প্রত্যেক মানুষের গড় আয়ু বেশি নয়। এমন স্বল্পায়ু প্রাণে জীবনকে যে বেশি শুরু থেকে গুছিয়ে নিতে পারে সে তত দ্রুত সফল হতে পারে। তারাই সফলতার গল্পে এগিয়ে থাকে। আসলে জীবনকে গোছাতে সবাই পারে না, গোছাতে গেলেও সময় লেগে যায়। অথবা বুঝে উঠতে পারে না কিভাবে শুরু করবে। জীবন গোছাতেও কৌশলী হতে হয়।
আপনি যখন কোন প্রজেক্ট সফল করতে চান, অথবা প্রকল্পে হাত দেন তখনি আপনার চারপাশে হতাশা, অনিশ্চয়তা, প্রতিবন্ধকতা, দৈন্যতা এবং নানান সমস্যা ভিড় করে। এমন ভেড়াজাল থেকে বেড়িয়ে আসা সহজ নাও হতে পারে। আর তখনি নিজের ওপর আস্থা হারিয়ে নিজের মধ্যে কঠিন একটি ‘চাপ’ অনুভূত হয়। ঠিক যেন অদৃশ্য একখন্ড পাথর চেপে বসেছে আপনার বুকে।
এই চাপ অনুভূত হওয়া হতে পারে ব্যক্তিকেন্দ্রিক, পারিবারিক, সামাজিক, বৈশ্বিক, অফিস কিংবা পেশাদারিত্বে হতে পারে। এ সবকিছু প্যারালালি আষ্ঠেপৃষ্টে জড়িয়ে থাকে আপনার চারপাশে। আপনি এর কোনটিকে বাদ দিতে পারবেন না। এমন ভগ্নদশা এড়িয়ে যেতে চাইলেও আপনি পারবেন না। ফলে প্রত্যেকটি মানুষের মানসিক চাপ থেকেই যায়। চাপগুলো কেউবা প্রকাশ; কেউবা নয়। আবার ‘চাপ’ নেয়ার বহি:প্রকাশ একেকজনের একেক রকম হয়ে থাকে। সেই চাপের ভার কখনোবা তার পরিবার, প্রতিবেশি কিংবা বন্ধুমহলের ওপর পড়ে। ফলে অনেক পরিবার, স্বজন, বন্ধুরা বঞ্চিত হয় তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে।
এহেন প্রশ্ন থাকে যে, মৃত্যুর আগে আপনি যা যা করতে চান– তার সব কটিই কি আপনি করে যেতে পারবেন? সবকিছুতে কি আপনি সফল হবেন ? এসব ভেবেই মাঝে মধ্যে দু:শ্চিন্তার আঁধার নেমে আসে। এমন দু:শ্চিন্তার দোলাচলে আমরা অনেকেই কচুরিপানার মতোন জীবন সাগরে ইচ্ছে অনিচ্ছায় ভাসতে থাকি। তবুও সফল অসফল জীবনের সঠিক অংক কষতে কারোর ফুরসত হয় না।
আপনার প্রশ্নটি যদি এমন হয় যে, আপনি জীবনের কোন লক্ষ্যই পূরণ করে যেতে পারবেন না? উত্তরটি যদি ‘হ্যাঁ’ হয় তাহলে, আপনার লক্ষ্য পূরণের জন্য কি কোন নির্দিষ্ট পরিকল্পনা আছে কী?
