‘যে যাই বলুক এভাবে সামনে এগিয়ে যেতে চাই আপনাদের সহায়তা, সাপোর্ট যদি পাই। আপনাদের পৃষ্টপোষকতা গারো সমাজে আরও প্রয়োজন। যাঁদের হাত ধরে আমরা আরও যাতে এগিয়ে যেতে পারি।‘
যেকোন পরিস্থিতিতে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারার এমন অদম্য সাহস সবার থাকে না। পৃথিবীতে সবাইকে দিয়ে সব কাজ হয় না। অদ্যবধি এটাই আমরা কমবেশি জেনে আসছি। এরপর আবার অভিনয় কিংবা মডেল বলে কথা! যদি অল্প করে বলি, জেমস এম মারাক ধুলোমাখা এক খন্ড আলোক ছটা কিংবা হতে পারে কোন ভৎর্সনার নাম। এবার নিশ্চয়ই আপনার মনে প্রশ্ন জাগে, কে এই গারো তরুণ মডেল জেমস মারাক ? হ্যাঁ জেমসের কথায় পরে আসছি।
ভারতের মেঘালয় সীমান্তবর্তী উপজেলার উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়নের টেকেরঘাট। প্রতিদিন শত শত পর্যটক ভিড় জমান এ লেকের সৌন্দর্য উপভোগ করতে। নাম তার নীল রঙে রূপায়িত ‘নীলাদ্রি’। কোন কল্পনায় নয়; বাস্তবে যেন নীলের রাজ্যে হারিয়ে যাওয়া। এমন স্বর্গীয় সৌন্দর্য্যে ভরা জায়গাটা কাশ্মীর কিংবা সুইজারল্যান্ড নয়, আমাদের দেশেই! বাংলাদেশী সুইজারল্যান্ড, কি অবাক হচ্ছেন ? অবাক হবারই কথা। এমন অপরূপ সৌন্দর্য্যে ডুব দিতে নিশ্চিন্ত মনে ঘুরে আসুন সিলেট সুনামগঞ্জ থেকে। নিজস্ব স্বকীয়তা হারিয়ে ট্যাকেরঘাট চুনাপাথর খনি প্রকল্পের পাথর কোয়ারি পর্যটকদের কাছে এখন নীলাদ্রি লেক (Niladri Lake) নামে সুপরিচিত।
সুনামগঞ্জের টাংগুয়ার হাওর। সে আরেক নয়নভিরাম দৃশ্য। এছাড়াও এর আশেপাশেই অনেক সুন্দর সুন্দর নয়নাভিরাম জায়গা আছে যা কোন পর্যটকের মনকে মুহূর্তেই দোলা দিয়ে যেতে পারে ! এমনই একটি যায়গা টেকেরঘাট চুনাপাথরের পরিত্যাক্ত খনির লাইমস্টোন লেক। স্থানীয় লোকজন একে নীলাদ্রি লেক বলেই জানে। এর নামটা যেমন সুন্দর এর রূপটাও তেমনি মোহনীয় । নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাসই করতে পারবেন না পানির রঙ এতটা নীল আর প্রকৃতির এক মায়াবী রুপ হতে পারে। মাঝের টিলাগুলি আর ওপাড়ের পাহাড়ের নিচের অংশটুকু বাংলাদেশ এর শেষ সীমানা। বড় উচু পাহাড়টিতেই সীমানা কাটা তারের বেড়া দেওয়া আছে। এমন মায়াবী দৃশ্যে যে কারোর এক পলকেই নয়ন জুড়িয়ে যাবে।
হ্যাঁ গারো জাতিসত্তার মডেলিংয়ে নতুন মুখ চাঁনপুর নিবাসী, তাহিরপুর সুনামগঞ্জের জেমস এম মারাকের গল্প বলছি। সুনামগঞ্জের টাংগুয়া হাওরের যে মোহনীয় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে কথা শুরুতে বলেছি, সে সৌন্দর্য্যের নীলাভূমিতে জেমস এর জন্ম। শৈশব এবং কৈশরগুলো সেখানকার ধূলো মাটির গন্ধ শুকে বেড়ে উঠেছেন। জেমসের স্বপ্নেরা যেন আজ আকাশ ছুটে চায়। গুটি গুটি পায়ে স্বপ্নগুলো সামনে এগুচ্ছে বাধাঘাট কলেজ সুনামগঞ্জ থানার কলা বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী জেমস মারাক।
ছবি: গারো মিউজিক প্রডাক্টশন শ্যূটিং, সিলেট, সুনামগঞ্জ
আ.বিমা টাইমসের ভার্চুয়্যাল আড্ডায় প্রথম প্রশ্ন, মডেল বা মডেলিং জগতে কিভাবে এলেন? জবাবে জেমস বলেন- ‘আমার চলন বলন দেখে মাঝেমধ্যে বন্ধু-স্বজন কেউ মডেল হতে বলতো। মডেলিং করলে তোমাকে মানাবে বলে উৎসাহিত করতো। আজ স্বজনদের কথায় যেন ফুলচন্দন হয়ে ফুটে উঠলো। সুযোগটা পেয়ে গেলাম। গারো গানের মিউজিক ভিডিওতে মডেল হিসেবে এটিই আমার প্রথম। এর আগে আরো একটি অফার এসেছিল, স্যোসাল মিডিয়ার প্রোফাইল গুলযোগের দরুণ সেখানে অংশগ্রহণ করতে পারিনি।‘
