নেত্রকোনা রির্পোট: নদী ভাঙ্গনের দৃশ্য যমুনা পাড়ের নয়, এ দৃশ্যটি আসলে নেত্রকোনা জেলার সোমেশ্বরী নদীর পাড় ভাঙ্গনের সাম্প্রতিক দৃশ্য। প্রতি বছর পাহাড়ের ঢলে ভেসে যায় সেখানকার স্থায়ী বসতি ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, কালভার্ট এবং ফলসী জমি। ফলে প্রতিবছর নদী পাড়ের মানুষের হাহাকার বাড়ছে ভিটেবাড়ী হারাবার, হারাচ্ছে ফসলী জমি। এভাবে চলতে থাকলে এলাকার অধিকাংশ মানুষ বাস্তহারা হয়ে পড়বে এবং সেটি অধিকাংশই গারো আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকা।

সোমেশ্বরী নদী মূলত বাংলাদেশ-ভারতের একটি আন্তঃসীমান্ত নদী। এটি ভারতের মেঘালয়ের পশ্চিম গারো পাহাড় জেলা এবং বাংলাদেশের শেরপুর জেলায় প্রবাহিত একটি নদী। নদীটির দৈর্ঘ্য ২৩ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ৪৫ মিটার এবং নদীটির প্রকৃতি সর্পিলাকার। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড বা “পাউবো” কর্তৃক সোমেশ্বরী নদীর প্রদত্ত পরিচিতি নম্বর উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদী নং ৮৭ নম্বরে রয়েছে। নদীর দৈঘ্যপ্রস্তের রেকর্ডটি বলার উদ্দেশ্য, রেকর্ডটি আসলে পুরোনো। বর্তমানে এটি প্রায় এর ডাবল হবে। প্রতি বছর ভারতে প্রচুর বৃষ্টিপাত হবার দরুণ নদীর পানি বাংলাদেশে পাহাড়ি ঢলাকারে প্রবেশ করে। নদীর প্রবল স্রোতে ভেসে যায় নদীর দুধারে বসবাসকারি বাড়িঘর, গাছপালা এবং ফসলি জমি।

সেখানকার গারো অগারো এলাকাবাসী সবাই বিপদের সম্মুখীন হচ্ছে দীর্ঘকাল। কিন্ত এবছরের ভাঙ্গনে হতে চলছে চরম বিপদ শীঘ্রই বলে জানালেন সেখানকার এলাকাবাসী। এক ভিকটিমের ভাষ্য মতে, গত ৩দিন আগেও পুকুর হতে নদীর দূরত্ব ছিল ২০ফিট এর মতো, কিন্তু আজ যার দূরত্ব ৩ফিট। গত ৫বছর আগেও এই রাস্তায় ছিল ঢাকা যাওয়াগামীদের একমাত্র বিশাল পথ, আজ সেই রাস্তায় ঝুঁকি নিয়ে ঝুলে আছে নদীর তীরে!

