আ.বিমা টাইমস নিউজ ডেস্ক: সিস্টার মীরা মানখিন, এসএসএম, সুপিরিয়র, সিস্টারহুড অব সেন্ট মেরিজ, হালুয়াঘাট-এর প্রয়াণে আ.বিমা টাইমস পরিবার গভীর শোক প্রকাশ করছি। স্বর্গীয়া সিস্টারের শোকসন্তপ্ত আত্মীয়-স্বজন এবং সেন্ট মেরিজ সংঘের সকল সিস্টারের প্রতি জানাচ্ছি সমবেদনা।
সিস্টার মীরা, এসএসএম শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ী উপজেলাধীন বুগাই নদীর তীরে পাহাড়ের কোলে নয়নাভিরাম ছোট্ট তারানী-পানিহাটা গ্রামে খ্রিস্টিয়ানদের এংলিকান সম্প্রদায়ের (চার্চ অব বাংলাদেশ) এক মানখিন পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ছোটো ভাই বিশপ স্যামুয়েল সুনীল মানখিন বর্তমানে চার্চ অব বাংলাদেশের মডারেটর এবং ঢাকার বিশপ। তিনিই চার্চ অব বাংলাদেশের প্রথম গারো বিশপ এবং রোমান ক্যাথলিক সস্প্রদায়ের ময়মনসিংহ ডায়োসিসের বিশপ পল পনেন কুবি, সিএসসি, ডিডি -এর পর সমগ্র বাংলাদেশের দ্বিতীয় গারো বিশপ।
সিস্টার মীরা মানখিন, এসএসএম হালুয়াঘাট সাধু আন্দ্রিয়ের গির্জায় অবস্থিত সাধ্বী মারীয়ার ভগ্নীসমাজ নামে ব্রতধারিনী সংঘে যোগদান করেন এবং ২০০২ খ্রিষ্টাব্দে সংঘের সুপিরিয়র হোন। দীর্ঘদিন অসুস্থতার পর তিনি মৃত্যুবরণ করেন এবং গতকাল বিশপ সুনীল এস মানখিনের পনিচালনায় তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হবার পর তাঁকে সাধু আন্দ্রিয়ের গির্জার কবরস্থানে সমাধিস্থ করা হয়। তিনি সংরক্ষিত হলেন তাঁর পূর্বসূরী এসএসএম সিস্টারগণের সাথে। এ সমাধিস্থলেই মূলত হালুয়াঘাট সেন্ট এন্ড্রোজ মিশনের সকল ব্রতধারী এবং ব্রতধারিনীর সমাধি।
ঐতিহ্যবাহী হালুয়াঘাট সেন্ট এন্ড্রোজ মিশনের এংলিকান ব্রতধারিনীদের এই সংঘের নাম সিস্টারহুড অব সেন্ট মেরী। সংঘটি ১৯১৩ সনে বরিশাল এংলিকান মিশনের (যা অক্সফোর্ড মিশন নামে সকলের কাছে সুপরিচিত) এপিফানি সিস্টারদের সংঘে ফাদার স্ট্রং কর্তৃক দেশীয় সিস্টারদের নিয়ে গঠিত হয়। পরবর্তীতে ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে নবজন্মপ্রাপ্ত সংঘটি হালুয়াঘাটে আসে আদিবাসী সমাজে নারী ও শিশুদের মাঝে প্রৈরিতিক কর্মের আহ্বান নিয়ে। তাই ১লা ডিসেম্বরকে ধরা হয় সংঘটির প্রতিষ্ঠাকালরূপে। তাঁদের জীবন মঠাবদ্ধ মৌনীব্রত এবং প্রৈরিতিক জীবনের মিশেল। নার্সিয়ার সাধু বেনিডিক্টের বিধির সংস্কারকৃতরূপসহ ব্রতীয় জীবনের ঐতিহ্যবাহী বিধির অনুসরণ করলেও তাঁরা প্রচন্ডরূপে আসিসির সাধু ফ্রান্সিসের জীবনাদর্শ দ্বারা প্রভাবিত। দীনতা, বাধ্যতা ও কৌমার্যের মঙ্গলসমাচারীয় সুমন্ত্রণায় জীবন যাপনকারী ব্রতধারিনীগণ আদিবাসী সমাজে নারী ও শিশুদের শিক্ষাবিস্তার, স্বাস্থ্য পরিচর্যা, এবং আধ্যাত্মিক পরিচর্যায় কাজ করেন। সন্ন্যাস আশ্রমে প্রার্থনার জীবনে স্থায়ী বসবাসকারী সিস্টারগণ গির্জারও তত্ত্বাবধান করেন।
