপল্লিকে পুনর্গঠন করার জন্য চলে আসেন এবং অদ্যাবধি তিনি পীরগাছা ধর্মপল্লীর পালক পুরোহিত হিসেবে কাজ করছেন।

এ বছর তার যাজকীয় জীবনের ৬০ বছর জুবিলী উৎসব পালন করা হচ্ছে। এই জুবিলী উৎসব উপলক্ষে ফাদার হোমরিক সিএসসি-র একটি সাক্ষাৎকার নিম্নে দেওয়া হল-

প্রশ্নঃ আপনার পুরোহিত জীবনের ৬০ বছর জুবিলী উপলক্ষে আপনার অনুভূতি কেমন?

উত্তরঃ আমি এমন এক জায়গায় এবং অনেক ভালো মানুষের মাঝে ঈশ্বরের জন্যে কাজ করছি যে, আমার পৌরোহিত্য জীবনের ৬০ বছর কিভাবে পার করেছি, তা টেরই পেলাম না। তবে, আমি এখন শারীরিক ভাবে কিছুটা অসুস্থ এবং ক্লান্ত। আমার প্রিয় মান্দিরা স্বেচ্ছাপ্রণোদিতভাবে আমাকে নিয়ে, আমার জন্য অনুষ্ঠান করে এবং আমার অনুষ্ঠানের জন্যে টাকা ব্যয় করে আনন্দ করতে চায়। যদিও আমি তা কখনোই চাই না, তবে তাঁদের এই সরল, সুন্দর কাজে আমি অনেক আনন্দ পাই, আমাকে মুগ্ধ করে। আমি সকল মান্দি খ্রীষ্টভক্তদের ধন্যবাদ জানাই।

প্রশ্নঃ আপনার প্রৈরিতিক জীবনে আসার ক্ষেত্রে কার অবদান বেশি? কে বা কারা আপনাকে অনুপ্রাণিত করেছেন? কিভাবে?

উত্তরঃ আমাদের পারিবারিক পরিবেশ অত্যন্ত সুন্দর ছিল। সর্বপ্রথম পারিবারিকভাবে সকলের ধর্মের প্রতি অনুগত এবং বিশেষ করে আমার বাবা, মা, ভাইবোনদের প্রেরণায় আমার যীশুর পক্ষে কাজ করার ইচ্ছা জাগে। ছাত্রজীবনেই গ্র্যাণ্ডরেপিডসের ডমিনিকান সিস্টারদের চালচলন এবং তাঁদের কর্মকাণ্ড দেখে আমার খুব ভালো লাগতো। তাঁরাও আমাকে ব্রতজীবনে আসার জন্যে অনুপ্রাণিত এবং সাহায্য করেছেন। আমার একবোন ডমিনিকান সিস্টার; সেও আমাকে ব্রতজীবনে আসার জন্য অনেকভাবে উদ্বুদ্ধ করেছে।

প্রশ্নঃ আপনার জানামতে বাংলাদেশে মান্দি ফাদার সিস্টারদের সংখ্যা কত? মান্দিদের পৌরহিত্য জীবনে আসার এই সংখ্যাকে সন্তোষজনক মনে করেন কি?

উত্তরঃ এ মূহুর্তে আমি মনে করতে পারবো না, তবে অনেক আছে। ক্যাথলিকদের মধ্যেই বিভিন্ন সম্প্রদায়ে ফাদার, ব্রাদার, সিস্টার ছাড়াও ইণ্ডিয়া এবং বাংলাদেশে এখন মান্দি বিশপ আছে। বর্তমানে ৩০ জন মান্দি ছেলে ব্রাদারহুড লাইফের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। সিস্টার লাইনেও অনেক মেয়ে আছে। ভারত এবং বাংলাদেশেও এখন মান্দি বিশপ রয়েছে। অনেকে ফাদার, ব্রাদার, সিস্টার হয়ে বিদেশেও কাজ করছে- এটা ঈশ্বরের বিশেষ আশীর্বাদ। মান্দিদের যে ঐশ্বরিক গুণ রয়েছে, তাতে আরও যদি কেউ প্রচারের কাজে এগিয়ে আসে, তবে খ্রীষ্টকে আলোতে প্রকাশ করার জন্য খুবই উপকার হয়।