আধুনিক বিশ্বে বেশিরভাগ মানুষই তাদের সময় এবং প্রতিভাকে কিভাবে কাজে লাগানো যায়, তা বুঝে উঠতে পারে না। বুঝে ওঠার ক্ষেত্রে সমস্যার মুখে পড়ে। বর্তমান সময়ে সারাদিনই ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাট, হোয়াটসঅ্যাপ, লিংকে দিন কিংবা টুইটারে নোটিফিকেশন অহরহ আসতে থাকে। সেই সাথে বন্ধু-বান্ধবদের সময় দেয়া, আড্ডাবাজি করা লাগে। এছাড়াও প্রায়ই কোন না কোন দেশীয় বা সামাজিক উৎসব উপলক্ষতো আপনার চারপাশে লেগেই আছে। প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে বিভিন্ন প্রান্ত থেকে একটু পরপরই নানান কারনে আপনার ফোনে কল আসা এটিও একটি আধুনিক জীবনের একটি অংশ।
আপনার অফিসের কাজেও এসব থেকে মুক্তি নেই। অনেক কাজের ক্ষেত্রেই একের পর এক ই-মেইল আসতে থাকে। ইমেলের রিপ্লাই, ক্লায়েন্ট ডিল, সহকর্মীকে ম্যানেজ, অফিসের বস, পরিবার এরা সবাই আপনার কাছে কিছু না কিছু চায়। আলাদা আলাদা কাজের জন্য আপনাকে আলাদা আলাদা পদ্ধতি অবলম্বন করতে হয়। অন্যের কাজ করতে করতে এক সময় আপনি হাঁপিয়ে ওঠেন। নিজের অজান্তে আপনি হাঁপিয়ে উঠতে বাধ্য হন। নিজের জন্য যে একটু সময় বের করে নিজের কাজটি করবেন; সেই সময় আর আপনার হাতে থাকে না। তখন আপনার দুটো হাত দুদিক থেকে কেউ যেন টেনে ছিঁড়ে ফেলছে এমন অবস্থা অনুভুত হতে পারে।
তখন আপনি যা ভাবেন, সময় হাতে নেই কীভাবে এতগুলো কাজ করা সম্ভব ! একজন মানুষ কি এ সবগুলো কাজ করতে পারে ? আর তখনিই আপনি ভাববেন কীভাবে এসব ঝুট ঝামেলা থেকে হাফ ছেড়ে বাঁচবেন, তাই না ?
এসব ম্যানেজ করতে আপনার হাতে নেই তা নয়; বরং আপনার হাতে তারচেয়েও বেশি সময় থাকে। তবে আমরা অনেকেই এটা বুঝতে পারি না। এত ব্যস্ততার মাঝেও নিজের কাজ করার জন্য আপনার সময় থাকে। ওখান থেকেই আপনাকে সময় বের করে নিতে হবে। শুধু প্রয়োজন এই সময়কে কিভাবে কাজে লাগাবেন, তা বুঝে নেয়া। বুঝেশুনে সময়কে সকলের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেয়া।
আপনার হাতে যতটা সময় আছে, লক্ষ্যপূরণের জন্য সেই সময়টুকুই যথেষ্ঠ। আপনাকে শুধু সময়ের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার এবং সুপরিকল্পিতভাবে নিজেকেও নিয়োজিত করতে হবে। একটি নিয়ন্ত্রিত জীবন, পরিকল্পিত কাজে যেমন একদিকে আপনি স্বস্তি পাবেন, তেমিন পরিবার, সমাজ, বন্ধু-বান্ধব, অফিস সামলিয়ে নিজের মধ্যে বিরাজমান চাপ অনুভূতি থেকেও সহজে মুক্তি পাবেন।
