যেকোন উন্নয়নের প্রথম এবং প্রধানতম শর্ত হলো যোগ্যতা। যোগ্যতা এবং যোগ্যতা। অর্থাৎ সঠিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে যোগ্যতার বিকল্প নেই। যোগ্য ও অযোগ্য ব্যক্তির কাজ মানদণ্ডের বিচারে বিস্তর ফারাক থাকে। একেই আমরা বুঝি কাজ করার এভিলিটি। কিছু মানুষের এক বা একাধিক কাজের যোগ্যতা থাকতে পারে; আবার কেউবা নয়। পড়ালেখার পাশাপাশি যে যত বেশি পদ্ধতিগত শিক্ষাসহ বাস্তবধর্মী কাজের অভিজ্ঞতা নিতে সক্ষম হবে সে ততবেশি সামনে এগিয়ে যাবে। এটাই স্বাভাবিক। কিছু মানুষের শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকলেও বিশেষ কাজ বা যেকোন কাজ সফলভাবে শেষ করার যোগ্যতা না থাকলেও সিংহাসনে, চেয়ারে আসীন হতে দেখা যায়। তাহলে মূল বিষয়টি কী দাঁড়ালো?

যোগ্যতা ও তোষামোদ দুটি এক বিষয় নয়। দুটো বিষয় এক না হলেও একই ফলাফল আনতে স্বক্ষম। কথাগুলো অস্বীকার করার উপায়ও নেই এমন অবস্থা। যার ফলে প্রাচীনকাল থেকেই যোগ্যতার বিপরীতে তোষামোদ অঙ্গাঅঙ্গিভাবে বিদ্যমান। সমাজে, রাষ্ট্রে এক শ্রেণীর মানুষ তা সফল ব্যবহার করতে পারে। তোষামোদের বিনিময়ে নানা সুবিধা পেতে পারে। মোদ্দা কথা, পৃথিবীর অনেক সভ্য দেশেই এখনও এটি লক্ষণীয় বিষয়। সেটা সরকারী, বেসরকারী যেকোন কর্মক্ষেত্রেই হোক। যদি তাই হয় তাহলে বাংলাদেশইবা কেন বাদ যাবে ! বর্তমানে বাংলাদেশে যা দেখি সর্বমহলে, এবং সকল সেক্টরে তথা সকল ক্ষেত্রে যোগ্যতার চেয়ে তোষামোদের চর্চা চোখের পড়ার মতো বিষয়।

এই অভিনব তৈল্য ভেষজ গুণ ‘তোষামোদ’কে সমাজে আমরা বিভিন্ন নামে অভিহিত করে থাকি, যেমন- তেলবাজী, তৈলমর্দন, স্তাবকতা, চাটুকারিতা, মোসাহেবি, চামচাগিরি ইত্যাদি। কিন্তু যোগ্যতাকে এতো কিছু দিয়ে বিশেষণে বিশেষিত করার প্রয়োজন হয় না। এক কথায় এর পূর্ণভাব প্রকাশ করা সম্ভব। যোগ্যতা সম্পর্কে এত অধিক সংখ্যক উপাধির প্রয়োজন নেই। এর মাধ্যমেই উপলব্ধি করা যায় যে, তোষামোদ একটি অনৈতিক বিষয়। পক্ষান্তরে; যোগ্যতা পবিত্র এবং মানসিক দাপতের একটি বিষয়।

প্রশংসা কে না চায়, ভালোবাসে ? প্রকৃতপক্ষে তোষামোদকে যে নামেই অভিহিত করা হোকনা; আসল সত্যটি হচ্ছে প্রতিটি মানুষ চায় সবাই তাকে শ্রেষ্ঠ বলুক, প্রশংসা করুক। কারন এটাই কিছু মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। তোষামোদের অন্যতম হাতিয়ার হলো কোন ব্যক্তিকে আদ্যোপান্ত প্রশংসা করা। যার ফলে কেউ কেউ ওসব প্রশংসায় পঞ্চমুখ হতে দেখা যায়। তোষামোদীরা কারনে অকারনে কারও কোন যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও কোন অনৈতিক বা অন্যান্য সুবিধা লাভ করার জন্য যদি কোন মাত্রাতিরিক্ত প্রশংসা করা হয়। সেক্ষেত্রে উক্ত প্রশংসা তোষামোদ বা চাটুকারিতায় পরিগণিত হবে। এক্ষেত্রে তোষামোদকারী এবং তোষামোদ গ্রহণকারী উভয়েই যোগ্যতা, নৈতিক দৃষ্টিতে সমান অপরাধী।

