আমাদের দেশে প্রচলিত এবং জনপ্রিয় প্রবাদ আছে ‘সর্ষের মধ্যে ভূত।’আজকের সম্পাদকীয়র প্রতিপাদ্য বিষয় প্রবাদটির সৃষ্টি বা ইতিহাস নয়, মূল বিষয় হলো মধুপুরে ইকোপার্ক আন্দোলনে কে বা কারা এই সর্ষের মধ্যে ভূত! কথাটি অনেকের খটকা লাগলেও লাগতে পারে। তবে আর বিষয়টি খটকা নয়, বরং ইকোপার্ক আন্দোলনে কেন সফল হয় নি, কেন হচ্ছে না, আদৌ সফল হবে কিনা জানার আগে ‘সর্ষের মধ্যে ভূত’ বিষয়টি গভীরভাবে চিন্তা করার সময় এসেছে।

মধুপুর গড়াঞ্চলে ব্রিটিশ পিরিড থেকেই নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত এবং অদ্যাবধি চলছে। তম্মধ্যে আদিবাসীদের ভূমি অধিকার লড়াই এবং সেখানে বসবাসকারী আদিবাসী উচ্ছেদের নীল নকশা অন্যতম। সচেতন কিংবা সাধারণ মানুষের বদ্ধমূল ধারণা এটি দাতা বা উন্নয়ন সংস্থার মাধ্যমে সরকার প্রকল্প করছে, কলকাঠি নাড়ছে সরকারী আমলা এবং বন বিভাগ। আপনাদের এই ধারণা মিথ্যে নয়। তবে তার চেয়েও বড় সত্য হলো ঘরের শত্রু। যারা সঙ্গোপনে আঁতাত করে সে প্রকল্পগুলো তৈরি করে, এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে সহযোগিতা করে যাচ্ছে। প্রবাদে লোকে যাকে বলে ‘ঘরের শত্রু বিভীষণ’। আপনার ঘরে শত্রু থাকলে আপনি যত বড় যোদ্ধা হন সে যুদ্ধে বিজয়ী হওয়া কঠিন। পৃথিবীতে এমন ইতিহাস বইয়ের পাতায় নয়, এমন চাক্ষুস ইতিহাস কিংবা নজির আমাদের সামনে অহরহ আছে।

রাজনীতি, নেতৃত্বের বাছ-বিচার, চুল ছেড়া বিচার-বিশ্লেষণ আমরা সবাই করতে পারি না। কথিত কিছু ব্যক্তি রাজনীতির লেবাসে, নেতাগিরিপনা করে, কতশত পথ ধরে তারা চলে সে খবর আমরা কতজনইবা রাখি? ভালো করে খুঁজে দেখলে দেখবেন তারা জাতির বৃহৎ স্বার্থকে তুচ্ছ করে, ব্যক্তি স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেয়।

এহেন প্রশ্ন জাগে, সরকারী আমলা ছাড়াও ঘরের শত্রুদের দ্বারা এসব প্রকল্প প্রনয়ন, বাস্তবায়নে এদের হাত নেই তা কি করে বুঝবো? কথায় আছে, এক হাতে তালি বাজে না। তালি বাজাতে গেলে দুহাত সমান তালে বাজাতে হয়!

‘সর্ষে ভূত’ সম্পর্কে এবার আরও গভীরে আসা যাক, আপনারা জানেন মানুষ ওষুধ ব্যবহার করে রোগ সারাতে বা রোগ বালাই প্রতিরোধ করতে। কিন্তু ওই ওষুধে যদি তিল পরিমাণ ভেজাল থাকে, মানব শরীরের জন্য ক্ষতিকর উপাদান থাকে, তবে তা রোগ না সারিয়ে আরেকটা রোগ সৃষ্টি করে থাকে। অর্থাৎ ওই সরিষার মতো ওষুধের মধ্যেই যদি ভূত থাকে তবে তা রোগ সারাবে কেমন করে?

মধুপুর ইকোপার্ক বন্ধের আন্দোলনের শুরু থেকেই ঐসব কিছু সর্ষে ভূত ঢুকে ছিল। ওদের নামধাম, গতিপ্রকৃতি আপনাদের সবার জানা আছে। এরপর যত দিন যাচ্ছে নতুন সর্ষে ভূতরা কি নিশ্চুপ থাকতে পারে ? সাম্প্রতিক সময়ের দুর্ধর্ষ করোনা ভাইরাস নিজের জিন পরিবর্তন করতে পারলে, ইকোপার্ক আন্দোলনের দালালরাও কত আকার আকৃতি, রুপ বদলানোর খবর শিরোনাম হতে কতক্ষণ! ইকোপার্ক দালালদের কর্মকাণ্ড সোস্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হতে কতক্ষণ?

