সদিচ্ছা থাকলে অভাব কখনো কাউকে দাবিয়ে রাখতে পারে না। অমলকেও অভাব দাবিয়ে রাখতে পারে নি। বাস্তবে এমন গল্প গোচর কম হয়। সত্যিকার অমলেরা নীরবে কাজ করে। নিজেকে ফোকাস করে না। আড়ালে-আবডালে থাকতে পছন্দ করে। ফোকাস করতে না চাইলে-ই কী হয় ?
ডাক নাম অমল নকরেক। একজন পেশাদার ইলেক্ট্রিক্যাল টেকনিশিয়ান, সফল বাবা এবং সমাজ চিন্তক- ঠিক এমন অনেক বিশেষণে বিশেষায়িত করা যায়। অমলের সাদামাটা জীবন-যাপন দেখে যে কেউ ভাবতে পারে, তিনিও আট-দশজন মানুষের মতোন সাধারণ পিতা। তিনি কীভাবে সাধারণ থেকে অসাধারণ হয়ে উঠেন তা কি কেউ কখনো জানতে চেয়েছি! অমলের বহু স্বাদ আহল্লাদ, পাওয়া না পাওয়ার কত দিন কেটেছে স্বাধীনতার পূর্ব এবং পরবর্তীতে সময়ে এই সাধারণ ‘অমল’ পরিচয়ে।
ভালো কর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রাপ্ত পদক
অমল পরিচয় ছাপিয়ে অম্লান হয়ে ওঠার পেছনে এক দীর্ঘ গল্প রয়েছে। যে গল্প শুধুই শোষণ, বঞ্চনা, উপেক্ষা আর অর্থনৈতিক দৈন্যতার। তবে তীব্র পরিশ্রম আর লেগে থাকার মানসিকতা যে নতুন ভোর এনে দেয় তার উৎকৃষ্ট উদহারণও অমল নিজে-ই। পরিবারের অকুণ্ঠ ভালোবাসা পেলেও পারিবারিক আর্থিক দৈন্যতা, পিছুটান মানুষকে পেয়ে বসে; এগিয়ে যাবার সময় অদৃশ্য কেউ পেছন থেকে লাগাম টেনে ধরে অমল তাঁদের-ই একজন।
বড় ছেলের সমাবর্তন অনুষ্ঠান
আ.বিমা টাইমসের সম্পাদক লুই সাংমার সঙ্গে একদিন ভার্চুয়্যাল আড্ডায় তিনি বলেন, মাত্র আড়াই বছর বয়সে অমলের বুক আর বুক পাজর গুরুতরভাবে অগ্নিদগ্ধ হয়। অগ্নিদ্ধগ্ধ হবার পর থেকে বেঁচে থাকার প্রদ্বীপ যেন ক্রমেই নিভে আসছিল। হয়তো বেঁচে থাকলেও অন্যের করুনায় আজীবন কাটাতে হবে। এমন শঙ্কা নিয়ে পুরো পরিবার আশা নিরাশায় দুলছিলেন। এ সময় আমেরিকান সিস্টার আন্না রোজ এর সহায়তায় ১৯৬৮ সালে তৎকালীন পাকিস্তান আমলে সুচিকিৎসার জন্য প্রথমে ঢাকায় নিয়ে আসেন। ঢাকাতে চিকিৎসা করাতে এসেও অমল একবার হারিয়ে গিয়েছিলেন। অমলকে খোঁজে পেলেও তাঁর চিকিৎসা আর ঢাকাতে হলো না। এরপর টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুর হাসপাতালে তাঁকে দ্রুত রেফার করা হলো। দীর্ঘ চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে উঠার পরও অমলের জীবন হতাশা-নিরাশায় কাটাচ্ছিলেন।
গ্রাম ও জন্ম সম্পর্কে তিনি জানান, তাঁর জন্ম ১৯৬০ সালে ময়মনসিংহ জেলার মুক্তাগাছা উপজেলার নালিখালী গ্রামে। মা বাবার দেয়া পুরো ডাক নাম অমল গাব্রিয়েল নকরেক। অমলের দাদু মৃত আগো মোড়ল ঐ এলাকার দুয়েকজন মোড়লের মধ্যে অন্যতম মোড়ল ছিলো। ঘরে বন্দুক ছিলো। সেই আমলে অমলের দাদুই এলাকায় প্রথম সাইকেল কিনে ব্যবহার করেছিলেন। পৈত্রিকসূত্রে পাওয়া সম্পত্তিও কম ছিলো না। অমলের