গারোদের সামাজিক প্রথাগুলো অলিখিত; কিন্তু এই গারো সমাজের বিধি-ব্যাবস্থাগুলো এখানো তাদের সমাজ ব্যবস্থায় স্থিতিশীল রাষ্ট্রীয় আইনের মতোই গণ্য করে। সেগুলো আজ সভ্যতার পালাবদলে গারোদের অনেক আদি ঐহিত্য প্রায় বিলুপ্তির পথে। এর মধ্যে Chengkina বা শুকরের চোয়াল সংরক্ষণ পদ্ধতি। এই চেংকিনা দেখে যে কারোর মনে হতে পারে শুকরের চোয়াল দ্বারা গাথুনি ঝুলন্ত এক প্রকার মালা। প্রকৃতপক্ষে সেটি আসলে মালা নয়। দেখতে মালার মতোন হলেও গারো ঐতিহ্য অনুযায়ী এর মর্মার্থ অনেক গভীর।

প্রাচীনকালে গারোদের প্রতিটা বাড়ীতে এই শুকরের চোয়াল সংরক্ষণ হরহামেশাই চোখে পড়তো। কিন্ত সভ্যতার পালাবদলে এর দেখা মেলা ভারী দায় ! গারো প্রাচীনদের মতে, এই চোয়াল একেকটি গারো বাড়ির ঐতিহ্য, প্রভাব-প্রতিপত্তি নির্দেশ করে। যে বাড়িতে যত বেশি শুকরের চোয়াল দেখা যাবে, সংরক্ষিত রয়েছে তাহলে বুঝতে হবে সে বাড়ি কত বড়, আর কতবার সামাজিক (বিয়ে, শ্রাদ্ধ ইত্যাদি) অনুষ্ঠান আয়োজন হয়েছে। তার মানে দাঁড়ায় বাড়িটি অনেক পুরনো।

এহেন প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য, সাংমা বা মারাক হচ্ছে মাহারি (গোত্র); আর এ (সাংমা বা মারাক) মাহারিদের অধীনে থাকে মাচং/চাচ্চি বা উপগোত্রসমূহ; যেমন- ম্রং, নকরেক, মৃ, সিমসাং, দফো, রিছিল, চিরান, দফো ইত্যাদি। ধরুণ নকরেক চাচ্চিরা সর্বাগ্রে শুধু নকরেকদের বিষয়ে বা স্বার্থ চিন্তা করবেন, গুরুত্ব দিবেন-এটাই স্বাভাবিক। অন্যান্য মাগুব্বুনগুলোও/গোত্রধারীরা একই ভাবে নিজ নিজ মাচং বা গোষ্ঠীর জন্য কাজ করেন।

গারোদের সামাজিক প্রথা অনুযায়ী স্বজন, প্রতিবেশীর যেকোন সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিবারের সামর্থ অনুসারে গৃহপালিত গবাদি পশু বা জীব তার সঙ্গে চাল, ডাল, পিয়াজ, লবন, মরিচ ইত্যাদি ঐ পরিবারকে সাহায্যস্বরূপ বা দান হিসেবে সেগুলো দেয়া নেয়ার রেওয়াজ ছিল। অর্থাৎ ব্যক্তি, প্রতিবেশি পরিবার যদি সদিচ্ছায় কোন বাড়ির অনুষ্ঠানে পশু বা প্রাণী উপহার হিসেবে নিয়ে আসে সেটি কাটার পর প্রাণীটির শুধু নীচের অংশের চোয়ালটি পরিস্কার করে বাড়ির দেয়ালের সম্মুখ ভাগে অথবা ঘরের পেছনে রশিতে ঝুলিয়ে সংরক্ষণ করা হতো।

তাছাড়াও গারোদের প্রথাগত ‘চা’ ‘মানক’ সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর, এবং তাৎপর্যপূর্ণ। গারো সমাজে ‘মানক’ অথবা ‘চ্রা’ বাড়িতে বেড়াতে আসলে বড় আত্মীয় হিসেবে আতিথেয়তায় ঘাটতি রাখে না। অর্থাৎ ‘মানক’ বা ‘চ্রা’কে বাড়িতে দেখতে বা বেড়াতে আসলে সে মানক বা চ্রা মিদাব-সামদাবের পাশাপাশি গাজন প্রক্রিয়ার প্রথাগত ধেনো মদ বা চু’দিখা পরস্পর আত্মীয়তা সুদৃঢ়করণসহ আতিথেয়তার অপরিহার্য বিষয় মনে করে। সমাদরকারীও তার সাধ ও সাধ্যের মধ্যে চ্রা বা মানকের আগমন উপলক্ষে বাড়ির আতিথেয়তায় ওয়াক চু’দিখা পরিবেশনকে উৎকৃষ্ট উপাদেয় মনে করে থাকে। মূলত যেকোন ঘরোয়া কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানে উপহার সামগ্রী নিয়ে আসলে সেটি আবার সুন্দর করে তারা লিপিবদ্ধ করে; অথবা মনে রাখে। ফলে সে দানকে তারা এক প্রকার ঋণ মনে করা হয়। তার জীবদ্দশায় অথবা তার পরিবারকে একইভাবে এমন কিছু সামাজিক রীতি, দায়বদ্ধতা মোকাবেলা করতে হতো। সে রেওয়াজ এখনো গারো পরিবার, এবং সামাজিকভাবেও চলমান রয়েছে।

চেংকিনা সংরক্ষণ বা রাখার এই প্রাচীন প্রথাটিও গারোদের অন্যান্য প্রথার মতো হারিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশে শুধু মধুপুর অঞ্চলের গারোদের মধ্যেই এই সুপ্রাচীন ঐতিহ্য কিছুটা চালু আছে, দেখা মেলে। ছবি ও তথ্য: ওয়েলসন নকরেক, মধুপুর।

লুই সাংমা, ফ্রান্স
ওয়েভ ডেভেলপার, ব্লগার, আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সার এবং
সাংস্কৃতিক কর্মী।