প্রশ্নঃ আপনার প্রৈরিতিক জীবনের অধিকাংশ সময় মান্দিদের মাঝে বাণী প্রচারের কাজ করেছেন। সামাজিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে আমাদের অতীত এবং বর্তমান অবস্থার কথা কিছু বলুন।

উত্তরঃ আমি যখন এই এলাকায় প্রথম আসলাম, এখানে মাত্র ১৫০০ খ্রীষ্টান পেয়েছি। আর বাকী সব মান্দি সাংসারেক ছিলো। তারা দালগুবা মিদ্দি, সালজং মিদ্দিকে আমুয়া করতো, কবিরাজের চিকিৎসার উপরে তাঁদের জীবন নির্ভর করতো। লেখাপড়া কি জিনিষ বুঝতো না, বুঝতেও চাইতো না। অনেক চেষ্টা করেও অক্সফোর্ড এবং ব্যাপটিস্ট মিশনারিরা এলাকায় বিদ্যালয় চালাতে পারে নায়। এখন জলছত্র, এবং পীরগাছায় মান্দিদের জন্য ভালো ২টি উচ্চবিদ্যালয়, ২টি ছেলে হোস্টেল, ২টি মেয়ে হোস্টেল এবং ৩৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয় চলছে। আগে দরগাচালা উপধর্মপ্ললীও আমাদের আণ্ডারে ছিলো, এখন সেটিও আলাদা ধর্মপল্লী হয়ে সেখানেও একটি জুনিয়র স্কুল, ২টি প্রাইমারী স্কুল চলছে। তাতে ঈশ্বরের বিশেষ কৃপায় এলাকার মানুষ শিক্ষার সুফল লাভ করছে। এখন আবিমায় প্রায় ১৭৫০০জন ক্যাথলিক রয়েছে। মান্দিদের মধ্যে প্রটেষ্টান্ট রয়েছে প্রায় ৩০০০জন।

প্রশ্নঃ আপনি বেশীরভাগ সময় মান্দিদের জন্য কাজ করেছেন এবং এখনও পর্যন্ত ক্লান্তিহীন কাজ করে যাচ্ছেন। এখানকার মান্দিরা আপনাকে মন্ত্রমুগ্ধের মতো ভালোবাসে, অনুস্মরণ করে থাকে। এবার আপনিও বলুন মান্দিদের কোন দিকটি আপনাকে বেশী আকর্ষণ করেছে?

উত্তরঃ ঈশ্বরতো একটাই। মান্দি সাংসারেকদের নকগুবা (সৃষ্টিকর্তা) এবং খ্রীষ্টানদের ঈশ্বরের তফাৎ আমি করি না। আমি পাস্টর; আমি মনে করি, মান্দিরা যীশুর আদর্শকে ভালোবাসতে পেরেছে এবং আমি যীশুর আদর্শ প্রচার করি বলে; প্রচারক হিসাবে আমাকে তারা ভালোবাসে, সম্মান করে। আমি মান্দিদের সমাজকে, সংস্কৃতিকে, তাদের ইচ্ছা-আগ্রহকে খুব কাছথেকে দেখেছি, অনুভব করেছি এবং গভীরভাবে উপলব্ধি করেছি। তাই মান্দিদের চাহিদা, উপযোগী করে খ্রীষ্টকে প্রচার করি। একারণে মান্দিরা খুবই দ্রুত খ্রীষ্টকে গ্রহণ করেছে। মান্দি জাতির বৈশিষ্ট্য, তাঁদের মূল্যবোধ আমাকে বরাবরই মুগ্ধ করে। মান্দিরা মিথ্যা কথা বলে না, চুরি করে না, ব্যভিচার করে না। যদিও বাঙ্গালীদের কাছথেকে এখন কিছু কিছু শিখছে- এটা উচিৎ না। আমরা মান্দি এবং খ্রীষ্টান- এটা আমাদের মনে রাখতে হবে।

প্রশ্নঃ মান্দি জাতি বা সমাজকে টিকিয়ে রাখতে সামাজিক কোন বিষয় (আইনও হতে পারে)-টিকে গুরুত্ব দিবেন? অথবা কি করা উচিত?

