বলাবাহুল্য স্বাভাবিক জীবন-যাপনেই আমরা ইন্টারনেট ও প্রযুক্তির ওপর কতখানি নির্ভরশীল দিনকে দিন তা প্রত্যেকেই হারে হারে টের পাচ্ছি। করোনা সংক্রমণের এ সময়ে অধিকাংশ মানুষই ঘরে থাকছেন বলে ‘ঘরে থাকা এবং নিরাপদ রাখা’ বিষয়টি নিশ্চিত করাসহ বাইরের কাজ ঘরে থেকে সম্পাদন করতে ইন্টারনেট ও প্রযুক্তির ওপর আমরা অনেকেই বলা চলে পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি।
এছাড়াও ঘরে থেকে চাই দেশ-বিদেশের খবর নিতে; বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে। এমন কি করোনা ভাইরাসের কারণে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান ‘হোম অফিস বা ওয়ার্ক ফ্রম হোম’চালু করেছে। এ কারণে বাসা থেকেই করতে হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ সব কাজ করতে হচ্ছে। এমনকি মিটিংও সারতে হচ্ছে অনলাইনে। এক্ষেত্রে করোনাকালীন সময় আরও বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে স্ট্রীম ইয়ার্ড (Stream Yard) নামের এক নতুন অ্যাপটি। অ্যাপটির সাহায্যে মিটিং এবং দেশ বিদেশের সঙ্গে ঘরোয়া আড্ডা করা যাবে কোনও বাড়তি ঝামেলা ছাড়াই।
সে ব্যবস্থাই করে দিচ্ছে ইন্টারনেট ও প্রযুক্তি। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে নিউইয়র্ক টাইমসে ‘দ্য ভাইরাস চেঞ্জড দ্য ওয়ে উই ইন্টারনেট’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, করোনার কারণে ঘরে থাকা মানুষ ইন্টারনেটে কত বেশি পরিমাণে সময় ব্যয় করছে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের চিত্র উঠেলেও আমাদের অবস্থা খুব বেশি এদিক-ওদিক হওয়ার কথা নয়। অনুসন্ধান করলে নিশ্চয়ই দেখা যাবে- ব্যক্তিগত পর্যায়ে যোগাযোগের জন্য যেমন এখানে ফেসবুক, মেসেঞ্জার, ইমো, হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবার ইত্যাদির ব্যবহার যেমন বেড়েছে; তেমনি বহুমুখী যোগাযোগের জন্য বেড়েছে জুম, গুগল-মিট, স্ট্রীম ইয়ার্ড ইত্যাদির ব্যবহার। অনেকেই বাসায় থেকেই লাইভে নিজে একা কিংবা অন্যদের সংযুক্ত করে আলোচনা করছেন। এখানে ভার্চুয়াল দর্শক দেখছে, সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়াও ভাগাভাগি করতে পারছে।
মোদ্দা কথা, করোনার এ সময়ে দেশে সবচেয়ে যুগান্তকারী বদল ঘটেছে- ঘরে থেকে অফিস করা। ধারণাটি হয়তো বিশ্বে নতুন নয় কিন্তু বাংলাদেশে এর বাস্তব রূপ আমরা এখন দেখছি। এ দুর্যোগে মানুষ খবর চায়। সংবাদমাধ্যমও দেশ-বিদেশের সংবাদ প্রদান করে তার দায়িত্ব নিরলসভাবে পালন করছে। এ সময়ে সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের অধিকাংশই ঘরে থেকে অফিস করছে। সংবাদমাধ্যম ছাড়াও অনেক প্রতিষ্ঠানের কর্মীরাও ঘরে থেকে কাজ করছেন। এক্ষেত্রে কেউ টিম ভিউয়ারসহ রিমোট সার্ভার ব্যবহার করছেন। কেউ অফিসের নিজস্ব নেটওয়ার্ক ও সফটওয়্যারে কাজ করছেন কিংবা ই-মেইলসহ অন্যান্য যোগাযোগমাধ্যমে নির্দেশনা নিচ্ছেন, কাজ সম্পন্ন করে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। বড় কোনো ঝামেলা ছাড়াই সুন্দরভাবে ঘরে চলছে অফিস কার্যক্রম।