ওয়েলসন নকরেক, টাঙ্গাইল প্রতিনিধি: বিশ্বের প্রায় সকল আদিবাসী জনগোষ্ঠি নৃত্যগীত প্রিয়। পারিবারিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় যেকোন উৎসব-অনুষ্ঠান ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্রসহকারে তারা একক বা সমবেত নৃত্যগীতি পরিবেশন করে।
বাংলাদেশেও আদিবাসী জনগোষ্ঠিসমূহও তাদের এই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে প্রবাহমান রেখেছে। গারোরা জন্ম থেকে মৃত্যুর দিন পর্যন্ত অর্থাৎ সকল অনুষ্ঠানই দামা, রাং, ক্রাম, আদুরি, চেংচাপ এবং অন্যান্য বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজ ছাড়া চলে নি। বিশেষ করে পুজা এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক উৎসবে এগুলোর ব্যবহার হয়ে থাকে আবশ্যকীয় এবং উদ্দেশ্যমূলক। তাই সাংসারেক খামালগণ বলেন, আমাদের গারোদের বাদযন্ত্রগুলোর আওয়াজ হচ্ছে একেকটা ডাক, আহ্বান এবং প্রচার। গারোদের এসব বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজ বা সুরেরও ভিন্নতা রয়েছে। এই ভিন্ন ভিন্ন আওয়াজগুলো শুনেই দূরের মানুষ বুঝে যেতো বাদ্যযন্ত্র বাজানোর উদ্দেশ্য অর্থাৎ ঘটমান প্রকৃত ঘটনা।
টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের মানুষের সাথে কথা বলে জানা গেছে অতীতে প্রায়শই অবস্থাসম্পন্ন বাড়িতে নাগ্রার দ্রিম দ্রিম আওয়াজ শোনা গেলেও এখন কোনো বাড়িতেই এই সুর আর প্রতিধ্বনিত হয় না। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে মধুপুরের বেশ কয়েকটি গ্রামে নাগ্রা থাকলেও এখন খুব কমই বাজানো হয়। বেদুরিয়া, জয়নাগাছা, পীরগাছা, সাইনামারি, হাগুরাগুড়ি, গায়রা গ্রামের ১-২টা বাড়িতে নাগ্রা থাকলেও সেগুলো প্রায় অব্যবহৃত অবস্থায় রয়েছে।
গারোদের ব্যবহৃত বাদ্যযন্ত্র নাগ্রা, ছবি: ওয়েলসন নকরেক
গারোদের ব্যবহৃত বাদ্যযন্ত্রের উপকরণ নিতান্তই সাধারণ এবং এর গঠন প্রণালীও সহজ-সরল। কাঠ, বাঁশ, মাটি, লোহা, পিতল, লাউয়ের খোল, বেল বা নারিকেলের মালা, সুতা, তার, শিং, শঙ্খ, নল, পাতা, প্রভৃতি স্থানীয় উপাদান দিয়ে বাদ্যযন্ত্র তৈরী করা হয়।
নাগ্রা (Nagra) বাদ্যযন্ত্রটি গারোদের অন্যতম প্রধান বাদ্যযন্ত্র। গারো সমাজে নাগ্রার ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নাগ্রা আসলে এক ধরনের ঢোল বিশেষ। নাগ্রা মাটির হাড়ি দিয়ে তৈরি হয়। বড় মাটির হাড়ি আড়াআড়িভাবে কেটে নিচের অংশ দিয়ে নাগ্রা বানানো হয়। দামার ন্যায় গরু, মহিষের চামড়া দিয়ে এর ছাউনি দেওয়া হয়। নাগ্রার আওয়াজ খুবই মোটা স্বরের হয়ে থাকে। এ নাগ্রাটি ঘরের প্রবেশ পথে বা অতিথিশালার ঘরের মাঝখানে রাখার রেওয়াজ রয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যমতে কোন অতিথি বা নবাগত ঘরে প্রবেশ করতে হলে প্রথমে এই নাগ্রা বাজাতে হতো। তা-না হলে ঐ গৃহকর্তা বা লোকজন তাকে মূল্যায়ন করতেন না। নাগ্রার আওয়াজেরও ব্যতিক্রম হতো, যেমন চ্রারা আসলে এর আওয়াজ হতো দিং-দিং-চ্রাচিং-চ্রাদিং; আর নকচামি আসলে দিং-দিং-নকদিং-নকআদাম,দিং-দিং-নকদিং-নকআদাম; এবং নকচিক আসলে নকআদাম, নকচিকদিং ইত্যাদি। অর্থাৎ এই নাগ্রার শব্দে গৃহকর্তা প্রতিবেশী সকলকে চু খাওয়া এবং আলাপ আলোচনার জন্য নিমন্ত্রণ করে থাকেন।
এছাড়াও আদি গারোদের বিশ্বাস, গারোদের প্রতিটি বাদ্যযন্ত্রের সাথে দেবতারা থাকে এবং বাদ্যযন্ত্রের মাধ্যমে দেবতারা কথা বলে। তাই গারোদের সামাজিক আচার অনুষ্ঠান, পূজা উৎসব কিংবা যে কোন বিনোদনে গারোদের নিজস্ব বাদ্যযন্ত্র ব্যবহৃত হয় অতি যত্নসহকারে, ভক্তিপূর্ণভাবে। সেকারণে গারোরা তাদের বাদ্যযন্ত্রগুলোকে খুবই নিরাপদ স্থানে রাখে যাতে কারোর গায়ে বা পায়ে না লেগে যায়। বাদ্যযন্ত্রের আকার আকৃতি, প্রয়োজনীয়তা এবং ব্যবহার বিভিন্ন রকমের।
আদিমকাল থেকেই এই বাদ্যযন্ত্রের কারিগর তারা নিজেরাই। শুধুমাত্র লোহাযুক্ত বাদ্যযন্ত্রের বেলায় কামারের সহায়তা নিতে হতো। বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহারে বিশেষত্ব মানা হতো বলে গারোদের উৎসব বা উদ্দেশ্য অনুসারে বাদ্যযন্ত্রগুলোর স্বর, আওয়াজ, তাল, লয় ইত্যাদি বিভিন্ন রকমের হয়ে থাকে। কোন কোন ক্ষেত্রে বাদ্যযন্ত্রগুলো সংস্কার অথবা উপহার হিসেবে প্রদান করা হতো।