উত্তরঃ শিক্ষা, চাকরী এবং সঞ্চয় এবং ভবিষ্যতের জন্য সুস্থ্য সুন্দর পরিকল্পনা। সমাজকে উন্নয়ন করতে হলে, সমাজের জন্য কাজ করতে হলে প্রচুর জ্ঞান থাকতে হয়। আমি জেনেছি এ ছাড়া আমাদের উন্নয়ন সম্ভব হবে না। আমি যখন ছুটিতে দেশে যেতাম তখন কোন না কোন বিষয়ে পড়াশুনা করেছি, প্রশিক্ষণ নিয়েছি। আমেরিকার ফ্লোরিডায় CUNA University এবং বলডুইন কলেজ ‘Integral Human Development’ অর্থাৎ সমন্বিত মানব উন্নয়ন বিষয়ে পড়াশুনা করেছি। আমার এই জ্ঞান এবং বাস্তব অভিজ্ঞতাগুলো প্রয়োগ করতে চেষ্টা করেছি। তাতে আমার বিশ্বাস, মান্দিদের অতীতের জীবনাচরণ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং আধ্যাত্মিকতার ধ্যান ধারণার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। এভাবে সামনে এগোতে পারলে আমার বিশ্বাস মান্দি নেতারা জাতিকে উন্নত জীবনে আনতে সহায়তা করতে পারে।

প্রশ্নঃ আধুনিক যুগে গারো আইনকে কিভাবে মূল্যায়ন করেন? আমরা মাঝে মাঝে শুনি, আজকালকার যুবকেরা গারো আইনকে সংশোধন বা পরিবর্তন করার প্রয়োজন মনে করছেন, আপনার অভিমত কি?

উত্তরঃ মান্দিদের মাতৃতান্ত্রিক আইনের কারণে একটি আদর্শ জাতি হিসাবে প্রতিষ্ঠা পেতে পারে। কারণ এ আইনে মান্দিরা নারী পুরুষ সকলেই পরস্পরকে সম্মান করে, ভালোবাসে। মান্দি সমাজের মেয়েরা পুরুষতান্ত্রিক সমাজের মতো অত্যাচারিত হয় না, শোষিত হয় না- যেটা পৃথিবীর মাঝে খুবই বিরল। এছাড়াও মান্দিদের আইনগুলো খুবই চমৎকার এবং খুবই কড়া। মান্দিদের আইন দিয়ে শাসন হয় কিন্তু শোষণ হতে দেখি না। তাই, এটাকে সবাই শ্রদ্ধাভরে মেনে চলে। আমি অতীতে দেখেছি, মান্দিরা কেউ এই আইন অমান্য করলে তাঁরা নিজেরাই অপরাধবোধে ভোগে এবং খুবই কষ্ট পায়, শেষে অনুশোচনা করে। সুতরাং মান্দিদের এই আইনকে কোন প্রকার পরিবর্তন করার প্রয়োজন রয়েছে বলে আমি মনে করি না। তবে, মনে রাখতে হবে- মান্দিরা এখন সবাই খ্রীষ্টান; তাই সবসময় যীশুর আদর্শকে ও আইনকে মেনে চলতে হবে এবং মান্দি আইনকেও মেনে চলতে হবে।

প্রশ্নঃ বর্তমানে মান্দিদের মধ্যে যে সংস্কৃতির চর্চা হচ্ছে, আপনি তা যথেষ্ট মনে করেন? এ ব্যাপারে ধর্মপ্রদেশগুলো কি কি ভূমিকা রাখছে বা রাখতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