সাম্প্রতিক সময়ে সোস্যাল মিডিয়ায় এসব পেশাদার দালালদের লাগামহীন কর্মকাণ্ড প্রতিনিয়ত ঘুরাপাক খাচ্ছে।  আমরা যাদের বিশ্বাস করি, যাদেরকে আমরা আদিবাসীদের বটবৃক্ষ মনে করি, যাদের কথায় শত শত আদিবাসী অস্তিত্ব রক্ষায় নিজের প্রাণ বাজি রেখে মাঠে নেমে পড়তো সেসব সর্ষে ভূতের মুখ আমাদের এখনই চিহ্নিত করতে হবে। আসলে কারা সেই প্রকৃত ভূত, কারা সেই ইকোপার্ক বিরোধী জাতীয় দালাল, বুঝতে হবে অদ্যাবধি কেন আদিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা হয় না!

ঔষধের গুণগতমান, সরবরাহ ইত্যাদি নিশ্চিত করতে দেশে যেমন বিএসটিআই ওষুধ প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগসহ নানা তদারকি প্রতিষ্ঠান আছে এসব দেখভাল করার জন্যে। তেমনি আপনারা যদি মধুপুর গড়ে সত্যিকারভাবে আদিবাসীদের অধিকার রক্ষা, এবং আদিবাসীদের ভূমি অধিকার স্থায়ী বন্দোবস্ত করতে চান তাহলে এখনো সময় আছে এসব সর্ষে ভূতদের তালিকা করে এদের কর্মকাণ্ড সমূলে উৎপাটন করুন। আদিবাসীদের অধিকার আদায়ে এসব কলঙ্কিত ব্যক্তিদের সামাজিকভাবে বৈকট করে আগামী দিনে সঠিক নেতৃত্বের পথ তৈরি করুন। অর্থাৎ ঐ ঔষধ প্রশাসন, নিয়ন্ত্রক যদি সঠিক কাজ না করলে ওরা থেকেও যেমন ওষুধে ভেজাল থাকে, তেমনি ওরা নেতৃত্ব থাকলে বুঝতে হবে আমাদের ইকোপার্ক আন্দোলনেও ভেজাল অর্থাৎ ভূত ঢুকে গেছে।

আদিবাসী জাতিসত্ত্বার মধ্যেও কেউ কেউ রাজনীতি, নেতৃত্বের নামে আদিবাসীদের অধিকার ক্ষুন্ন করছে, আদিবাসীদের অধিকার লাড়াই তরান্বিত না করে বরং বাধাগ্রস্থ করছে। শেষ রক্ষে হচ্ছে না আদিবাসীদের বাস্তভিটের অধিকার; এটা তো নিঃসন্দেহে জাতিসত্ত্বার জন্যে করোনা ভাইরাসের চেয়েও মারাত্মক ক্ষতিকর। নেতৃত্বের নামে নেতারা জাতিসত্ত্বা বিক্রি, ভেজাল ওষুধের মতোন নিরীহ আদিবাসীদের ক্ষতিগ্রস্থ করছে, যেকোন অধিকার লাড়ায় সংগ্রামে সর্ষে ভূতরাই লাভবান হচ্ছে। ফলে দেশে আদিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা বাধাগ্রস্থ হচ্ছে, এখনো প্রতিষ্ঠা হচ্ছে না আদিবাসীদের ন্যায্য অধিকার। বরং নেতৃত্বের নামে ঐ সর্ষে ভূতরা বিভিন্ন রকম সামাজিক জটিল সমস্যা তৈরি করছে, আবার তারাই সমস্যা সমাধানের নামে নিরীহ আদিবাসী মানুষের কাছে অর্থ দাবি করে ভোগান্তি বাড়াছে, আর্থিক ক্ষতি করে চলেছে দিনের পর দিন।

ঐসব সর্ষে ভূতদের সাময়িক সুবিধার জন্যে জাতিগত স্বার্থ, আদিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা, এবং সর্বপরি গোটা আদিবাসী জাতিকে এহেন বিপদের মধ্যে ফেলে দেয়া মোটেই সমীচীন হবে না। দেশ, ও দশের তথা আদিবাসীদের নিজের কল্যাণের জন্যই সবাইকে ওইসব ভূতকে চিহ্নিত করে দমন করতে হবে।