এলাকাবাসীর সুস্পষ্ট অভিযোগ অবৈধ, অপরিকল্পিতভাবে ড্রেজারের সহায়তায় বছরজুড়ে নদী গর্ভে বালু উত্তোলন, ভাঙ্গনকৃত এলাকায় দ্রুত বাঁধ নির্মাণে উদ্যোগ গ্রহণ না করা, শুকনো মৌসুমে ড্রেজিংয়ের মাধ্যমের পানির গতিপথ ঠিক না করার ফলে নদী ভাঙ্গন থামেনি বরং দিনকে দিন বেড়ে যাচ্ছে। এলাকাবাসীরা আরো বলেন, দুর্যোগকালীন সময়, এবং এখনো পর্যন্ত বালু উত্তোলনের কাজ চলছে; যেমন- কামারখালী বাজার, শিবগঞ্জ এবং টাকশাল এলাকায়। তাছাড়াও ভারতের অংশে কংক্রিটের বাঁধ নির্মাণের ফলে স্রোতগুলো প্রবল শক্তিতে ঢেউগুলো আচড়ে পরে বাংলাদেশের নদীর পাড়গুলোতে। এমন ভাঙ্গনের দৃশ্য দেখে ঐ এলাকার এলাকাবাসী বাস্ত হারানোর উৎকন্ঠা এবং দীর্ঘশ্বাস বেড়েই যাচ্ছে। অনুপম সৌন্দর্যের সোমেশ্বরী নদী আজ এলাকাবাসীর একমাত্র কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিভিন্ন সময় ভাঙ্গনরোধে এলাকায় সরকার দলীয় উচ্চ পর্যায়ে লোক বহুবার এলাকা পরিদর্শন করেন; এবং অচিরে বাঁধ নির্মাণের আশ্বাস দেন। ফলে প্রশাসন হতে সোমেশ্বরী নদী ভাঙ্গন রোধে শীঘ্রই বাঁধ নির্মাণ কাজ শুরু করবে, হচ্ছে বলে কানাঘোষা শুনা গেলেও বাস্তবে আলোর মুখ দেখেনি অধ্যাবধি। এ প্রসঙ্গে এলাকার চেয়ারম্যান বলেন, বিষয়টি এখনো পর্যালোচনাধীন রয়েছে এবং প্রকল্প কবে পাশ হবে তা তিনি জানেন না। প্রশাসনের এমন ধীরগতি কাজ দেখে মনে হয় এলাকা ভাঙ্গনের ভয়াল পরিস্থি দেখভালের কেউ নেই!

করোনা ভাইরাসের প্রকোপ উপেক্ষা করে কামারখালি যুব শক্তির উদ্যোগে এলাকার চেয়ারম্যান, এবং বিভিন্ন গ্রামের নানাবিধ সহায়তায় কিছু জায়গায় বাঁশ দিয়ে প্রতিরোধ বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু করেছে। তবুও জনমনে প্রশ্ন রয়েই গেলো, এতে শেষ রক্ষে হবে কি! এলাকাবাসী জানে না সোমেশ্বরী নদীর ভাঙ্গনের শেষ কোথায়! সংঘবদ্ধ যুবক-যুবতী এবং প্রবীনদের কথা হলো, আমরা বাস্তহারা হলে বাপদাদার ভিটেবাড়ী ছেড়ে যাবোইবা কোথায়?

অব. অধ্যক্ষ, এশিয়া এন্ড প্যাসিফিক এলায়েন্স অব ওয়াই.এম.সি.এ’র ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এর স্থায়ী সদস্য জনাব রেমন্ড আরেং ফেসবুক স্ট্যাটাসে বলেন- ভেঙেই চলছে সোমেশ্বরীর (দূর্গাপুর, নেত্রকোণা) পশ্চিম পাড় (বিজয়পুর, রানীখং, বহেরাতলী, কামারখালী, বড়ইকান্দি, কুল্লাগড়া, ডাকুমাড়া, শিবগঞ্জ, গাওকান্দিয়া…. গ্রামগুলো)। নদী গর্ভে তলিয়ে যেতে চলেছে হাজারো ঘর-বাড়ি, অনেক গ্রাম, মসজিদ, মন্দির, গির্জা এবং হাট-বাজার। আমি এলাকা রক্ষায় সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধি, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী এবং কর্মকর্তাদের সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা এবং প্রশাসনের কাছে এলাকাবাসীর চাওয়া একটাই নদী ভাঙ্গনের স্থায়ী সমাধান। এলাকায় ত্রাণ নয়; ঝুঁকি নিয়ে ঝুলে থাকা বাড়িঘর, ঝুলে থাকা বাবা-মায়ের শেষ স্মৃতি আর আপনজনদের শেষ সম্বল ভিটা এসব নিয়েই প্রশাসনের নিকট একটাই চাওয়া নদী ভাঙন রোধে শীঘ্রই এবং অনতিবিলম্বে বাঁধ নির্মাণ কাজ শুরু করা প্রয়োজন বলে মনে করে এলাকাবাসী।