উত্তরঃ হ্যাঁ, যেকোন জাতির পরিচয়ের বহিঃপ্রকাশ তার ভাষা ও সংস্কৃতি; যার সর্বক্ষেত্রে এর গুরুত্ব অপরিসীম। মান্দিদের মধ্যে খ্রীষ্টান হওয়ার পর ওয়ানগালা পালন করতো না, বলা হতো এটা সাংসারেকদের কাজ। কারণ ওয়ানগালায় মিদ্দি সালজংকে পূজা করে। এখন মান্দিরা ওয়ানগালা পালন করে এবং ওয়ানগালায় মিদ্দি সালজংএর জায়গায় সরাসরি ঈশ্বরকে আমুয়া করে। ওয়ানগালায় সবাই মিলে সুন্দর সুন্দর মান্দি নাচ, গান, সেরেনজিং, আজিয়া, রেরে, গ্রিকা, গোরিরোওয়া পরিবেশন করে, মান্দি ভাষায় গল্প বলে। এটাইতো মান্দিদের সংস্কৃতি, এটাকে আমাদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে। এছাড়াও মাণ্ডলিকভাবে আমাদের স্কুলগুলোতে প্রাইমারীতে আচিক ভাষা শেখানো হচ্ছে। আমাদের মিশনে প্রতি শুক্রবার আচিক ভাষায় গীর্জা হয়। ‘মান্দিভাষা’ খুবই চমৎকার, এটা মান্দিদের সম্পদ। বাংলাদেশে মান্দিদের ১০ প্রকার ভাষা আছে, যদিও আবিমার মান্দিরা প্রায় সবাই আবেং এবং তাদের ভাষাও আবেং। ভাষা একটা জাতিকে পরিচয় দিতে সাহায্য করে, তাই ভাষাকে কোনভাবেই হারাতে দেওয়া যাবে না। আমাদের স্কুলগুলোতে লেখাপড়ার সাথে মান্দি ভাষা, নাচ, গান, মান্দি বাদ্যযন্ত্র বাজানো ইত্যাদি আরোও বেশী করে শেখাতে হবে। আচিক মে.চিক, কারিতাস, ওয়ার্ল্ডভিশন এরাও মান্দি সংস্কৃতির লালন-পালনের জন্য সাহায্য করলে খুবই ভালো হয়।

প্রশ্নঃ আমি অনেকবার আপনার মুখে মান্দিদের প্রশংসা, তাদের মূল্যবোধের কথা বলতে শুনেছি। পালক হিসাবে এটাকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করেন?

উত্তরঃ মান্দি জাতির মুল্যবোধ খুবই পবিত্র জিনিস। আমি আগেই বলেছি, মান্দিরা মিথ্যা কথা বলে না, হিংসা করে না, চুরি করে না, ব্যভিচার করে না। যারা মান্দি জাতির সংস্পর্শে আসে নায়, তারা মান্দিদের মূল্যবোধ কতখানি গভীর ও সমৃদ্ধ। তারা কোনদিনও অনুমান ও অনুভব করতে পারবে না- মান্দিদের সততা, সরলতা, সহানুভূতিশীলতা, সহযোগীতা, আতিথ্যেয়তা, আনন্দ-বিনোদন কত মর্মস্পর্শী, হৃদয়গ্রাহী। বাইরের লোক অনেকেই তাচ্ছিল্য করে বলে- মান্দিরা কত বোকা, সহজ-সরল এবং অলস, ভবিষ্যতের চিন্তাহীন। আমি বলবো মান্দিরা কত ভাগ্যবান! ঈশ্বরের আশীর্বাদ তাদের মাঝে আছে।

প্রশ্নঃ মান্দিদের মধ্যে আপনি সামাজিক, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে অনেক অবদান রেখে চলেছেন, সেসাথে আপনাকে অনেক রোগী চিকিৎসা সেবা দিতে দেখি। এগুলো আপনি কিভাবে করেন? চিকিৎসা-সেবার কাজটি কোথায় কিভাবে শিখেছেন?