দাদু আগো মোড়ল স্বাধীনতার পূর্ববর্তী সময় প্রত্যেক সন্তানকে পড়ালেখার তাগিদ দিতেন। তিনি চেয়েছিলেন প্রত্যেক সন্তান উচ্চ শিক্ষা-দীক্ষায় শিক্ষিত হোক। অমলের দাদু আর দাদীর তেমন কোন অক্ষর জ্ঞান ছিল না। অক্ষর জ্ঞানহীন হলেও তাঁরা শিক্ষার গুরুত্ব অনুভব করতেন। পড়ালেখার জন্যে কাউকে কাউকে তিনি ময়মনসিংহ জেলার বিড়ই ডাকুনি স্কুল এবং নেত্রকোনা জেলার বিরিশিরি স্কুল বোর্ডিংয়ে রেখে ধান চাল বিক্রি করে হলেও তাঁদের পড়ালেখার খরচ দিতেন। দু:খজনক হলেও সত্য অমলের দাদুর পরিবারে পাঁচ ভাই বোনের মধ্যে তখন কেউ-ই হাইস্কুল ডিঙ্গাতে পারে নি। অমলের দাদুর আরও কিছু তাত্ত্বিক জ্ঞান ছিল, যা শুনলে অবাক হতে হয়, অবিশ্বাস্য লাগে। গারোদের মাতৃতান্ত্রিক বা মাতৃসূত্রীয় সমাজ ব্যবস্থা হলেও তিনি তাঁর ছেলে-মেয়েদের সমানভাবে সম্পত্তি কাগুজে কলমে লিখে দিয়েছিলেন। প্রত্যেকটি ছেলে-মেয়েকে স্বাধীনতার পূর্ববর্তী সময় একটি করে টিনের দু’চালা ঘর, এক জোড়া হালের গরুসহ সহায় সম্পত্তি সমানভাবে ভাগাভাগি করে দেন। এমন আধুনিক জ্ঞান, গণতন্ত্রের চর্চা, গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা অমলের দাদু দেখিয়ে গেছেন নিজের পরিবারে। গারোদের প্রথাগত সমাজ ব্যবস্থায় এক ব্যতিক্রম এবং বিরল এক ঘটনার স্বাক্ষী হয়েছিলেন।
অবসরে পরিবার নিয়ে পারিবারিক ভ্রমণ
মানুষের ভাগ্যের কি নির্মমতা ! একটা সময় অমলের পিতা সহায় সম্পত্তি হারাতে থাকে। পারিবারিক ব্যয়ভার মেটাতে ১৯৬৯ সালে ময়মনসিংহ ক্যাথলিক পাদ্রী মিশনের মাদার হাউজে কাজ নেয়। অমলের পিতা একটু মেজাজি হলেও সহজ, সরল এবং বড্ড এক সাদা মনের মানুষ। পাঁচ ভাই বোনের মধ্যে অমলের পিতা একেবারেই আলাদা। তিনি আট দশজনের মতোন নয়। জীবনে নয় ছয় কি জিনিস বুঝেন নি। অন্যের সম্পত্তির ওপর আধিপত্য, অনধিকার চর্চা ছিল না এবং এখনো নেই।
শিক্ষা সম্পর্কে অমল বলেন, বাবার চাকরীসূত্রে পুরো পরিবার ময়মনসিংহে পাড়ি জমায়। সেখানে সে হলিফ্যামিলি প্রাইমারি স্কুলে পঞ্চম শ্রেণী শেষ করেন। স্কুলে পড়ার সময় তৎকালীন রেভা ফা. ইলিয়াস অমলকে খুব যত্ন সহকারে ইংরেজী আর গণিত পড়াতেন। স্কুলে পড়ার সময় অমলকে গণিত বিষয়ে খুব শক্ত গাঁথুনি দিয়েছিলেন দেবতাসুলভ ওই পুরোহিত। এরপর গণিতের ওপর আস্থা এবং গণিতকে তিনি ভয় পেতেন না। এরপর ময়মনসিংহ সিটি কলেজিয়েট স্কুল থেকে ষষ্ঠ, কিন্ত সপ্তম শ্রেণী শেষ করার আগেই তাঁকে আবার ময়মনসিংহ ত্যাগ করতে হয়েছিল।
