দেশে নানা উৎসবে, নতুন বাজেট আসলে বাজারে আওয়াজ দেয়ার আগে পণ্যের দাম হু হু করে বাড়ে। এরপর দুর্যোগ, মানুষের কঠিন বিপদে সরকারী নীতি অমান্য করে দেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ে বিষয়টিও দেশের মানুষের আজানা নয়। হ্যাঁ দেশের অতীত বাস্তবতা তাই বলে। আমাদের অতীত বাস্তবতায় দেখেছি দেশে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী, সিন্ডিকেটরা ওৎ পেতে বসে থাকে যে কখন দেশে দুর্যোগ আসবে। দেশে দুর্যোগ আসা মানে তাদের জন্যে মহা আশীর্বাদ।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টদের তথ্য মতে, কঠোর লকডাউনকে মোকাবেলার জন্যে দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণ খাদ্যপণ্যের মজুদ রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমকে। এছাড়াও দেশে সাতদিনের কঠোর লকডাউনের সময় নিত্যপণ্যের বাজার স্বাভাবিক রাখার উদ্যোগ নিয়েছেন সরকার। নতুন করে যাতে দাম না বাড়ে সেজন্য বাজারে সব ধরনের ভোগ্যপণ্যের সরবরাহ বাড়ানো হবে। বাজারে কৃষিপণ্য ও খাদ্যপণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিনা বাধায় পণ্যবাহী পরিবহন চলাচল করার অবাধ সুযোগ রাখা হয়েছে। এর পাশাপাশি স্বল্প আয়ের মানুষ সরকারী বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা টিসিবির ট্রাকসেল থেকে কমদামে ভোগ্যপণ্য সংগ্রহ করতে পারবেন। এ কারণে বাজারে নতুন করে কোন পণ্যের দাম বাড়ার সুযোগ নেই। তবে অসাধু ব্যবসায়ীরা পণ্যের কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করে দাম বাড়ানোর কারসাজি করলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছে।
আরও বিভিন্ন সংবাদ মারফতে জানা যায়, করোনা সংক্রমণরোধে কঠোর লকডাউনের ঘোষণা এবার আগে-ভাগে জানিয়ে দেয়ায় ব্যবসায়ীরাও পর্যাপ্ত পরিমাণ ভোগ্যপণ্যের মজুদ ও সংগ্রহের সুযোগ পেয়েছেন। এছাড়া আমদানি-রফতানি কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে দেশের সকল স্থল ও নৌ-বন্দরসমূহ চালু রাখা হয়েছে। এতে করে বিদেশ থেকে আমদানি করে চাহিদা মেটাতে হয় এমন কোন পণ্যের সঙ্কট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা নেই। এর পাশাপাশি সপ্তাহের চারদিন নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু রাখা হয়েছে। ফলে সব ধরনের বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে আর্থিক লেনদেন স্বাভাবিক থাকবে।
আরও আশার কথা হলো, পণ্যের দাম বাড়ার কোন কারণ নেই বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য সচিব তপন কান্তি ঘোষ। লকডাউনের সময় পণ্যবাহী সব ধরনের যানবাহন লকডাউনের আওতামুক্ত থাকায় বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকবে। এ কারণে নিত্য ও খাদ্যপণ্যের কোন সঙ্কটের আশঙ্কা নেই। ভোক্তারা ন্যায্যদামে নিত্যপণ্য কেনাকাটা করতে পারবেন। চাহিদার তুলনায় দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণ ভোগ্যপণ্যের মজুদ রয়েছে বলে জানিয়েছেন গণমাধ্যমকে।
এদিকে কোরবানি ঈদের বাজার তো সামনে আসছেই। পেঁয়াজসহ সব ধরনের মসলা জাতীয় পণ্যের আমদানি, মজুদ ও সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। লকডাউনের সময় আতঙ্কিত হয়ে বেশি পণ্য না কেনার জন্যও পরামর্শ দেয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে ক্রেতারা খাবার পণ্য বাজারে কিনতে পারবেন।
দেশের এসব নীতি, প্ল্যানিং কাগজে কলমে ঠিক আছে এবং যে কেউ এক কথায় বলবে বেশতো, আমিও বলি এটা সরকারের দুর্দান্ত একটি প্ল্যানিং। আরও ভালো লেগেছে সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, এ দুর্যোগের সময় খুচরা বাজারে মনিটরিং করে কেন দাম বাড়ছে তা সরকার খুঁজে বের করে দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করবে। এ কথা শুনার পর যে কেউ দুই হাত তুলে হাততালি দিতে নিশ্চিয়ই কুন্ঠাবোধ করবেন না, করবে কী !
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, নীতি, প্ল্যানিং, মনিটরিং বাস্তবে এর উল্টো চিত্রও দেখেছি। যেখানে দেশের নানা উৎসবে, নতুন বাজেট আসলে বাজারে আওয়াজ দেয়ার আগে পণ্যের দাম হু হু করে বাড়ে। এরপর দুর্যোগ, মানুষের কঠিন বিপদে সরকারী নীতি অমান্য করে দেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ে বিষয়টিও দেশের মানুষের আজানা নয়। হ্যাঁ দেশের অতীত বাস্তবতা তাই বলে। আমাদের অতীত বাস্তবতায় দেখেছি দেশে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী, সিন্ডিকেটরা ওৎ পেতে বসে থাকে যে কখন দেশে দুর্যোগ আসবে। দেশে দুর্যোগ আসা মানে তাদের জন্যে মহা আশীর্বাদ। দুর্যোগ কিংবা মহা দুর্যোগের সময় বিত্তশালীদের ভোগ্যপণ্য পেতে অসুবিধা হয় না; যত অসুবিধা হয় ঐ হতদরিদ্রদের। খেটে খাওয়া দিনমজুর মানুষদের। আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা এও বলে, দেশে একবার কোন ভোগ্যপণ্যের দাম উপরে উঠে গেলে নিচে নামার পথ আর খুঁজে পায় না। পণ্যের দাম কমতে দেখে নি অদ্যাবধি। তখন অনিয়মই নিয়মে পরিনত হয়। বাজার দর এটাই বলে চালিয়ে দিই। দেশে এটাই দেখে এসেছি এ যাবৎ।
এমন দুর্যোগের সময় সরকারের বাস্তবসম্মত প্ল্যানিং প্রয়োজন। আরও প্রয়োজন সে প্ল্যানিংগুলোকে শতভাগ প্রয়োগ করে জনজীবনে স্বস্তি এনে দেয়া। সে ক্ষেত্রে এক তরফাভাবে ব্যবসায়ীদের দোষ দেয়া ঠিক হবে না। দেশের নেতা, রাজনীতিবিদদেরকেও ভূমিকা রাখতে হবে। যাতে কেউ একক কিংবা যোগ যোগসাজসে এ ধরনের অনিয়ম, দুর্নীতি দুর্যোগকালে কোনভাবে করতে না পারে। বাংলাদেশে সুষ্ঠ ব্যবস্থাপনাই পারে যেকোন কৃত্রিম সংকট মোকাবেলা করতে এবং সেদিকে সরকারসহ সংশ্লিষ্টদের সজাগ থাকা প্রয়োজন।
লুই সাংমা, ফ্রান্স
ওয়েভ ডেভেলপার, ব্লগার, আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সার এবং
সাংস্কৃতিক কর্মী।