উত্তরঃ আমি পালক; ডাক্তার নই। তবে পালক এবং সমাজ সেবকদের প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পর্কে কিছুটা ধারণা বা অভিজ্ঞতা থাকা ভালো। আমার দুই বোন নামকরা মিডওয়াইফ নার্স। আমাদের পরিবারে ডাক্তার, নার্স রয়েছে বলে ছোটবেলাথেকেই আমি শুধু অষুধের বিষয়ে আলাপ শুনে এসেছি এবং আমার প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পর্কে পড়াশুনা রয়েছে বলে আমি অনেক আত্মবিশ্বাস নিয়ে এসব কাজ করতে পারি। আমি এখানে এসে অনেক মানুষকে আরোগ্যযোগ্য যেমন- পেট ব্যথা, মাথা ব্যথা, ডাইরিয়া, কলেরা, আমাশয়, ম্যালারিয়া ইত্যাদি রোগে কষ্ট পেতে এবং মরতে দেখেছি। তাই আমি সবসময় হাতের কাছে কিছু ঔষধপত্র রাখতাম, এখন আমাদের মিশনে রোগীদের জন্য আশ্রম এবং সার্বক্ষনিক সেবিকা রয়েছে।

প্রশ্নঃ আপনি অনেক গরীব ছেলেমেয়েদের পড়াশুনার জন্য এবং দরিদ্র পরিবারকে আর্থিকভাবে সহায়তা দান করেন। এগুলোর জন্য আপনি কিভাবে অর্থ সংগ্রহ করেন?

উত্তরঃ ইটালি থেকে সেন্ট ভিনসেন্ট ডি পল এসব গরীব ছেলেমেয়েদের পড়াশুনার জন্য টাকা দিচ্ছে। হয়তো ভবিষ্যতে সাহায্য দিবে না, তাই আমাদেরকে আর্থিকভাবে সাবলম্বি হতে হবে। বর্তমানে আমাদের দুটি হোস্টেলে ৬০জন ছেলে এবং ১৩০জন মেয়ের মধ্যে ১জন ছেলে এবং ৬০জন মেয়ে এই অর্থ সাহায্য পাচ্ছে। এরাই আমাদের জাতির ভবিষ্যত, তাদের যত্ন করতে হবে- সুতরাং এরকম গরীব ছেলেমেয়েদের জন্য সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।

প্রশ্নঃ আমরা জানি, আপনি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সহযোগী। সেসময় আদিবাসী এবং বাঙালী সবার জন্য অনেক উপকার করেছেন। সে সময়কার একটি স্মরণীয় ঘটনা বলুন।