মুক্তিযুদ্ধের কি ভয়াবহতা অমল তখন ভালোই অনুভব করেছেন। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭৪ এর মাঝামাঝি সময় প্রায় পাঁচ বছর পর অমলের বাবা টাঙ্গাইল জেলার মধুপুর গড়াঞ্চলের গায়রা গ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। বঙ্গবন্ধুর সোনার দেশ, বর্তমান বাংলাদেশ সবে গড়তে শুরু করেছেন। কিন্তু বাংলা প্রবাদের মতোন, ‘অভাগা যেদিকে যায়, সেদিকে সাগর শুকিয়ে যায়’। স্বাধীনের পর দেশে তখন চারদিক অভাব আর অভাব। অমলকে অভাব পিছু ছাড়ে নি। পারিবারিক আর্থিক দৈন্যতা থাকলেও তাঁর পড়লেখার আগ্রহকে দমিয়ে রাখতে পারে নি।
আর্থিক দৈন্যতার পরও মধুপুর উপজেলার জলছত্র কর্পোস খ্রীষ্টি জুনিয়র হাইস্কুলে ভর্তি হন। গ্রাম থেকে ৪ কি.মি পথ যাওয়া আসা করে কোনরকম সপ্তম এবং অষ্টম শ্রেণী শেষ করেন। এরপর তাঁকে আবার স্কুল বদল করতে হয়েছিল। মিশনারী স্কুল পীরগাছায় নবম শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছিলেন। নবম শ্রেণী পাশ করে দশম শ্রেণীতে অমল এবং বড় ভাই লরেন্স এ দুই ভাইয়ের পড়ালেখা খরচ আর মেট্রিক পরীক্ষার ফরম ফিলাপের টাকা যোগাতে পরিবারে আর্থিক অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। বড় ভাইয়ের কথা ভেবে ইচ্ছে থাকলেও তখন দশম শ্রেণী শেষ করেও মেট্রিক পরীক্ষা আর শেষ করা হলো না অমলের।
অনিচ্ছা সত্ত্বেও আবার ফিরতে হলো গ্রামের বাড়ীতে। মাধ্যমিক শেষ না করে ভাঙ্গা অনুভূতি নিয়ে বাড়ীতে বসে পড়ালেখার গুরুত্ব গভীরভাবে উপলব্ধি করতে থাকেন। পড়ালেখা তো হলো না। এখন কি করবে তা বুঝে উঠতে পারছিলেন না। এ ভেবে তাঁর আরও দীর্ঘশ্বাস যেন বেড়ে যায়। অভাবী সংসারে কি আর করবে চোখে জল ফেলা ছাড়া ! ছন্দহীন বাউন্ডোলে জীবন তাঁর পছন্দ নয়। শুধু ভাবছিলেন বিকল্প কি করা যায়। মনে মনে ভাবে সে আশেপাশের লোক, বন্ধুবান্ধব কবে যেন তাঁকেও বলতে শুরু করে ‘বেকার ছেলে’। কিন্ত তবুও তাঁর চোখেমুখে লেগে ছিলো একরাশ স্বপ্ন। অজানা অনিশ্চিত ভবিষৎ এর দিকে এগিয়ে চলে, চোখে একরাশ স্বপ্ন-নিজে কিছু করে নিজেই স্বাবলম্বী হতে চেয়েছিলেন অমল।
অমল নিজে আরও জানান, যত দিন যাচ্ছিল নিজেকে পরিবারে নিজেকে বোঝা মনে হচ্ছিল তাঁর। নিজের সঙ্গে বোঝাপড়ার পাশাপাশি স্বাচ্ছন্দ মতো সে টুকিটাকি বাবাকে সাহায্য করতে থাকেন। হঠাৎ একদিন অমলের বড় ভাই লরেন্স নকরেক ঢাকা নারিন্দা টেকনিক্যাল স্কুলে ভর্তির সার্কুলেশান খবরটি পায়। বাড়ীতে এসে অমলের কাঁধে হাত বুলিয়ে বলে, তুমিতো আমার চেয়ে গণিতে ভালো টেকনিক্যাল স্কুলে চান্স পেয়ে যাবে, তুমি পারবে এবং যাও চেষ্টা কর তুমি। খবরটি শুনে সোজা জলছত্র মিশনে এসে ফাদারের সঙ্গে যোগাযোগ করে, তাঁর আগ্রহের কথা দ্রুত জানায়।
