ত্রি-সীমানায় পিকনিক স্পট নির্মাণ বন্ধের দাবি, বাড়ির বিজাতি প্রতিবেশিকে নিজের সঠিক পরিচয় প্রদান, স্কুলে – অফিসে উপজাতি কিংবা ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী ডাকের প্রতিবাদ কিংবা নেতৃত্বে থাকা আদিবাসী ব্যাক্তি বর্গকে রাষ্ট্রের অগোচরেই আদিবাসী শব্দটি সবার কানে পৌছে দিতে হবে। শুধু রাজপথ নয় বাড়িতে থেকেও দুজন মানুষের অভিমত চিন্তাধারা বদলিয়ে আমাদেরকে এই আন্দোলনের দীর্ঘপথে সামিল হতে হবে।

সম্ভবত ২০১৭ সালের প্রথম দিকের কথা। ঝালকাঠি জেলায় বিটিভির একটি রিয়েলিটি শোর শুটিং এ সিনেমাটোগ্রাফার হয়ে গিয়েছি। শুটিং ছিলো সেই জেলার একটি স্কুলে। দু’দিন কঠোর পরিশ্রম শেষে শুটিং শেষ করেছি। এবার স্কুলের হেডমাস্টারসহ স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে ধন্যবাদ মূলক একটি আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ঢাকা ফিরবো। এই সময় হঠাৎ আমি এবং আমার সাথে থাকা কয়েকজন আদিবাসী চেহারার দিকে ইশারা করে প্রধান শিক্ষক ছাত্র-ছাত্রীদের বললেন, ‘এই যে তোমরা অনেক উপজাতিদের কথা শুনেছ তাই না? এরাই হল সেই উপজাতি’। কথাগুলো শুনে আমার তেমন কোন রিয়েকশন হয়নি। হয়নি কারণ এই রিয়েকশন না হওয়াটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। সরকার আমাকে দেখিয়ে পুরো দেশবাসীকেই এই কথাটা বিভিন্ন জায়গায় বলেছে আমরা উপজাতি, ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী ইত্যাদি।

এখন প্রশ্ন যদি আমাকে কেউ করে ভাই এখানে রিয়েকশন হওয়ার কি আছে? শুধু তখনই আমার উত্তর দেওয়ার জায়গা থাকে আর সেটি হলো আমরা উপজাতি নই। আমরা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীও নই। আর কথার শেষে আমাকে বলতে হবে ‘আমি আদিবাসী’। কিন্তু আপনি হয়তো জানেন-ই না বাংলাদেশের অফিসিয়াল কোন কাগজপত্রে এই আদিবাসী শব্দ লেখা নেই। অফিসিয়াল বা রাষ্ট্র কর্তৃক আপনাকে ধরে বেঁধে দেওয়া হয়েছে নিজেকে বর্তমানে ক্ষুদ্র, নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী হিসেবে পরিচয় দিতে হবে। এই পরিচয় নাকচ করার শক্তি কিন্তু এই প্রান্তিক মানুষদের নেই। কারণ তাদের এই নামেই ত্রাণ নিতে হয়। ক্ষুদ্র, নৃ_তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী হিসেবেই সরকারী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সাহায্য পেতে হয়। এই পরিচয়েই ক্লাস ওয়ান থেকে মাস্টার্স অবধি শিক্ষা গ্রহণ করতে হয়। আর পরিশেষে কেউ বিসিএস ক্যাডার হয়, কেউ হয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, কেউবা হয় বড় সরকারী চাকরীওয়ালা, আর এরা সবাই সরকারী কোষাগার থেকে বেতন তুলে, খায়, মারা যায়। আর নিউজ পেপারে তাদের মৃত্যুর পর সংবাদ লেখা হয় মারা গেলের ক্ষুদ্র, নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর একজন মেধাবী মানুষ। আর আমরাই সেই নিউজ দেখে খুশী হই এই ভেবে যে, যাক মানুষটার মৃত্যু সংবাদ পত্রিকায় গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হয়েছে। এই যে ‘গুরুত্ব’ শব্দটি বললাম ! এই গুরুত্বের মধ্যেই সব রহস্য নিহিত আছে। কেন জানেন? সরকারও গুরুত্ব দিয়েই নজর রেখেছে দেশে যাতে আদিবাসী শব্দের দৌরাত্ব না বাড়ে। গুরুত্ব দেয় বলেই প্রতিবার আদিবাসী দিবসের আগে উনাদের নানা ধরণের নাটকের সম্মুখীন হতে হয় আমাদের।