সত্যিই বলতে ব্যক্তি জীবনে এমন কিছু গল্প থাকে, যে গল্প বাস্তবে পাওয়ার জন্যে প্রতীক্ষা করতে হয়। সে প্রতীক্ষার ফলও মধুর হয়। হওয়াটাই স্বাভাবিক। এরপর ‘পরিবার কতজন ভাইবোন?’ বলতেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘আমাদের কোন বোন নেই। ঈশ্বর দেয়নি। পরিবারে আমরা চার ভাই, পরিবারে আমি দ্বিতীয় সন্তান।‘
গারোহাব মিউজিক ভিডিওতে মডেলিং করতে কেমন লেগেছে ? তিনি বললেন, ‘অফার আগেও এসেছিল। কিন্ত পরিস্থিতি আমাকে ফেভার করেনি। গারোহাব এর নতুন মিউজিক ভিডিওর অফারকে ফেলতে পারিনি। ইতিমধ্যে কাজও শেষ করেছি এবং কাজ করতে ভালোই লেগেছে। তাছাড়া স্ক্রীনে এই প্রথম। খুব এক্সাইটেট ছিলাম অবশ্যই। দ্বিতীয় কারণটি হলো, একজন ভাইরাল মডেল এর সঙ্গে কাজ করতে পেরে নিজেকেও সৌভাগ্যবান মনে করেছি। এরপর ভিডিওটির পরিচালক অভ্র নকরেক, সমাপন স্নাল এবং অন্যান্যদের সহযোগিতা আমাকে মুগ্ধ করেছে।‘ জেমস এর এমন দুর আলাপন আমাকে আপন করে কাছে টেনে নিচ্ছিল। আর নিজের মধ্যে অনুধান করছিলাম, সকলকে সহজ করে নিতে পারাটাও শিল্পী মনের আরেকটি গুণ, এবং অপরিহার্য একটি বিষয়।
গারোহাব মিউজিক ভিডিওতে আপনার প্রত্যাশা কেমন? এর উত্তরে বলেন, ‘নতুন ভিডিও মিউজিকটির গবেষণা, লুই সাংমার ব্যতিক্রম ধর্মী মৌলিক গান, গানের কথা, আংকেল ফরিদ জাম্বিলের সুর এবং সমাপন স্নাল ও জুঁই বনোয়ারী এ দুই শিল্পীর গাওয়া মিষ্টি কণ্ঠ এবং মিউজিক কম্পোজিশান দর্শক শ্রোতাকে মুগ্ধ করবে, যা আমার বিশ্বাস। নতুন গারো মিউজিক ভিডিওটি প্রকাশের অপেক্ষায়।‘ ভবিষ্যতে কি হতে চান ? প্রশ্নে তিনি জানান, ‘যে যাই বলুক এভাবে সামনে এগিয়ে যেতে চাই আপনাদের সহায়তা, সাপোর্ট যদি পাই। আপনাদের পৃষ্টপোষকতা গারো সমাজে আরও প্রয়োজন। যাঁদের হাত ধরে আমরা আরও যাতে এগিয়ে যেতে পারি।‘
ছবি: মডেল রোজ মিকি এবং জেমস এম মারাক, গারো মিউজিক প্রডাক্টশন শ্যূটিং, সিলেট, সুনামগঞ্জ
ফিচার শেষের আগে আরও কিছু প্রশ্ন, জুটি হিসেবে রোজ মিকি রাংসা কেমন? এক কথায় গারো ভাষায় ‘বিয়াদে গাসুফ্রেটা’ অর্থাৎ অসাধারণ এক মডেলের জুটি পেয়েছি।‘ এ ছাড়াও নিথরিরি চিরিং সামবাও মিউজিক ভিডিওর পরিচালক অভ্র নকরেক এবং সমাপন স্নালের নির্দেশনা কেমন লেগেছে, সেখানে নতুনত্ব কি ছিল ? ‘এক কথায় অসাধারণ। এর আগে অন্যদের নির্দেশনা নিজ চোখে দেখেছি; কিন্ত এবার তাদের নির্দেশনা আমি শুনে নিজে সে রোল প্লে করে বা মডেল হিসেবে অভিনয় করতে আমাকে সহজতর করেছে। নিজের আত্মবিশ্বাসে আরও নতুন অভিজ্ঞতা যুক্ত হলো, যা ভবিষ্যতে আমার কাজে লাগবে।‘
শেষ প্রশ্ন, নতুন গারো প্রজন্মদের কাছে আপনার প্রত্যাশা কি ? ‘এ প্রজন্মের গারো বা আ.চিকরা নিজেদের মাতৃভাষা ভুলতে বসেছে। এ ধরণের উদ্যোগ নতুন গারো প্রজন্মকে নিজেদের কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, ভাষা রক্ষায় সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। গারো ঐতিহ্যের একটি দলিল হতে পারে।‘
জেমস মারাকের এমন গঠনমূলক কথাবার্তা শুনে তাকে কি বলে বা লিখে ফিচারটি শেষ করবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না। জেমসের মতোন হাজারো জেমস ঠিক আমাদের গারো সামাজেই রয়েছে, যাদের মনের বাসনা, স্বপ্নগুলো একেবারে ফুরিয়ে যায়নি! যা হোক আমার বিশ্বাস, তার এই নিজস্ব ‘ভাবনা’, ‘তাড়না’ এমন তারুণ্যের কণ্ঠ অন্যকেও কিছুটা হলেও ছুঁবে। প্রত্যেকের হৃদয় করাঘাত করবে নতুন কিছু করার প্রত্যয়ে।