বড় ভাইয়ের এমন আদরমাখা উৎসাহ, প্রেরণা এবং বাবা-মায়ের আর্থিক দু:খ দুর্দশা কথা ভেবে অবশেষে টেকনিক্যালে পড়ার সিদ্ধান্ত নেয় অমল। সংকল্প করেছে ভর্তি পরীক্ষায় পাশ তাঁকে করতেই হবে। মনে দুর্দান্ত ইচ্ছে আছে; কিন্ত হাতে কানাকড়ি পয়সা ছিল না। গ্রামে কোথায়, কার কাছে কিছু ধার বা সুদে টাকা পাওয়া যায় সে জানে না। শেষমেশ কোন উপায়ুন্তু না পেয়ে গ্রামের মোড়ল রহেনের মা’র কাছে ৭০ টাকায় এক মন ধান দিবে বলে টাকা ধার নেয় অমল। মাত্র ৭০ টাকা নিয়ে ঢাকায় যাওয়া আসা, দুয়েকদিন থাকা খাওয়ার খরচ এ টাকা কুলোবেতো ! এমন ভাবনা এলেও যেন তাঁর কাছে কোন উত্তর নেই।
জলছত্র মিশন থেকে মোট ৮জন পরীক্ষার্থী ছিলেন। তাঁদের মধ্যে অমল ছাড়া আর কেউ ঐ টেকনিক্যাল ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেন নি। যে কথা সেই কাজ। এভাবেই আবার ঘর ছাড়েন অমল। গ্রাম ছেড়ে চলে আসেন পুরোনো ঢাকা নারিন্দায়। সেখানেই ইলেক্ট্রি্ক্যাল টেকনিক্যাল কোর্স শেষ করেন। পাশ করার পর আবার চলতে থাকে চাকরি পাওয়ার নীরব সংগ্রাম।
অমলের মেধা ও স্কিল্ড সম্পর্কে প্রয়াত ব্রাদার ডোনাল্ড ভালো জানতেন। ব্রা. ডোনাল্ড এর সহায়তায় কোর্স শেষ করার পর প্রয়াত ফা. হোমরিক ও প্রয়াত ফা. ন্যাপ এর কর্মস্থল; অর্থাৎ বর্তমান জলছত্র মিশনে প্রথম খন্ডকালীন ইলেক্ট্রিক্যাল কাজের ডাক পান। মিশন, পুরো মিশন কম্পাউন্ডে নতুন ইলেক্ট্রিক সংযোগ এবং সেটি সম্প্রসারণ করে ল্যাপ্রোসি হসপিতাল পর্যন্ত অমল নিপুন হাতে কাজ করেন। এটিই প্রথম চাকরি। মাস শেষে অমল পারিশ্রমিক পেয়েছিলেন ৫৮০ টাকা। এই ৫৮০ টাকা বেতনে অমলের চাকরি জীবন শুরু। পারিশ্রমিক কম হোক, কাজ করে প্রথম রোজগার করার যে গভীর আনন্দ সেদিন সে ভালোই অনুভব করেন। বুনেছিল জীবনের না বলা গল্প। ভেবেছিল সেদিন জীবনের গল্প এভাবেই অল্প অল্প করে সাজাতে হবে।
চাকরি সম্পর্কে বললেন, বাস্তব গল্প এখানেই শেষ নয়। তাঁর ভেতর চাওয়াকে সম্মান দিয়ে নতুন কিছু করার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন অমল। ১৯৮০ সালের মে মাসে ব্রা. ডোনাল্ড এর সহায়তায় যশোহর জেলার বকুলতলা ক্রাইষ্ট চার্চ টেকনিক্যাল স্কুলে চাকরি নেয়। মাত্র ৭০০ টাকা বেতনের চাকরি। অমলের প্রত্যাশা ছিল আরও একটু বেশি বেতন। কম বেতন হওয়াতে ওখানেও সে কোনভাবে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছিলেন না। ফলে চাকরি ছাড়ার নানা অজুহাত, বাহানা খুঁজতে থাকে। শেষমেশ সেখানকার প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনাকে দায়ী করে ছ’মাস না যেতেই চাকরি ছেড়ে আবার গ্রামের বাড়ি চলে আসেন। বাড়িতে এসে আবার হতাশা যেন তাঁকে ঘিরে ফেলে। কি করবে, কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলেন না।