গারো আদিবাসী মেয়ে, ছবি: ফিডেল ডি. সাংমা

এবার আসি এই বছরের আদিবাসী দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় নিয়ে। ‘ঐতিহ্যগত জ্ঞান সংরক্ষণ ও বিস্তারে আদিবাসী নারীদের ভূমিকা’ এই প্রতিপাদ্যের প্রথম অংশটা ঐতিহ্যগত জ্ঞান সংরক্ষণের ব্যাপারে বলা হচ্ছে। এখন সবচেয়ে বড় যে প্রশ্ন সেটি হলো কোন দেশের আদিবাসীদের ঐতিহ্যগত জ্ঞান সংরক্ষণে সেই দেশের সরকারের আচরণ কেমন হওয়া উচিত? সরকার তো বলছেনই দেশে আদিবাসী নেই। সুতরাং এই ঐতিহ্যগত জ্ঞান সংরক্ষণে আমরা নিজেরা যদি এগিয়েও আসি আমরা কতটুকু সফল হতে পারবো? সর্বোচ্চ পঞ্চাশ শতাংশ! আর বাকি অর্ধেক অর্থায়ন, পৃষ্ঠপোষকতা, আন্তর্জাতিক মহলের সাহায্যের অভাব, নিজেদের মধ্যে কিছু রাজাকার জাতীয় সরকার পন্থী আচরণ ইত্যাদির কারণে কখনোই সম্ভব হবে না। এই প্রতিপাদ্য বিষয় কিন্তু শুধু আজকের না। আদিবাসীদের পৃথিবীতে টিকিয়ে রাখার মূলমন্ত্র কিন্তু এখানেই নিহিত আছে।

সরকার যখন স্বীকারই করে না দেশে আদিবাসী আছে। কোন আন্তর্জাতিক মহল এগিয়ে এসে আমাদের হাত ধরতে পারবে না। আমরা পিছিয়ে পরা প্রান্তিক এই জনগোষ্ঠীর মানুষেরা নিজ পেটের দায়ে বিনা পয়সায় এই কাজে সময় ব্যয় করতে চাইবো না। তাহলে কি সব পথই বন্ধ? বন্ধ নয়। কিছু পথ কিন্তু অনেক আগে থেকেই খোলা আছে। রাষ্ট্রের অনুমোদিত কিছু প্রতিষ্ঠান রয়েছে যেখানে নিজেদের আদিবাসী ভাবা মানুষেরা চাইলেই নিজেদের স্বার্থ অন্যভাবে হাসিল করে নিতে পারে। কিন্তু সেইসব প্রতিষ্ঠানের গদিতে যারা বসে আছেন তারা আদিবাসী হলেও অনেকেই আদিবাসী বান্ধব নন বা সুযোগের সদ্ব্যাবহার করার প্রতি তাদের মনোনিবেশ নেই। তাদের দোষ দিয়েও তেমন লাভ নেই। কারণ গদিতে তারাই বসেছেন যাদেরকে উপরওয়ালারা মুখে ফুঁ দিয়ে ঝারফুক মেরে দিয়েছেন। সহজ কথায় দল করেন গদি পাবেন। আর দল করা মানে মেনেই নিচ্ছেন আপনি ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর একজন। সুতরাং যে লাউ সেই কদু। তবে শুধু প্রতিবাদের রাস্তাই খোলা থাকে। কিন্তু আমরা যে সব পন্থায় প্রতিবাদ করে অভ্যস্ত সেই সব প্রতিবাদ কি কোন কাজে আসছে? নাকি উল্টো আমাদের জন্য সমস্যা তৈরি করছে? একটি উদাহারণ দেই, ধরেন মন্টু মিয়া পুকুরে পাছ পালন করেন। উনি থালার ভাত শেষ না করতে পারলে প্রায়শই সেই ভাত পুকুরে ফেলে দেন যাতে মাছেরা খেতে পারে। কিন্তু একদিন ভুল করে তিনি ভাতের সাথে মাছের কাটা পুকুরে ফেলে দিলেন। পুকুরের মাছেরা বুঝতে পারল মন্টু মিয়া তাদের স্বজাতিকে ধরে ধরে প্রতিদিন আহার সারছেন। ব্যাস, শুরু হয়ে গেল মাছেদের আন্দোলন। ধরুন মাছেরা প্লেকার্ড, ব্যানার নিয়ে জল ছেড়ে ডাঙায় উঠে এলো আর মিছিল করতে শুরু করল তখন মন্টু মিয়ার আর কষ্ট করে জাল ফেলে মাছ ধরতে হবে না। উনি পুকুরের পার থেকে টপাটপ মাছ ধরবেন আর চুলায় চালান করে দেবেন। তাহলে কি মনে করেন মাছেদের এই আন্দোলনের কৌশল ঠিক ছিল? মোটেও না। বরং এই আন্দোলন তাদের জন্য সর্বনাশ ডেকে এনেছিল। আর আমাদের আন্দোলনও যদি এই রকম হয় তবে ভালো না হয়ে মন্দের আগমন নিশ্চিত।