বাংলাদেশের কিছু পরিস্থিতি অবলোকন করলে যা দেখি, দেশের প্রতিটি সেক্টরে, পর্যায়ে বা ক্ষেত্রে যোগ্যতার চেয়ে তোষামোদ দ্বারা ক্ষমতায় আসীন হয়, যেমন- অফিসে বসকে যে যত বেশি তোষামোদ করছে তাঁর প্রমোশান তত দ্রুত হচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ রাজনৈতিতে নেতৃবৃন্দকে তোষামোদ না করলে শত শিক্ষা যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা থাকলেও চাকুরি হবে না। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তৃনমূল পর্যায় থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত রীতিমত তোষামোদ, তৈল্য তৈলমর্দনের জিকির চলে। আজকাল এই তোষামোদীরা কবি সাহিত্যিক অর্থাৎ সব শ্রেণী পেশাতেও রয়েছে। দেশের নানা অবকাঠামো, শিল্প সাহিত্যের উন্নয়ন, অর্থাৎ সর্বক্ষেত্রে এদের পদচারণা দেখা যায়। বেসরকারি খাতের উন্নয়নকে না হয় বাদ দিলাম; কিন্ত সরকারী উন্নয়ন যেখানে সামগ্রিক উন্নয়নের কথা বলা হচ্ছে, সেখানে বহু জনগোষ্ঠীর স্বার্থসংশ্লিষ্ট তথা কৃষ্টি-কালচার উন্নয়নের বিষয়টি প্রধান এবং মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়; সেখানে কি করে অযোগ্য, তোষামোদকারীদের স্থান দিয়ে দেশের উন্নয়ন হয় সেটিই বড় প্রশ্নবোধক হয়ে থাকে আমাদের মতোন সাধারণ মানুষের কাছে। সরকারী অনুদানে চলে দেশের বিভিন্ন আদিবাসী অঞ্চলের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলো। নিয়োগের বিধিমালানুযায়ী নিয়োগ পান তারা। নিয়োগের খাতিরে নিয়োগ পান, আদৌ কি সেসব জনগোষ্ঠির উন্নয়ন ঘটে কী? আদৌ সে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিগণ সেসব গণমানুষের কৃষ্টি-সংস্কৃতি রক্ষায়, গবেষণায় কোন উন্নতি, ভূমিকা রাখতে পারে?

মোদ্দা কথা- দেশের, সমাজের এবং রাষ্ট্রের সঠিক উন্নয়ন চাইলে, চাটুকারিতাকে চুইংগামের মতোন এটাকে উপভোগ করুন, তবে গিলতে নেই। চাটুকারিতা সুগন্ধির মতোন সুঘ্রাণ নিতে পারেন, তবে গলাধঃকরণ করতে নেই। যিনি নৈতিক এবং অন্যান্য যোগ্যতায় প্রতিষ্ঠিত তিনি যোগ্যতা, তোষামোদ আর প্রশংসার পার্থক্য ভালো বুঝেন। তাঁর কাছে তোষামোদ করে অনৈতিক সুবিধা লাভ করা যায় না। এক আদর্শিক জায়গায় থেকে তিনি সবসময় যোগ্যতাকে মূল্যায়ন করে থাকেন। সঠিক কাজ, উন্নয়নকে অভিনন্দিত করেন।

প্রত্যেক মানুষের মনের গভীরে থাকতে পারে প্রশংসা পাবার আকুতি। থাকতে পারে পাওয়ার প্রবল ব্যাকুলতা। কিন্ত ওসব তোষামোদ ও প্রশংসার ক্ষেত্রে একটি কথাই বলা যায় যে, একটি হচ্ছে- ভেজাল ও কৃত্রিমতাযুক্ত কিংবা অনান্তরিক। অন্য কথায় বলা যায় যে, ‘মুখে মধু অন্তরে বিষ’। অন্যটি হচ্ছে- নির্ভেজাল, আন্তরিক এবং যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তি। এতে যেমন একদিকে রয়েছে শ্রদ্ধা ও বিনয়, অন্যদিকে ঠিক তেমনি থাকতে পারে আত্মার খোরাক হিসেবে বিবেচিত প্রয়োজনীয় নৈতিক উপাদান। যা হতে পারে সমাজে, রাষ্ট্রে অনুকরনীয়, প্রনিধানযোগ্য। বাংলাদেশে তোষামোদের সংস্কৃতি বন্ধ হোক, মিথ্যে প্রশংসা নয় বরং যোগ্যতা মূল্যায়নের সংস্কৃতি চালু হোক। এর মাধ্যমে ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সমাজে অনৈতিক কার্যকলাপের মাত্রা হ্রাস পাবে এবং সকল ক্ষেত্রে পারফরম্যান্স বা উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক তথা সামাজিক, সাংস্কৃতিক উন্নয়নে সঠিক ভূমিকা রাখতে পারবে।