এভাবে অমল চাকরি ছাড়লেও অভাব আর চাকরি অমলকে ছাড়ে নি। তবে চাকরি ছেড়ে বাড়ীতে এসে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন। কোর্স শেষ করে, চাকরি হাতে কাছে পেয়ে; আবার চাকরি ছেড়ে আর্থিক সংস্থান করাটা সহজ ছিল না যে, অনান্য ছেলেদের মতোন চলাফেরায় কাজ, টিউশনি কিংবা অন্য কিছু করে চালিয়ে যাবে। এ অবস্থায় নিজেকে অসহায়ত্ববোধ করতে থাকেন। তবে থেমে থাকেন নি অমল। বরং আত্ম বিশ্বাস আর আপন যোগ্যতায় নিজের পায়ের মাটি শক্ত করতে থাকেন। দৃঢ় সংকল্প করে এবং অপেক্ষার পালা ভালো কিছু করার।
এরপর আবার ১৯৮০ সালে ব্রা. ডোনাল্ড এর সহায়তায় নির্মানাধীন গ্রীন হেরাল্ড ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ৮০০ টাকার বেতনে চাকরি পেয়ে যায় অমল। কিন্ত সেখানেও প্রশাসনিক জটিলতার দরুন বেশিদিন টিকে থাকা কঠিন হড়ে পড়ছিল। স্কুল প্রশাসনের বাঁকা চোখ আর অনধিকার চর্চাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এগিয়ে চলেছেন স্বপ্নপূরণে। প্রায় বছর খানেক চাকরি করার পর আবার চাকরিকে গুড বাই জানালেন। চাকরি ছেড়ে এসে বাড়ীতে নিজেও ব্রিবতবোধ করছিলেন। কিছুদিন যেতে না যেতেই ব্রা. ডোনাল্ড অমলের বাড়ীতে খবর পাঠায় দ্রুত ঢাকাতে আসার জন্যে। ঢাকায় আসার পর ব্রাদার তাঁকে অনেকভাবে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে বলেন এবং মাথা ঠান্ডা করে সিদ্ধান্ত নিতে বলেন। ব্রাদারের কথা মতোন ঢাকায় এসে ১৯৮১ সালে সেন্ট যোসেফ স্কুলে আবার চাকরি পায়। বছর চারের বেশি চাকরি করে এর মধ্যে আলেয়ার সঙ্গে পরিচয় এবং পারিবারিকভাবে তাঁর বিয়ে হয়। পাঁচ বছর সেখানে চাকরি করা অবস্থায় ১৯৮৯ সালে নিজ যোগ্যতায় নতুন চাকরি হয় বারিধারায় অবস্থিত ব্রিটিশ হাই কমিশনে। সে চাকরি-ই অমলের ভাগ্যের চাকা ঘুরাতে পুরোটা সময় সহায়তা করেছিলেন।
পরিবার ও চাকরী সম্পর্কে তিনি আরও বলেন- চাকরি, সংসারে বহু চরাই উৎরাই চলছিল। এ সময় অমলের কোল জুড়ে আসে সন্তান। তিনটি সন্তানকে মানুষ করতে, উপরে উঠাতে অনেক দম লেগেছিল। পরিবার ঢাকায় রেখে, একা চাকরি করে মেয়ে দুটিকে দেশের সেরা বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং এক ছেলেকে প্রাইভেট বিশ্বাবিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর অর্জন করিয়েছি। বর্তমানে এই তিন ছেলে মেয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সম্মানজনক পদে চাকরি করছেন। পাশাপাশি নিজ পরিবার এবং স্ত্রী পক্ষের আত্মীয় স্বজন, শশুর শাশুরির দেখভাল, সমাজ রক্ষা সবই করেছি। এছাড়াও ব্রিটিশ এম্বেসীতে চাকরি করে বহু স্বজন, প্রতিবেশীদেরকে চাকরি সুযোগ এবং ঢাকায় পড়াশুনার জন্যে থাকার জায়গা সংস্থান থেকে শুরু করে আরও বিভিন্নভাবে সহায়তা করেছি। আমার ছায়াতলে অবস্থান করে, পড়ালেখা করে অনেকেই আজ দেশে প্রতিষ্ঠিত এবং কেউবা এঁরা বিদেশ বিভূঁই। তাঁদেরকে আমি কিছু করতে পেরেছি কিনা জানি না; তবে আমি তাঁদের প্রত্যেকের অবস্থানের কথা ভেবে গর্ববোধ করতে পারি।