উত্তরঃ মৃত্যুকূপ থেকে ফিরে আসার এ ঘটনা মনে হলে আমি এখনোও শিওরে উঠি, হয়তো আমি বেঁচে থাকতে সে ঘটনার কথা কোনদিনও ভুলব না। ১৯৭১-এর স্বাধীনতার সময় পাক বাহিনীর সাথে মুক্তিসেনাদের তুমুল যুদ্ধ চলছে। খবর পেলাম, পাক বাহিনী পাউইজাম গ্রামে তিনজন মান্দাইকে গুলি করে হত্যা করেছে। মধুপুরথেকেও ১৫ জন হিন্দুকে ধরে নিয়ে গেছে এবং পরে তাদের মধ্যথেকে ১১ জনের লাশ নদীর বুক থেকে পাওয়া গেছে। তখন ভয়ে আতঙ্কে হিন্দু, মুসলিম সকলেই জলছত্র মিশনে আশ্রয় নেওয়ার জন্য ছুটে আসছে। আমরা বাধ্য হয়ে কিছু লোকদের মিশনে এবং বাইরে খ্রীষ্টানদের বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছি। তখন মান্দিরাও অনেকে জঙ্গলে আশ্রয় নিয়ে অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটিয়েছে। আবার কেউ কেউ মরিয়মনগর আর বারমারিতে নিজেদের চেনা-জানা অত্মীয়দের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। এপ্রিলের ১৪ তারিখে ক্যাপ্টেইন বালজিৎ সিং এবং ক্যাপ্টেইন ন্যাগি একজন রেডিও অপারেটরসহ আমাদের মিশনে আশ্রয় নিলেন। তাঁরা বিভিন্নভাবে সাহায্য এবং পরামর্শও দিয়েছেন। ইতিমধ্যে মেজর জেনারেল সহিদুল্লাহও জয়পুরে পাক আর্মিদেরকে হত্যা করে জলছত্র মিশনে আশ্রয় নিয়েছেন। এর মধ্যেই হয়ে গেলো বিপত্তি। জুলাই মাসের ২৪ তারিখে পাক আর্মি ব্রিগেডিয়ার আসাদুল্লাহ খান মধুপুরে এসে ডিসি এবং এসপিসহ আমার কাছে এলেন এবং মিটিং–এর নাম করে আমাকে রসুলপুর ফরেস্ট অফিসে নিয়ে গেলেন। গিয়ে দেখলাম ৪৫ জন আদিবাসী পুরুষদেরকে গুলি করার জন্য সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করে রাখা হয়েছে। আমাকেও তাদের মধ্যে দাঁড় করালেন। আমিও কিংকর্তব্যবিমূঢ়। কিন্তু কি মনে করে আমি জিজ্ঞেস করলাম, স্যার যদি কিছু মনে না করেন আমি আপনাকে একটি প্রশ্ন করি। আপনি বাইরে কোথায় প্রশিক্ষণ পেয়েছেন? উনি বললেন, আমেরিকা নিউ জার্সির CAMDIN থেকে। আমি বললাম, ঠিক আছে আগামী কালই সারা আমেরিকাবাসী জেনে যাবে তাদেরই হাতে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত একজন পাক ব্রিগেডিয়ার তাদেরই লোককে হত্যা করেছে। এ কথার পর তিনি কি মনে করে আমাকে এবং আমাদের সবাইকে ছেড়ে দিলেন। কিন্তু তিনজন হিন্দু যুবতীকে গুলি করেছিলো।

প্রশ্নঃ বাংলাদেশ সরকার আদিবাসীদের স্বীকৃতি দেয় নি। স্বীকৃতি দিলে মান্দি সমাজের জন্য কি উপকার হতো বলে আপনি মনে করেন?

উত্তরঃ সরকার বলে বাংলাদেশে আদিবাসী নাই। আমার মনে হয়, আদিবাসী স্বীকৃতি দিলে আদিবাসীদের শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান (জমি), অর্থনীতি উন্নয়নের দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে, এজন্যে স্বীকার করে না। এখানথেকে ২৭টা মান্দি গ্রাম নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। এখনও মান্দিদের ঘরবাড়ি বসতভিটা কেড়ে নেওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে; তাদের কোন নিরাপত্তা নাই। তাই মান্দিদের চিন্তা মান্দিদেরকেই করতে হবে; সরকার করবে না। জাতি ও সমাজকে টিকিয়ে রাখতে হলে, সমন্বিত সমাজ উন্নয়ন ছাড়া উন্নতি করা একেবারেই অসম্ভব। নিজেদের উন্নয়ন নিজেরা করতে চাইলে ভালো নেতা তৈরী করতে হবে। আত্মিক উন্নয়নের পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি উন্নয়নের কাজ সুন্দরভাবে করতে হলে ন্যায় ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য নেতাদের কাজ করতে হবে।

প্রশ্নঃ জুবিলী উপলক্ষে এলাকার খ্রীষ্টভক্তদের জন্য কিছু বলুন।

উত্তরঃ যদিও এ অনুষ্ঠান আমি মনে-প্রানে চাইনি, তারপরও যারা অক্লান্ত পরিশ্রম করে এই অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে, শ্রম দিয়ে, অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করেছে– তাদের সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। আশা করি আপনাদের প্রার্থনায় আমাকেও স্মরণে রাখবেন।

প্রশ্নঃ আমাকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। আপনি দীর্ঘজীবি হোন, ভালো থাকবেন।

উত্তরঃ আমার ৬০ বছর জুবিলী উপলক্ষে সবাইকে শুভেচ্ছা। তোমাকেও ধন্যবাদ। যীশুনা রাসং।