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও বন্ধ নেই শিক্ষা কার্যক্রম। সীমিত পরিসরে হলেও সংসদ টিভির মাধ্যমে সরকার যেমন বাচ্চাদের শ্রেণিকক্ষের পাঠদান করাচ্ছে। তেমনি বেসরকারি অনেক উদ্যোগও অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমে এগিয়ে এসেছে। বিষয়ভিত্তিক বিভিন্ন পাঠ তৈরি করে তার ভিডিও দিচ্ছে সংশ্নিষ্ট ওয়েবসাইট, ইউটিউব কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এ ধরনের কাজ আগে থাকলেও লকডাউনে বেড়েছে।
উচ্চশিক্ষায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেমন অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে, তেমনি সরকারি অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ও বসে নেই। ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাধীন সব কলেজকে অনলাইনের মাধ্যমে ক্লাস নিতে নির্দেশনা দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এভাবেই শিক্ষা কার্যক্রম সম্পন্ন করছে।
করোনা ভাইরাসের কারণে ঘরবন্দী মানুষজন নানাভাবে সময় কাটাচ্ছেন। সিনেমা, নাটক দেখা, গান শুনা, বইপড়া, লুডু-ক্যারাম-দাবা খেলার পাশাপাশি ফেসবুকে লাইভ অনুষ্ঠান প্রচারের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। এ লাইভে ছোটদের পাশাপাশি বয়স্ক ব্যক্তিরাও অংশ নিচ্ছেন। অবসর সময়ে অনেকেই ফেসবুকে লাইভ গান-আবৃত্তি করছেন। তবে করোনাকালের এই সময়টাতে বাংলাদেশে হঠাৎ করেই ‘স্ট্রিম ইয়ার্ড’-এর সাহায্যে লাইভ করার মাত্রা বেড়ে গিয়েছে। অসংখ্য ব্যক্তিকে এখানে সংযুক্ত করে লাইভ সম্প্রচার করা যায় বলেই অল্প সময়ে স্ট্রীম ইয়ার্ড অ্যাপটি সবার কাছেই জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
এখন ফেসবুক ওপেন করলেই অহরহ দেখা যায় ‘স্ট্রিম ইয়ার্ড’ব্যবহার করে অনেককেই প্রতিদিন নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে দেখা যায়। এর মধ্যে রয়েছে টক শো থেকে শুরু করে নানা সাংস্কৃতিক আয়োজন। এছাড়াও অন লাইন প্রেয়ারসহ ইউটিউব ক্রিয়েটরস, শিল্পী সংগঠন দিনে কিংবা রাতে নিয়মিত লাইভে আড্ডা করছেন। এসব লাইভে দেশ-বিদেশের সংস্কৃতি ও সাহিত্য অঙ্গনের বিশিষ্টজনেরা অংশ নিচ্ছেন। এমনকী এসব অনুষ্ঠান দেখতে প্রচুরসংখ্যক মানুষও সংশ্লিষ্ট ফেসবুক আইডি ও পেজ ভিজিটও করছেন। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে ইতিবাচকভাবে সরব থাকার এ বিষয়টি সত্যিই প্রশংসনীয়।
শুধু তাই নয়, এ তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার করে জন সচেতনতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে এক ধরনের আড্ডার ভিন্ন আমেজ পাচ্ছে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী ঘরবন্দী ছুটির মধ্যে মানুষের একাকিত্বে ভোগার হাত থেকেও রেহাই পাওয়া সম্ভব হচ্ছে। ঠিক এ কারণেই মূলত ‘স্ট্রীম ইয়ার্ড’ অ্যাপটি জনপ্রিয়তা এখন তুঙ্গে উঠেছে।
লুই সাংমা, ফ্রান্স
ওয়েভ ডেভেলপার, ব্লগার, ফ্রিল্যান্সার এবং সাংস্কৃতিক কর্মী