ব্রিটিশ হাই কমিশন এর চাকরি সম্পর্কে বলেন, সেখানে লং টার্ম কো-ওয়ার্কার হিসেবে আমার বেশ সুনাম এবং তিন তিনবার এওয়ার্ড এবং সনদ পেয়েছি। কর্ম ক্ষেত্রে সুনাম ছিল বলে আমি বিদেশে উচ্চতর ট্রেনিং নিতেও সুযোগ পেয়েছি, যা আমার চাকরি জীবনে আরেকটি বর্ণাঢ্য অধ্যায় ছিল। ব্রিটিশ হাই কমিশন দীর্ঘ ৩৬ বছর চাকরি জীবন এবং অনেক ত্যাগ তিতিক্ষার পর নিজের জীবনেও সফলতা পেয়েছি। সেটি অর্জন করতে একার পক্ষে সম্ভব ছিল না। স্ত্রী, পরিবার এবং বন্ধু স্বজনদের অনুপ্রেরনায় তা সম্ভব হয়েছে। সব মিলিয়ে মোট ৪৩ বছর চাকরি করেছি; এখন অবসরে আছি। বাকী জীবন এভাবে নিজের এবং জাতির কল্যাণে নিজেকে মনোনিবেশ করতে চাই বলে তিনি জানান।
এতসব দৈন্যতা, বঞ্চনার মধ্যেও কিছু সুখের, ভালোবাসার, আলোক ছটার গল্প আছে, থেকে যায় আমাদের সমাজের আনাচে কানাচে। যা লিখতে গেলে আত্মজীবনীর বই প্রকাশ করা যায়। অমল থেকে অম্লান হয়ে উঠার সে গল্পে সিনেমা, নাটকও নির্মাণ হতে পারতো।
অমলের দিন বদলেছে ঠিকই, কিন্ত তিনি নিজে বদলায় নি এখনো। অমলের স্বভাব চরিত্র, চাল-চলন, চিন্তা-চেতনা, বাবা হিসেবে দায়িত্ব, স্বজনদের দেখভাল, সমাজ-নমাজ সবই তিনি রক্ষা করে চলেন। নিজের মধ্যে অহংবোধ, বিলাসীভাবাপনা তিলতুল্যও তাঁকে ছুঁতে পারে নি এখনো। গ্রাম থেকে বৃদ্ধ পিতাকে নিয়ে এসে শহরের মায়াজালে ছোট্ট শিশুর মতোন আদর সোহাগ, মায়া মমতায় আগলে রেখেছেন দীর্ঘদিন। কিঞ্চিৎ সুখের আবেসে মা’র মুখ দেখার তীব্র স্বাদ যেন মেটে না তাঁর বহুদিন। অমলের সুখে স্বর্গীয় মা স্বর্গে বসেও সন্তানের এমন সুখটান নিশ্চয়ই অনুভব করেন। নিশ্চয়ই স্বর্গের আঙ্গিনায় বসে জগত সংসার আর পার্থিব সুখের নি:শ্বাস ফিরে ফিরে পায় অমলের স্বর্গীয় মাও।
যে অমলের স্বাদ আল্লাদ, জীবনে উঁচু হয়ে বেড়ে উঠার মেরুদন্ড ভেঙ্গেই গিয়েছিল সে অমল-ই হাল ধরেছেন পরিবারের। গোটা পরিবারকে আগলে রেখেছেন ঢাকার মতোন বিলাসবহুল শহরে। স্থায়ী আবাসন গড়েছেন নামীদামী এলাকায়, দেশের রাজধানীর বুকে।
অমলের কোন বোন নেই। চার ভাইয়ের মধ্যে অমল দ্বিতীয়। ওঁদের সাথেও যোগাযোগ, বড্ড মিল রয়েছে। ভালোবাসাহীন পৃথিবীতে বেড়ে ওঠা সকল সন্তানদের অমলের দৃষ্টান্ত অনুকরনীয় হতে পারে। অগ্নীশিখায় দ্ধগ্ধ অমলের মনে মনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ছিল স্বল্প শিক্ষায় কিভাবে বড় হওয়া যায়, প্রতিষ্ঠিত হতে পারে এবং কিভাবে সন্তান সন্তটিকে মানুষের মতোন মানুষ করে গড়ে তোলা যায়। এমন স্রোতের বিপরীতে হাটার যে তীব্র সাহস জন্মেছিল, সে সাহস তাঁকে ঠিকই একদিন পৌঁছে দেয়। সে নজির, অম্লান হয়ে উঠার গল্প অমল নিজেই।