সংঘের উল্লেখযোগ্য সিস্টারগণ হলেন সিস্টার ডাক্তার চেলা, এসএসএম যিনি একজন মাদ্রাজী এবং ভারতের ভেলোর মেডিকেল হতে স্বর্ণপদক পেয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে পাশ করে চিকিৎসক হলে সংঘে যোগদান করেন। নিজের প্রতিষ্ঠিত একটি ডিসপেন্সারি তিনি পরিচালনা করতেন। যে ডিসপেন্সারি বর্তমানে আর নেই। তবে সেখানে সি. ডা. চেলা হোমস নামে ছাত্রীদের জন্য একটি ডরমিটরি সিস্টারগণ পরিচালনা করছেন। তিনি সম্ভবত আমৃত্যু সংঘ-সুপিরিয়র ছিলেন।
সিস্টার ঊষা দে, এসএসএম, জন্মস্থান কলকাতা ছেড়ে সংঘে যোগদান করেছিলেন, যিনি ছাত্রীদের জন্য ফাদার এম চক্রবর্ত্তী, এসএবি-এর নেতৃত্বে একটি নিম্ন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন এবং সেই বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষিকারূপে দীর্ঘদিন সেবা দিয়ে যান। শিক্ষাবিদ এই সিস্টার সমগ্র হালুয়াঘাটে ধর্ম-বর্ণ আবালবৃদ্ধবণিতা নির্বিশেষে আর সকলের কাছে বড়দি অর্থাৎ বড় দিদি বলেই পরিচিত ছিলেন। বিদ্যালয়ের সেই স্বর্ণযুগে এর সুনাম বহুদূর ছড়িয়ে পড়ে এবং বিদ্যালয়টি নারী শিক্ষাবিস্তারে সমগ্র হালুয়াঘাটসহ আশেপাশের অনেক এলাকায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। বিদ্যালয়টি এখন উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে উন্নীত। বালিকা বিদ্যালয় হলেও প্রতিষ্ঠাকাল হতেই এতে প্রাথমিক শিক্ষা সংযুক্ত এবং বালকেরা ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করতে পারে। সিস্টার ঊষা আমৃত্যু সংঘ-সুপিরিয়র ছিলেন।
সিস্টার চারু সাংমা (মৃ), ইদিলপুরের কন্যা, একজন সংসারেক খামালের কন্যা। বিস্তর জমিজমার প্রতি আসক্তি ছেড়ে তিনি সন্ন্যাসব্রতী জীবন গ্রহণ করেন। সংঘ তাকে পাঠায় কলকাতায় পড়াশোনার জন্য। কলকাতা থেকে এসে তিনি সংঘ গুছিয়ে নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। প্রচন্ড পরিশ্রমী, কর্মঠ সিস্টার সারাদিন পরিশ্রম করেও যেনো ক্লান্ত হতেন না। সংঘের সম্পত্তিতে ষড়যন্ত্রকারী একশ্রেণির লোভী স্বার্থপর হস্তক্ষেপ করতে চাইলে তিনি তা রক্ষা করেন। সিস্টারের শক্তিশালী হস্তক্ষেপে হায়েনারা পিছু হটতে বাধ্য হয়।
সংঘের আমৃত্যু সুপিরিয়র সিস্টার মীরার মৃত্যুর পর সংঘ শুধু শোকাবহই নয়, এক চ্যালেঞ্জিং মূহুর্তও পার করছে। সংঘের বর্তমান সিস্টারগণ সিস্টার অনিতা রাকসাম, এসএসএম; সিস্টার ব্রিজিতা দফো, এসএসএম; সিস্টার মালা চিছাম, এসএসএম-সহ সকল সিস্টার গারো অঞ্চলের এই ঐতিহ্যবাহী সংঘ পরিচালনায় দক্ষতার পরিচয় দিবে বলে শুভাকাঙ্ক্ষীমাত্রেই প্রত্যাশা।