আমরা প্রতিবার আন্দোলনে রাজপথে দাঁড়ায় অন্যদিকে রাজপথের লড়াকু মানুষেরা পরে যায় টার্গেটে। এদের জীবন যাত্রায় শুরু হয় দুর্যোগ। সুযোগে কিছু রাজাকার পক্ষ নেয় অপজিশন দলের সাথে। আর এক সময় আমাদের গোপন সব তথ্য চলে যায় তাদেরই হাতে যারা চায় না আমরা আমাদের অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকি। কেন মাছেরা যদি পুকুরে থেকেই প্রতিবাদ করা শুরু করত তবে সেই প্রতিবাদ মন্টু মিয়ার কর্ণগোচর না হলেও কি চুলায় পুড়ে মরতে হতো? হতো না। বরং মাছেরা সাবধান হয়ে বর্শির টোপ গিলা থেকে নিজেকে সংবরণ করে তাদের নিজেদের জন্য যৎসামান্য উপকার ডেকে আনতে পারতো। কথাটা এমনি বলছি না। পুকুরে থেকেই মানে ঘরে থেকেই আমাদের আন্দোলন শুরু করতে হবে। ত্রি-সীমানায় পিকনিক স্পট নির্মাণ বন্ধের দাবি, বাড়ির বিজাতি প্রতিবেশিকে নিজের সঠিক পরিচয় প্রদান, স্কুলে – অফিসে উপজাতি কিংবা ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী ডাকের প্রতিবাদ কিংবা নেতৃত্বে থাকা আদিবাসী ব্যাক্তি বর্গকে রাষ্ট্রের অগোচরেই আদিবাসী শব্দটি সবার কানে পৌছে দিতে হবে। শুধু রাজপথ নয় বাড়িতে থেকেও দু’জন মানুষের অভিমত চিন্তাধারা বদলিয়ে আমাদেরকে এই আন্দোলনের দীর্ঘপথে সামিল হতে হবে।

নারীদের ভুমিকার কথা যেভাবে প্রতিপাদ্যে বলা হয়েছে সে ক্ষেত্রে দেশ আসুক কিংবা না আসুক, এনজিও আসুক কিংবা না আসুক নারী শিক্ষাকে প্রসারিত করে সমাজের বিভিন্ন স্তরে নারীদের অবদান রাখতে জায়গা তৈরি করে দিতে হবে। আর সেটা আমাদের নিজেদেরই করতে হবে। জাতির কথা ভেবে স্বার্থের কথা ভেবে, মাঝে মাঝে স্বজন প্রীতি করে হলেও নারী নেতৃত্ব তৈরি করতে হবে। শিক্ষাঙ্গনে আদিবাসী নারীদের পদচারণা আর নিজস্ব মাতৃভাষায় শিক্ষা ব্যবস্থাকে বেগবান না করলে আমরা আজীবন ক্ষুদ্রই থেকে যাবো।

আদিবাসী দিবস ২০২২ সফল হোক।