কিন্ত বর্তমানে কে কত কাজের চাপ নিচ্ছে, এবং কাজের চাপে কে কতটা বিধ্বস্ত হয়ে আছে, এটা জলজ্যান্ত প্রকাশ করা একটা ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সপ্তাহে যে কয়দিন অফিস, সেই কয়দিন প্রয়োজনের অতিরিক্ত খেটে নিজেকে বিধ্বস্ত করে ছুটির দিন নিজেকে পূর্ণ স্বাধীনতা অধিকার নিয়ে হয় যা ইচ্ছে তাই মজা, হৈ হুল্লোড় করে নিজের শরীরে আরও ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত, ভারাক্রান্ত করে ফেলছি। অথবা শরীরের ক্লান্তি দূর না করে; বরং পুরো দিন ধরে মুভি আর সিরিজ দেখার আসক্ত আমাকে পেয়ে বসে। এ প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞরা বলেন, এতে করে মানুষের স্বাভাবিক জীবন ও কাজের গতি নষ্ট হচ্ছে, নিজেই নিজের চাপ আরও বাড়িয়ে তুলছে।
সত্যিই বলতে এখানে যে বিষয়টি বেশি খেয়াল করতে হবে, বেশিরভাগ সময় চাপ নিয়ে কাজ করার ফলে যেটুকু সময় মানুষ অবসর পাচ্ছে, মজা বা আনন্দ করার নামে নিজের দারুন ক্ষতি করে ফেলছি। সেই সাথে একান্ত নিজস্ব কাজের জন্য কোনও সময় রাখতে পারছি না। এই ক্ষতিকর ফাঁদ থেকে বের হতে হলে সব সময় সব কাজে চাপ নেয়া যাবে না। নিজের মধ্যে কাজের চাপ কমিয়ে ‘চাপ’শব্দটি ভুলে যেতে হবে। অর্থাৎ চাপহীনভাবে কাজ করার বেশকিছু পরীক্ষিত উপায় রয়েছে, সেগুলো কাজে লাগাতে হবে। একটি টাস্ক থেকে অন্য একটিতে যাওয়ার আগে কিছু সময় চোখ বন্ধ করে বিশ্রাম নেয়া, প্রতি পঁচিশ মিনিট কাজ করার পর পাঁচ মিনিটের বিরতিতে একটু হাঁটাহাঁটি করা– এগুলো বেশ কাজে লাগে। এতে করে আপনার শরীরে ধীরে ধীরে জমায়িত ক্লান্ত অনুভূতিগুলো দূরিভূত হয়।
এছাড়াও সারা সপ্তাহ গাধার মত খেটে, সাপ্তাহিক ছুটির দিনের অপেক্ষা করার চেয়ে মাঝে মাঝে কাজ থেকে ফিরে একটু সিনেমা দেখা, একটু গেম খেলা বা আধা ঘন্টা এক ঘন্টার জন্য একটু বেড়িয়ে আসলেও অনেকটা চাপমুক্ত থাকতে পারবেন। অর্থাৎ রিল্যাক্সড মুডে দিনের কাজগুলো করতে পারলে, ছুটির দিনগুলোতে বা অবসর সময়ে নিজেকে ‘ওভার রিল্যাক্সড্’করার তাগিদ আর অনুভব করবেন না– ফলে সেই সময়গুলোকে সত্যিকার কাজে লাগাতে পারবেন। নিজেই নিজের এই চাপ অনুভূতি মুক্ত করে দিয়ে যেকোন সময় একটি চাঙ্গা অনুভবে যেকোন কাজ করার দুর্দান্ত শক্তি পাবেন।
সঠিক উপায়ে কিভাবে কাজগুলো দ্রুত এবং ক্ষয়ে যাওয়া এনার্জি আপনার মধ্যে আবার ফিরে পেতে পারেন সে উপায়গুলো আপনাকেই খুঁজে বের করতে হবে। আপনার দৈনন্দিন কাজে কর্মে নিয়মিত সে অনুযায়ী পরিবারে, অফিসে এবং যেকোন জায়গায় গুচ্ছিয়ে কাজ করতে হবে। নিজের মধ্যে সে অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে যেকোন চাপ সামলিয়ে উঠে নিজের প্রতি খেয়াল রাখা সম্ভব। নিজের জন্য প্রয়োজনীয় সময় ম্যানেজ করাও সম্ভবপর হয়।
আপনার মধ্যে কাজের তাগিদ অনুভব করা ভালো, তবে আপনার শরীর এবং প্রতিবেশিকে ক্ষতিগ্রস্থ করে নয়। একটি সুস্থ্য সবল চিন্তার মাধ্যমে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে যেমন সহজ হয়ে ওঠে; তেমনি চাপহীন মস্তিস্কে কাজ করতে পারলে যেকোন কাজ সফল হওয়া সম্ভব।
লুই সাংমা, ফ্রান্স
ওয়েভ ডেভেলপার, ব্লগার, আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সার এবং
সাংস্কৃতিক কর্মী।